দুঃস্বপ্নের বিশ্বকাপে প্রাপ্তি সামান্যই

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২৩, ০৬:২৬ এএম

প্রত্যাশার বেলুনে হাওয়া ঢুকেছিল অনেক দিক থেকেই। বাংলাদেশ দলের ওয়ানডে সুপার লিগের পারফরম্যান্স স্বপ্ন দেখাচ্ছিল বিশ্বকাপেও ভালো কিছুর। সাকিব আল হাসান এশিয়া কাপের শেষ ম্যাচে ভারতকে হারিয়ে বলেছিলেন, বিশ্বকাপে বাংলাদেশ হবে ভয়ংকর দল। বিজ্ঞাপনেও তাই নানাভাবে বাংলাদেশের কাল্পনিক সাফল্যের উল্লাসের উদযাপন। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। বিশ্বকাপটা দুঃস্বপ্নের মতোই কাটল বাংলাদেশের। প্রায় মাস দেড়েকের দীর্ঘ যাত্রায় প্রাপ্তি সামান্যই।

ডলার সংকটের এই যুগে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলে ১ লাখ ৮০ হাজার ডলার নিয়ে আসছে। বিশ্বকাপ থেকে এরচেয়ে বড় কোনো প্রাপ্তি খুব সম্ভবত নেই বাংলাদেশের। জয়ের জন্য ম্যাচপ্রতি ৪০ হাজার ডলার পুরস্কার আইসিসির আর গ্রুপ পর্ব শেষে ছিটকে যাওয়া ৬ দলের জন্য আছে ১ লাখ ডলার। এভাবেই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রাপ্তি ১ লাখ ৮০ হাজার ডলার। এর বাইরে নেই কোনো মনে রাখার মতো পারফরম্যান্স, না আছে কোনো নতুন তারকার উত্থানের আভাস। বরং অনেক অমীমাংসিত প্রশ্ন আর বিতর্ক নিয়েই বিশ্বকাপ শেষ হলো বাংলাদেশের, খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষাই বলে দিচ্ছিল শেষ হলেই বোধহয় তারা হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ৯টি ম্যাচই শেষ  হয়েছে সম্পূর্ণভাবে, কোনোটিতেই ছিল না প্রাকৃতিক কোনো বিঘ্ন। লিটন দাস, তানজিদ হাসান তামিম, নাজমুল হোসেন শান্ত, মুশফিকুর রহিম, মেহেদী হাসান মিরাজ এই ৫ ক্রিকেটার খেলেছেন সবগুলো ম্যাচেই। লিটন-তামিম নিয়মিতই ইনিংসের সূচনা করেছেন। মাত্র দুটো ম্যাচে এই দুজনে মিলে ভালো একটা শুরু এনে দিতে পেরেছেন, সেটাও বিশ্বকাপের মানদ-ে খুবই অকিঞ্চিৎ। তামিম-লিটনের সর্বোচ্চ জুটিটা ৯৩ রানের, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটি ৭৬ রানের। এছাড়া বাকি ৭ ম্যাচের কোনোটিতেই উদ্বোধনী জুটি থেকে ৫০ রানও পায়নি বাংলাদেশ। দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানের ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানও সুবিধের নয়। লিটনের রান ৯ ইনিংসে ২৮৪, দুটি হাফসেঞ্চুরি আর একখানা শূন্য। সর্বোচ্চ ইনিংস ৭৬ রানের। তামিমের ৯ ইনিংসে রান ১৪৫, একটাই হাফসেঞ্চুরি। ৫১ রান করেছিলেন ভারতের বিপক্ষে।

৩২৮ রান করে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ভেতর সবচেয়ে বেশি রান মাহমুদউল্লাহর। এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের একজন ব্যাটসম্যানই সেঞ্চুরি করেছেন, সেটা তার। দক্ষিণ আফ্রিকার ৪০০ ছোঁয়া রানের নিচে চাপা পড়ার পর ছয়ে নেমে মাহমুদউল্লাহর সেঞ্চুরিটি ছিল হার্ষা ভোগলের ভাষায় ‘বাড়ির ১০ মিনিট আগে ২ ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকার মতো’। মাহমুদউল্লাহর দুটি বিশ্বকাপে শতরান এবং ব্যক্তিগত ইচ্ছাপূরণ বাদে সেই ইনিংস ম্যাচের জয়-পরাজয়ে কোনো প্রভাব ফেলেনি। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সেঞ্চুরি আর পাকিস্তানের বিপক্ষে হাফসেঞ্চুরিতে বিশ্বকাপের আগে উপেক্ষার জবাব হয়তো দিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ, তবে তাতে দলের ফলে কোনো তারতম্য হয়নি। ৯ ম্যাচে দুটো হাফসেঞ্চুরির পরও মুশফিকের মোট রান ২০২। সব মিলিয়ে ১১টা হাফসেঞ্চুরি করেছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। মাহমুদউল্লাহ বাদে লিটন, মুশফিক আর শান্তই একাধিকবার পঞ্চাশ ছাড়াতে পেরেছেন। তাওহিদ হৃদয়কে নিয়ে অনেকেই ছিলেন আশাবাদী। ব্যাটিং অর্ডারে মেহেদী হাসান মিরাজকে ওপর-নিচ করাতে সবচেয়ে বেশি ভুগেছেন হৃদয়, তাকে নামতে হয়েছে নিচে। শেষ ম্যাচে ৭৪ করার পরও ৬ ইনিংসে তার রান মোটে ১৬৮।

বহুল চর্চিত পেস কিংবা ভারতীয় কন্ডিশনে স্পিন; কোনো বোলিংই কাজে দেয়নি। দুটো ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রতিপক্ষ আগে ব্যাট করে সাড়ে ৩০০’র বেশি রান করেছে। বাংলাদেশ ৮ উইকেটে হেরেছে এক* ম্যাচে, ৭ উইকেটে ২ ম্যাচে, প্রতিপক্ষকে অলআউট করেছে মাত্র ৩ বার। ১০ উইকেট নিয়েছেন শরিফুল ইসলাম আর মেহেদী হাসান মিরাজ ১০* উইকেট। তবে রান দিয়েছেন ওভারে গড়ে সাড়ে ছয় ও সাড়ে পাঁচ করে। 

ফিল্ডিংও বাংলাদেশ করেছে যাচ্ছেতাই। ক্যাচ পড়েছে, গ্রাউন্ড ফিল্ডিংও খারাপ। ট্যাকটিক্যালিও বাংলাদেশ ছিল খুবই খারাপ। নেদারল্যান্ডসের ক্রিকেটাররা মাঠেই পকেট থেকে চিরকুট বের করে দেখে ব্যাটসম্যানের দুর্বলতা বুঝে ফিল্ডিং সাজিয়েছেন। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা সেখানেই ক্যাচ দিয়ে আউট হয়েছেন।

সাকিবের চোট নিয়ে চলেছে লুকোচুরি, মেহেদী মিরাজের ব্যাটিং পজিশন নিয়ে হয়েছে মিউজিক্যাল চেয়ার আর সবশেষ অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজকে করা ‘টাইমড আউট’ বিতর্ক বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলার চেতনাকেই করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। বিশ্বের নানান প্রান্তের নানান বয়সের সাবেক ক্রিকেটাররা সমালোচনা করেছেন সাকিবের এই আচরণের। বাংলাদেশের পেস বোলিং কোচ অ্যালান ডোনাল্ডও সমালোচনা করায় তাকে আবার কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠায় বিসিবি। এমন হতাশার বিশ্বকাপের মধ্যেই ভারত থেকে বাংলাদেশে সংক্ষিপ্ত সফরে ঘুরে যান দুই ক্রিকেটার। সাকিব আসেন শৈশবের কোচের কাছে ‘হেড পজিশন’ ঠিক করতে। লিটন দুবার আসেন সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর কাছে। সাকিবের বদলি হিসেবে শেষ ম্যাচে উড়িয়ে নেওয়া হয় এনামুল হককে, কিন্তু তাকে একাদশে রাখা হয় না। তাহলে কেন উড়িয়ে নেওয়া, এই প্রশ্নেরও উত্তর মেলে না।

২০১৯ বিশ্বকাপেও অষ্টম হয়েছিল বাংলাদেশ, এবারেও তাই। সেবার তাও ইংলিশ কন্ডিশনে দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দলকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এবার তো আফগানিস্তান আর ধুঁকতে থাকা শ্রীলঙ্কা। হারের ব্যবধানও বিশাল। ২০১৯ সালে সাকিব ব্যাটে-বলে ছিলেন অতিমানবীয়, করেছিলেন ৬০৬ রান আর নিয়েছিলেন ১১ উইকেট। এবারে কোনো বলার মতো ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সও নেই।

ক্রিকেট কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিম তাই এই বিশ্বকাপে প্রাপ্তির কিছুই দেখেন না বাংলাদেশের। আফগানদের বিশ্বমঞ্চে নিজেদের মেলে ধরা, রাচিন রবীন্দ্রর মতো তরুণের উত্থান কিংবা কুইন্টন ডি ককের মতো পরিসমাপ্তি; কিছুই পায়নি বাংলাদেশ। তিনি মনে করেন বাংলাদেশের প্রাপ্তি হচ্ছে কিছু শিক্ষা, ‘বিশ্বকাপের মাত্র ছয় সাত মাস আগে কোচ পরিবর্তন করলে, সেটেলড একটা দলের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করলে, ব্যাটিং অর্ডার ঠিক না করে বিশ্বকাপে গেলে, বিশ্বকাপে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে যে ফল ভালো হয় না, এই শিক্ষাটাই আমরা পেলাম। শুধু দুঃখ এই যে, শিক্ষাটার জন্য খুব চড়া মূল্য দিতে হলো।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত