সাম্প্রতিক দশকগুলোতে, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় পরাশক্তি চীন ও উদীয়মান শক্তি ভারতের মধ্যকার বৈরিতা ক্রমশই প্রকট হয়ে উঠেছে। চীন, তার উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পের আওতায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবকাঠামো বিশেষ করে সমুদ্র, সড়ক ও রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই অঞ্চলে চীনা উপস্থিতিকে দৃঢ় করেছে। চীনের এই নয়া কৌশলকে প্রায়ই ‘অবকাঠামোগত কূটনীতি’ হিসেবে অবহিত করা হয়। ভুটান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সব প্রতিবেশী চীনের বিআরআই প্রকল্পের অধীনে বিনিয়োগ গ্রহণ করছে। ২০১৮ সাল থেকে চীন বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, মায়ানমার, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং আফগানিস্তানসহ বেশ কয়েকটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশে ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে শুধুমাত্র অবকাঠামো খাতে। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে ড্রাগন অর্থনীতির দেশ চীনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে ভাবা হয় ‘মালাক্কা ডিলেমা’কে, কিন্তু চীন যেভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগতভাবে নিজেদের উপস্থিতি দিয়ে ‘মুক্তার মালা’ তৈরি করছে তা ভারতের জন্য একই রকম একটি ‘ডিলেমা’ তৈরি করছে। ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল ভৌগোলিকভাবে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন, শুধুমাত্র সংকীর্ণ শিলিগুড়ি করিডোরের মাধ্যমে সংযুক্ত। শিলিগুড়ি করিডর বাংলাদেশ, নেপাল এবং ভুটানের সীমান্তবর্তী একটি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। করিডরটির অদূরে ভুটানের ডোকলামে চীনের উপস্থিতি তাই ভারতকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। একইভাবে চীন-বাংলাদেশ, চীন-নেপাল সম্পর্কেও গভীরতার দিকে ভারতের গভীর পর্যবেক্ষণের অবশ্যম্ভাবী বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাদাখে ভারতের সঙ্গে চীনের সীমান্ত উত্তেজনা এবং ভারতের অরুণাচল প্রদেশকে জুড়ে চীনের মানচিত্র প্রকাশ দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-ভারতের বৈরিতায় নতুন মাত্রা দিয়েছে। ফলে চীন-ভারতের বৈরিতা দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশে প্রতিটি অঞ্চলে অবধারিতভাবে প্রভাব রাখতে যাচ্ছে।
যদিও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে যথেষ্ট সমৃদ্ধ এবং বাংলাদেশে ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে বিস্তর প্রভাব রয়েছে। তার বিপরীতে গত দশকে চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার, বিনিয়োগকারী ও সামরিক মিত্র হয়ে উঠেছে। চীন ও ভারত উভয়ের জন্যই বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানি বাজার। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট আমদানি দাঁড়ায় ৮ হাজার ৯১৬ কোটি ডলারে। একই অর্থবছরে চীন থেকে আমদানি হয়েছে ২ হাজার ৪২৫ কোটি ডলারের পণ্য যা মোট আমদানির ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে একই অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি হয় ১ হাজার ৫১৮ কোটি ডলারের পণ্য, যা মোট আমদানির ১৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি আলোচনাধীন। সেই সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশ দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকা বা সাফটার চুক্তির সুবিধা ভোগ করে।
২০১৬ সালে, যখন বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) চুক্তি স্বাক্ষর করে তখন বিআরআই-এর অধীনে ৪০টি প্রকল্পে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল চীন, যা বাংলাদেশে এখন দৃশ্যমান। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর তথ্য মতে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চীন বাংলাদেশে বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে ৯.৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশের সামরিক বাজারেও চীন ও ভারতের নজর রয়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই)-এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, চীন ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তার মোট অস্ত্র রপ্তানির ২০ শতাংশই বাংলাদেশে রপ্তানি করেছে। পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশ। বাংলাদেশের সামরিকায়নের উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হলো চীনের তৈরি দুই জোড়া সাবমেরিন। বিশ্বের মাত্র ৪২টি দেশের সাবমেরিন রয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি। বর্তমানে ১.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের চীনা তহবিল ও কারিগরি সহায়তায় কক্সবাজারের পেকুয়ায় শেখ হাসিনা সাবমেরিন ঘাঁটি নির্মিত হচ্ছে। এই ঘাঁটি বাংলাদেশকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনের কৌশলগত অবস্থানকেও নিশ্চিত করতে পারে।
বাংলাদেশের সামরিক উচ্চাভিলাষ ও চীনমুখী সামরিক সরঞ্জামে ভাগ বসাতে নয়াদিল্লি ইতিমধ্যে নজর দিয়েছে। গত বছর ভারতে শেখ হাসিনার রাষ্ট্রীয় সফরের সময়, বাংলাদেশ ও ভারত ৫০০ মিলিয়ন ডলারের লাইন অফ ক্রেডিট (এলওসি)-এর অধীনে প্রথম প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তিতে পাঁচটি ব্রিজ লেয়ার ট্যাঙ্ক সাতটি পোর্টেবল স্টিল ব্রিজ এবং টাটা গ্রুপ থেকে ১১টি মাইন প্রোটেক্টিভ যানবাহন ক্রয় করার বিষয়ে সমঝোতা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নৌবাহিনী একটি লজিস্টিক জাহাজ, ভাসমান ডক, তেল ট্যাংকার এবং একটি সমুদ্রগামী টাগবোট সংগ্রহের প্রস্তাব করেছিল। বাংলাদেশ ও ভারতের এই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে একদিকে ভারতের পক্ষ থেকে চীনকে কাউন্টার হিসেবে এবং অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে ভারসাম্য করার কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্প পদ্মা সেতু নির্মাণে চীন কারিগরি নির্মাণ সহায়তা দিয়েছে, তাছাড়া সেতুতে যুক্ত রেল সংযোগ চীনের বিআরআইয়ের অংশ। চীন বাংলাদেশে ইতিমধ্যে চীনের দানে ৮টি চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু তৈরি করেছে আরও দুটি মৈত্রী সেতু আলোচনাধীন। বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশে সেতু কানেক্টিভিটি তৈরি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। চীন আরেকটি নদীভিত্তিক প্রকল্প ‘তিস্তা নদী প্রকল্পের’ ব্যাপারেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি কর্ণফুলী নদীর তলদেশের দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম আন্ডার ওয়াটার টানেল উদ্বোধন করা হয়। এই প্রকল্পটি চীনা অর্থায়নে নির্মিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প যেখানে চীনের ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। প্রকল্পটি উদ্বোধনের কিছুদিন পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যৌথভাবে ভারতের লাইন অফ ক্রেডিট (এলওসি) অর্থায়িত তিনটি উল্লেখযোগ্য প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এই প্রকল্পগুলো হলো আখাউড়া (বাংলাদেশ)-আগরতলা (ভারত) ডুয়েল গেজ রেল প্রকল্প, খুলনা-মংলা বন্দর রেলওয়ে নির্মাণ প্রকল্প এবং বাগেরহাটের রামপাল মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্টের দ্বিতীয় ইউনিট।
চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক মিত্রতার ভারসাম্য ও দুই দেশের অর্থায়িত প্রকল্প উদ্বোধনের ভারসাম্য মূলত এটি বোঝায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে চীন ও ভারতের বৈরিতার অংশ হতে চায় না বরং জটিল ভারসাম্যে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে একটি কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। এই ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য চীন ও ভারত উভয়েরই বাংলাদেশে তাদের আধিপত্য বাড়ানোর আগ্রহ তৈরি হয়েছে। উভয় দেশেরই বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য স্বার্থ, কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। ফলে এটাও ঠিক বাংলাদেশের পক্ষে একটি বিশেষ পক্ষ নেওয়া বেশ কঠিন বরং ভারসাম্য করাটাই শ্রেয়। কিন্তু শ্রীলঙ্কা, নেপাল এবং মালদ্বীপের মতো দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলোর জন্য বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় চীন-ভারত বৈরিতা বেশ প্রকাশ্য রূপ পেয়েছে। এমনকি শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপেও প্রধান দলগুলোকে ‘চীনাপন্থি’ বা ‘ভারতপন্থি’ হিসেবে পরিচিত। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে চীন-ভারত বৈরিতা এখনো দেশীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বিভক্ত করেনি। কিন্তু বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় ও ইন্দো-প্যাসিফিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত ও চীন উভয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে চলা দিনকে দিন কঠিন হচ্ছে। শুনতে মনে হয়, এ যেন সার্কাসের ট্র্যাপিজের তারে ভারসাম্যের খেলা। কিন্তু বিষয়টি মোটেও তেমন নয়, কারণ এটা কেবল কসরতে রপ্ত করে দর্শককে তাক লাগানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না। যেহেতু বাংলাদেশ উভয় দেশের সঙ্গে বেশ গভীর অংশীদারত্ব সম্পর্কে রয়েছে। যা একই সঙ্গে অর্থনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক এবং অবশ্যই প্রতিবেশী হিসেবে নিরাপত্তার মতো জটিলতার আবর্তে জড়িত। অন্যদিকে বিশে^র পরাশক্তিগুলোর সমীকরণও এর সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে বাংলাদেশের জন্য নিকট ভবিষ্যতে চীন ভারতের সঙ্গে ভারসাম্য সম্পর্ক রক্ষার ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক-বিষয়ক রিসার্চ স্কলার, কলামিস্ট
