ফিলিস্তিন সংকটের এখনকার বাস্তবতায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘দ্বি-রাষ্ট্র সামধান’ নিয়ে জোরালো অবস্থান তুলে ধরেন। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষর হওয়া ‘অসলো শান্তিচুক্তির’ মধ্য দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যে দুটি স্বাধীন ভূখন্ডের কথা বলা হয় যা ইহুদি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের আলাদা স্বাধীন ভূমির নিশ্চয়তা দিয়েছিল। নানা রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা চাপা পড়ে যায়। কিন্তু গাজায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি আগ্রাসনের কারণে সেই প্রসঙ্গ আবারও আলোচনায় আসছে।
অসলো চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের জন্য আলাদা স্বশাসিত শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের (পিএ) জন্ম হয়। ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (পিএলও) ও ফাতাহর নেতা ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরায়েলি নেতা আইজাক রবিনের মধ্যে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় পিএ। ইসরায়েলও ফিলিস্তিনিদের স্বশাসন মেনে চলে। কিন্তু ইহুদি কট্টর জাতীয়তাবাদীদের মতো হামাসও সেই চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের সর্বশেষ মধ্যপ্রাচ্য সফরে। এ সময় তিনি পিএ প্রধান তথা ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করতে বলেন। কিন্তু আব্বাস জানান, বিস্তৃত রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া তিনি এই ধরনের প্রস্তাবে রাজি নন।
পশ্চিম তীরের রামাল্লা শহরভিত্তিক পিএলওর মহাসচিব হুসেইন আল-শেখ গত মঙ্গলবার বলেন, ‘ফিলিস্তিনি নেতারা প্রত্যাশা করে, মার্কিন প্রশাসন এমন একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিক যা গাজা, পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমকে যুক্ত করে একটি রাজনৈতিক সমাধান দেবে।’ মূলত এর দ্বারা এই ফিলিস্তিনি নেতা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কথাই তুলে ধরেন।
আল-শেখ আরও বলেন, সংকটের মূল বিষয়গুলো সমাধান করতে হবে যা তিন দশক ধরে শান্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে। ইসরায়েলকে পশ্চিম তীর থেকে সাত লাখ ইহুদি জনগণকে প্রত্যাহার করতে হবে, পূর্ব জেরুজালেমের রাজনৈতিক মর্যাদা দিতে হবে যাকে ফিলিস্তিনিরা রাজধানী মনে করে।
ফিলিস্তিন সংকট কার্যত আড়ালে পড়ে যায় নানা কারণে। পশ্চিম তীরে ক্রমবর্ধমান হারে ইহুদি বসতি বৃদ্ধিকরণ, ফিলিস্তিনিদের ওপর নজিরবিহীন আক্রমণ এবং আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ঘটনাগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিলিস্তিনিদের হতাশ করে তোলে। বিশেষত সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের আলোচনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অসলো চুক্তি নিয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়া এবং ইসরায়েলিদের দখলদারি বেড়ে যাওয়ায় দুই রাষ্ট্রের সমাধান চাপা পড়ে। এমন আবহের মধ্যেই হামাস গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে অতর্কিত হামলা করে বসে। গাজায় ইসরায়েলের চলতি আগ্রাসনে ১১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণ চলে গেছে।
১৯৪৮ সালের পর গত শতকে আরব দেশগুলো ফিলিস্তিনি ইস্যুতে যতটা সক্রিয় ছিল, এখন তা দেখা যায় না। গত শতকে কয়েকবার আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ হয়। বলা যায় যে, দশকের পর দশক ধরে চলতে থাকা স্থবিরতায় দুই রাষ্ট্র-ভিত্তিক সমাধান তো দূরে থাক, ফিলিস্তিন সংকটই আড়ালে চলে যায়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলাপকালে গত সপ্তাহে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের কথা তুলে ধরেন। ইউরোপীয় কাউন্সিলে গত মাসে দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই শান্তির জন্য দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সহাবস্থানের কথা তুলে ধরেন। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই এই ধরনের সমাধানকে বাস্তববাদী আখ্যা দেন।
২০০০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক এবং ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতকে একসঙ্গে ক্যাম্প ডেভিডে বসিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর ‘অসফল’ চেষ্টা চালান। কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর জেরুজালেম সফরকে কেন্দ্র করে সেই আলোচনা ভেস্তে যায়। পরে শুরু হয় ফিলিস্তিনিদের দ্বিতীয় ইন্তিফাদা। সামগ্রিকভাবে ওই পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক এসওএএস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের উন্নয়ন অধ্যয়ন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক গিলবার্ট আকার বলেন, ওই ঘটনাপ্রবাহের পর বস্তুত অগ্রগতি হয়েছে ‘শূন্য’ এবং পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেছে।
মাহমুদ আব্বাস অভিযোগ করে আসছিলেন, দুই রাষ্ট্রের সমাধানকে ইসরায়েলই নানা কাজের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করেছে।
ইসরায়েলের ভেতরে কট্টর ইহুদিবাদীরা সব সময়ই স্বাধীন ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তবে নব্বইয়ের দশকে হামাস ইসরায়েল রাষ্ট্রকে মেনে না নিয়ে দুই রাষ্ট্র-ভিত্তিক প্রচারের বিরুদ্ধে লাগাতার সহিংসতা পরিচালনা করেছে। অবশ্য তারা ২০১৭ সালে বলেছিল, ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের আগের পরিস্থিতি অনুযায়ী দুই রাষ্ট্র সমাধান মেনে নেবে। আবার ২০১৫ সালের নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, তিনি থাকতে ‘স্বাধীন ফিলিস্তিন’ সৃষ্টি হবে না।
