‘ইটস বেন স্টোকস উইথ দ্য উইনিং রান। হু এলস, ইটস অলওয়েজ বেন স্টোকস...’ ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডের জয়ের মুহূর্তে ধারাভাষ্যকার ও সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক নাসের হুসেইনের উচ্ছ্বসিত উচ্চারণ ছিল। সত্যিই তাই, ইংলিশদের চরম বিপর্যয়ে সব সময় যেন ত্রাতা হয়ে আসেন বেন স্টোকস। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হেডিংলি টেস্টে এক প্রান্ত ধরে রেখে দলকে অবিশ্বাস্য জয় এনে দেওয়া, ২০১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে চমৎকার ব্যাটিংয়ে দলের জয়ের নায়ক হয়ে ওঠা; সবই তার গ্রেটনেসের প্রমাণ। বড় মঞ্চে জ¦লে ওঠার জন্য তো আলাদা একটি নামও পেয়ে গেছেন তিনি, ‘মিস্টার বিগ মোমেন্ট’। বাজে পারফরম্যান্সে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ ধরে রাখতে না পারলেও স্টোকস ঠিকই আপন আলোয় উজ্জ্বল।
অথচ চলতি বিশ্বকাপে খেলার কথা ছিল না স্টোকসের। মানসিক অবসাদের কারণে ক্রিকেট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিরতিতে যাওয়ার পর ফিরে ওয়ানডে ক্রিকেটকে যে বিদায় বলে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে সিদ্ধান্ত বদলে ফিরে আসেন। দলও তাকে আপন করে নেয়। না নেওয়ার কারণও তো নেই, ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সেরা ক্রিকেটারদের একজন যে তিনি। ইংল্যান্ড অধিনায়ক জস বাটলারের ভাষায়, ‘আরও অর্জনের ক্ষুধা থেকে বোধ হয় অবসর ভেঙে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্টোকস।’ যদিও চোটের কারণে খেলতে পারেননি বৈশি^ক আসরে শুরুর কয়েক ম্যাচ। অলরাউন্ডার হলেও চোট সমস্যায় তাকে কেবল ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলাচ্ছে ইংল্যান্ড। যে আশায় নির্দ্বিধায় দলে এসেছেন তিনি, সেটাও পূরণ করতে পারেননি শুরুতে। প্রথম তিন ম্যাচে রান করেন ৫, ৪৩ ও ০।
স্টোকস যে মানের ক্রিকেটার, ঘুরে দাঁড়াতে সময় বেশি নেবেন না এটাই স্বাভাবিক। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৬৪ ও নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ১০৮ রানের ইনিংস খেলে নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দেন তিনি আরেকবার। যদিও তার জ্বলে উঠতে একটু বেশিই দেরি হয়ে গেছে, কারণ তত দিনে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের দৌড় থেকে যে ছিটকে পড়েছে ইংল্যান্ড। আজ পাকিস্তানের বিপক্ষে আসরে নিজেদের শেষ ম্যাচ খেলবে ইংলিশরা। ৩২ বছর বয়সী স্টোকসের জন্যও এটি বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ। তাই আরেকটা দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে শেষটা রাঙিয়ে রাখতে চাইবেন বাঁহাতি এই ক্রিকেটার। আর পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডেতে তার পারফরম্যান্সও খারাপ নয়। ১১ ইনিংসে রান ৪৭.৮৮ গড়ে ৪৩১, স্ট্রাইক রেট ৯৩.০৮, ফিফটি আছে ৩টি। শুধু স্টোকসের জন্যই নয়, ইংল্যান্ডের জন্যও ম্যাচটি গুরুত্বপূর্ণ। আগামী চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলতে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের বিকল্প যে নেই তাদের।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পাকিস্তানের খেলার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কারণ এর জন্য ইংলিশদের বিপক্ষে ২৮৭ রানে কিংবা প্রতিপক্ষকে ৫০ রানে গুটিয়ে ২ ওভারের মধ্যে জিততে হবে তাদের। গাণিতিকভাবে সম্ভাবনা থাকলেও, বাস্তবে এই সমীকরণ মেলানো প্রায় অসম্ভব। কোনোভাবে অবিশ্বাস্য জয়ের সম্ভাবনা জাগানোর জন্য পাকিস্তানের হয়ে জ¦লে উঠতে হবে ফখর জামানকে। আরেকবার দলটির আশার প্রদীপ হতে হবে তাকে। নিউজিল্যান্ড ম্যাচের মতো ইংলিশদের সঙ্গেও ঝড় তুলতে হবে বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যানকে। কিউইদের সঙ্গে তার ১২৬ রানের বিধ্বংসী ইনিংসেই এখনো শেষ চারে খেলার স্বপ্ন দেখতে পারছে এশিয়ার দলটি।
পাকিস্তানের একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে ডাবল সেঞ্চুরি করা ফখর বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ খেলার পর বাদ পড়েছিলেন। ফেরার ম্যাচেই উজ্জ্বল ছিলেন তিনি, বাংলাদেশের বিপক্ষে করেন ৮১ রান, দলও ভাঙে হারের বৃত্ত। এরপর তো কিউইদের সঙ্গে অমন খুনে ব্যাটিং। তার সামর্থ্য নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয় কারোর। হার না মানা মানসিকতা তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। পাকিস্তান নৌবাহিনীর এই সদস্য দলের কাছে পরিচিত ‘ফজি বা সোলজার’ হিসেবে। তাই একজন যোদ্ধার মতোই শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার তাড়না থাকবে ফখরের মধ্যে।
আর বয়সও হয়ে গেছে ৩৩, পরের বিশ্বকাপে তার খেলার সম্ভাবনা তাই ক্ষীণ। তাই ইংলিশদের বিপক্ষে বিশ্বকাপে নিজের শেষ ম্যাচটি অসাধারণ পারফরম্যান্সে রাঙাতে চাইবেন তিনি। ইংল্যান্ডের সঙ্গে তার পারফরম্যান্সও খারাপ নয়। ১০ ওয়ানডেতে ৩৫.০৬ গড় ও ৮৯.৪৪ স্ট্রাইক রেটে রান করেছেন ৩৫৬। একটি সেঞ্চুরির সঙ্গে ফিফটি আছে দুটি। এবার কতটা নিজেকে মেলে ধরতে পারেন এই ওপেনার, সেটাই এখন দেখার।
ব্যাট হাতে ফখরের জ্বলে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল। পরিসংখ্যান কথা বলছে তার হয়ে। চলতি বছর তো চমৎকার খেলছেন তিনি। বিশেষ করে ওয়ানডেতে তার পারফরম্যান্স নজরকাড়ার মতো। ১৮ ইনিংসে ৮৬৩ রান, ব্যাটিং গড় ৫৪ ও স্ট্রাইক রেট ৯৩.৭০। এ বছর চারটি সেঞ্চুরি করেছেন তিনি, সবগুলোই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। এক পঞ্জিকাবর্ষে একটি দলের বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরির রেকর্ডে তিনি বসেছেন ডেসমন্ড হেইন্স, শচিন টেন্ডুলকার, রিকি পন্টিং ও বিরাট কোহলির পাশে। এবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে জ্বলে ওঠার চ্যালেঞ্জ তার সামনে।
