নবান্নের ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছে শালগ্রাম

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২৩, ০৭:৪৭ পিএম

বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার শালগ্রামে নবান্ন উৎসব ঘিরে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মেয়ে-জামাই আর নাতি-নাতনিদের আগমনে প্রতিটি বাড়ি পরিণত হয় মিলনমেলায়। উৎসব উপলক্ষে শালগ্রামের পাশের গ্রামগুলোতেও বৃহস্পতিবার ভোর থেকে শুরু হয় নানা অনুষ্ঠানের। দিনব্যাপী চলে নানা আয়োজন।

জানা যায়, উপজেলার একটি ব্যতিক্রম গ্রামের নাম ‘শালগ্রাম’। প্রায় সাত হাজার মানুষের বসবাস গ্রামটিতে। মানুষে মানুষে এখনো আত্মিক সম্পর্ক টিকে আছে এই গ্রামে। এ কারণে নবান্ন এলেই যেন উৎসব শুরু হয় গ্রামের প্রতিটি ঘরে। আত্মীয়স্বজনের আগমনে উৎসব হয়ে ওঠে মিলনমেলায়। কোনো কোনো বাড়িতে তো আত্মীয়দের আসা শুরু হয় আরও দিন দুয়েক আগে থেকে। সব মিলিয়ে নবান্নের দিনে এই গ্রামের পুরো ছবি বদলে যায়। বাড়ি বাড়ি উৎসবের আমেজ। পাড়া-মহল্লার মোড়ে মোড়ে বসে বিভিন্ন খাবারের দোকান। নবান্নের দিন নতুন চালের ভাত আর মহিষের মাংস খাওয়া শালগ্রামের পুরোনো রীতি।

শালগ্রামের আজাদ হোসেন নামের এক যুবক বলেন, নবান্ন উপলক্ষে শালগ্রামে এবার শুধু মহিষই জবাই হয়েছে ৭টি। বিশালাকৃতির এই মহিষগুলোর দাম গড়ে তিন লাখ টাকারও বেশি। পাশাপাশি জবাই হয়েছে ১০টি গরু। গ্রামের বিভিন্ন পাড়ায় এবার বুধবার রাত থেকে নবান্নের আয়োজন শুরু হয়ে যায়। শুক্রবার দিনব্যাপী চলে এ আয়োজন।

মহিষের মাংসের সঙ্গে নবান্নের দিনে এই গ্রামের আরেকটি বিশেষায়িত খাবার আটাগোলা শিরনি। কলা, গুড় আর আটার সমন্বয়ে তৈরি হয় এই খাবার। সঙ্গে পিঠাপুলি, ক্ষীর, পায়েস আর নাড়ুর আয়োজন তো আছেই।

শুধু খাবারের এই এলাহি আয়োজন নয়, নবান্ন উপলক্ষে খুব সকাল থেকে গ্রামের প্রতিটি পাড়ায় শিশু-কিশোরদের নিয়ে গ্রাম্য বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন হয়। আর রাতে কোথাও বাউল গান, কোথাও বা লোকজ সংস্কৃতির আসর বসে। কোনো প্রান্তে আবার আধুনিক বাংলা গ্রামের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয়ে এসব অনুষ্ঠান চলে প্রায় মধ্য রাত পর্যন্ত।

উপজেলার শালগ্রামের ডাক্তার পাড়ায় নবান্ন উৎসবের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী কমিটির অন্যতম সদস্য মেহেদী হাসান বলেন, ‘এখানকার এই উৎসব আজকালের নয়, প্রায় ২০০ বছর আগের। ঘরে ঘরে আমন ধান ওঠার পর থেকেই শালগ্রামে শুরু হয় নবান্নের প্রস্তুতি। তাদের বাপ-দাদারাও এমন আয়োজন করতেন। দুই ঈদ মিলে যে আয়োজন হয় না, এক নবান্নে সেই আয়োজন হয় এই গ্রামে। নতুন প্রজন্মের কাছে নবান্ন উৎসবকে পরিচিত করানোর জন্য আমরা প্রায় ৫০ বছর ধরে খেলাধুলার আয়োজন করছি।’

শালগ্রামের পাশের গ্রাম কোমারভোগে শশুরবাড়িতে বেড়াতে আসা স্বপন হোসেন বলেন, নবান্ন উৎসবে শশুর বাড়িতে এসে শালগ্রামে উকি না দিলে সবই বৃথা। গ্রামে ঢুকতেই মেলা শুরু। সড়কের পাশদিয়ে চুড়ি, ফিতা, মিষ্টি ও মাটির হরেক রকমের জিসিনপত্র বিছিয়ে রেখেছে দোকানিরা। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রায় সব বয়সী মানুষরাই ভিড় জমাচ্ছে এসব দোকানে।

ওই গ্রামের ষাটার্ধো আক্কাস আলী বলেন, আমি সেই ছোট থেকে দেখে আসছি, এমন উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়েই এ গ্রামে নবান্ন হয়। তবে আগে আয়োজনের ধরনটা এমন ছিল না। তখন বাড়ি বাড়ি আত্মীয়-স্বজনের বেড়াতে আসা আর নতুন চালের ভাতের সঙ্গে মাংসের ভোজ দিয়েই নবান্ন পালন করা হত। ধীরে ধীরে আয়োজনে বৈচিত্র্য পেয়েছে।

আদমদীঘি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রেজাউল করিম রেজা জানান, গ্রামবাংলার সেই পুরোনো উৎসব দিনে দিনে হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ সেখানে শালগ্রামের মানুষজন নবান্ন উৎসব আজও টিকিয়ে রেখেছে। আয়োজকরা যেন সুষ্ঠুভাবে উৎসবটি পালন করতে পারেন এজন্য পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত