সবরমতী তীরে প্রতিশোধ না পুনরাবৃত্তি

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৩, ০৭:১৩ এএম

মুম্বাইয়ের বোরিভেলি এলাকার কিছু টিনএজার টিভিতে দেখছিল ন্যাট ওয়েস্ট ফাইনাল। দুই দশকের আগের কথা। লর্ডস ব্যালকনিতে সৌরভের জামা খোলা দেখা মাত্র তারা এমন উত্তেজিত হয়ে পড়ে যে কলোনিতে চার-পাঁচজন জামা খুলে শার্ট ওড়াতে শুরু করে দিয়েছিল।

তখন কে জানত অদৃষ্ট তাদেরই একজনের জন্য বিশ্বকাপ ফাইনালে ভারতের হয়ে টস করতে নামা নির্দিষ্ট রেখেছে। রোহিত গুরুনাথ শর্মা।

সেই সময়ের রোহিত আগুনে আক্রমণে বিশ্বাস করেন। মারের বদলে নয় মারের আগে মার। দাদাদর্শন যে ক্রিকেট মাঠে গুডিগুডি হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

অথচ কাপ ফাইনালে একই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কুড়ি বছর আগের তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদী’ সৌরভ দর্শনের তিনি সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে। শনিবার রোহিতের প্রেস কনফারেন্সের কথাবার্তা শুনে নিশ্চিত হয়ে গেলাম তার ইন্ডিয়ান টিমের মন্ত্র ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল। পারিপার্শ্বিক থেকে যত পারো ঠান্ডা থাকো। উত্তেজিত হয়ে বেশি এড্রিনালিন খরচা করে ফেলো না। সংক্ষেপে জহির খান হয়ে যেয়ো না।

ওয়ান্ডারার্স ফাইনালে জহির প্রথম বল থেকে স্লগ করতে শুরু করেছিলেন হেডেন আর গিলক্রিস্টকে। তাতে কী হয়েছিল ইতিহাস জানে। জহির পরে বলেছিলেন টিমের তো ইন্ধন ছিলই। কিন্তু খেলার আগে জাতীয় সংগীত শুনে বাড়তি উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলেন। এরপর এগারোর ফাইনালে তার ফার্স্ট স্পেল ছিল ৫-৩-৬-১। প্রথম তিন ওভার মেডেন। মুম্বাই ইন্ডিয়ানস ড্রেসিংরুমে এসব কথাবার্তা হয়েই থাকে। সেখান থেকে আরও বেশি করে জানেন ভারত অধিনায়ক যে বড় ম্যাচের আবহে ভয়ংকর বিপক্ষের বিরুদ্ধে ফুটবলীয় প্রস্তুতি কাজ দেয় না।

কোথাও মনে হয় রাহুল দ্রাবিড়ের সঙ্গে বসে সার্বিক পরিকল্পনা তৈরিও তার নতুন দর্শনকে এই ছাঁচে এনে ফেলেছে যে এমনভাবে ড্রেসিংরুমের ইন্টেরিয়র ডিজাইন করবে যেখানে ভেতরটা সব সময় ঠান্ডা। প্রত্যেককে বুঝিয়ে দেবে তার নির্দিষ্ট ভূমিকা কী? কতটা চাওয়া হচ্ছে? তারপর কোনো চাপ না নিয়ে এনজয় করবে। শুধু সৌরভ বলছি কেন বিরাট-শাস্ত্রী কম্বিনেশনের স্টাইল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামের ঠিক পেছনে সবরমতী তীরে কোনো ঐতিহাসিক মহাযুদ্ধের কথা মনে করতে পারছি না। কিন্তু সবরমতী আশ্রমের অহিংস নির্ঘোষই যেন রবিবারের মহাযুদ্ধে রো-রা জুটির মন্ত্র। রোহিত কতটা কোচে আচ্ছন্ন, সেটা বুঝলাম যখন আমার প্রশ্নের উত্তরে বললেন, ‘রাহুল ভাইয়ের জন্য কাপ জিততে চাই।’ মনে রাখতে হবে বিশ্বকাপ মঞ্চে রাহুল দ্রাবিড়ও ক্ষুধিত পাষাণ। ভাইস ক্যাপ্টেন হিসেবে রানারআপ আর ক্যাপ্টেন হিসেবে তো গত চল্লিশ বছরে ভারতের সবচেয়ে কলঙ্কিত কাপ অভিযানের নেতা। নিজের কোচিংয়ে কাপ জিততে পারলে কোথাও গিয়ে তারও একটা শুদ্ধি ঘটবে।

সমস্যা হলো এটা পাঁচতারা হোটেলে বড় ক্লায়েন্টের সামনে হাই লেভেল প্রেজেন্টেশন দেওয়া নয় যে আমার সেরাটা তৈরি করতে পারলেই যথেষ্ট। ঠিকঠাক সেটা পেশ করার সমস্যা নেই। এরপর তার ভাগ্যে যা-ই হোক। কম্পিটিটিভ স্পোর্টসের দুনিয়ায় সবকিছু লাইভ। তখনই। রিটেক নেই। দ্বিতীয় সুযোগ নেই। এখানে বিপক্ষ বারবার ঘাড়ে চড়ে যাবতীয় পরিকল্পনা অকেজো করতে চাইবে। যেমন প্রথম ব্যাট করলে শুরু থেকে মারতে চাইবে সিরাজকে।

সবাই কুড়ি বছর আগের হারের প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলছে। কারও কেন মনে পড়ছে না গত জুনের জখম তো আরও টাটকা থাকা উচিত। ওভালে কামিন্সের এই অস্ট্রেলিয়াই তো বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে হারিয়ে দিয়েছিল রো-রা জুটির ভারতকে। সেখানে যিনি আগুনে সেঞ্চুরিতে ভারতকে একা উড়িয়ে দিয়েছিলেন সেই ট্রাভিস হেড ওপেন করবেন ওয়ার্নারের সঙ্গে। তারপর মাঝে ম্যাক্সওয়েল। যাকে হয়তো প্রজেক্ট কুলদীপ অলরেডি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাদা বলের ক্রিকেট দাবা বোর্ডের মতো। ফাইনাল মানে তো আরওই ৬৪ খোপের!

ভারত তার মতো করে প্ল্যান করবে। সরি করে রেখেছে। প্রথম দশ ওভারে রোহিত চার্জ করতে পারেন কি না, তার ওপর ফাইনালের ভবিষ্যৎ অনেকটা নির্ভর করে রয়েছে। ওই চার্জিং ছাড়া পরের ব্যাটাররা সব সময় মারের জন্য পাতানো শতরঞ্চির খোঁজ পান না। চেন্নাইয়ে ভারতের উদ্বোধনী ম্যাচ মনে করা যাক। রোহিত আউট হয়ে যান শূন্যতে। মাত্র ১৯৯ তাড়া করে দুই উইকেটে ৩ হয়ে গিয়েছিল। এরপর ১২ রানে থাকা বিরাটের সহজ ক্যাচ যদি মিচেল মার্শ ফেলে না দিতেন। ধরা যায় ভারতের এবারের বিশ্বকাপ অভিযান হার এবং কাঁটায় ভর্তি সমালোচনা দিয়ে শুরু হতো। দশ ম্যাচে দশের মোমেন্টাম হয়তো তৈরিই হতো না। মার্শের ওই ক্যাচটা ছাড়াই হয়তো এবারের বিশ্বকাপের টার্নিং পয়েন্ট।

কলকাতা থেকে বিরাট কোহলি ফ্যান্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান জানালেন, এবারের বিশ্বকাপের প্রতিটা ম্যাচের মতোই পারফরম্যান্সের অপেক্ষা না করে খেলার আগেই বিরাটের মঙ্গলকামনায় তারা কেক কাটবেন। কোহলি এবারের বিশ্বকাপে নিজেকে চরিত্রবিরোধীভাবে অন্তর্লীন এবং ঠান্ডা রেখে দিয়েছেন। বিশ্বরেকর্ড ভেঙেও প্রেস কনফারেন্সে আসার কোনো কারণ দেখেননি। সেটা মিডিয়াবিদ্বেষ? না কাজটা অসমাপ্ত থাকা পর্যন্ত তপস্যা থেকে উঠতে না চাওয়া? কোনটা, জানি না। তবে রবিবার যদি ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলে দেন তাহলে শচিনকে বড় ম্যাচের চাপ নেওয়াতেও পেছনে ফেলে দেবেন। মনে রাখতে হবে দুটো কাপ ফাইনালের কোনোটাই রান পাননি টে-ুলকার। বিরাট একটায় করেছেন লড়ে ৩৫। বাকিটাও যদি উজ্জ্বল হয়ে সেই উজ্জ্বলতা জীবনভর সঙ্গে থাকবে। পাবলিক মেমোরি যতই শর্ট হোক কাপ ফাইনাল কেউ ভোলে না।

শুবমান বা শ্রেয়াসেরও সেই সুযোগ থাকছে রাতারাতি মহানায়ক বনে যাওয়ার। কাপ ফাইনালের বড় স্কোর লোকে কীভাবে মনে রাখে তার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত মহেন্দ্র সিং ধোনি। ওয়াংখেড়ের সেই অমর ছক্কার আগে টুর্নামেন্টে তার একটা স্কোরও মনে রাখার মতো নয়। হায়েস্ট ছিল ৩৪। সূর্যকুমার যাদব তিনিও কি পারেন টি-টোয়েন্টি ম্যাজিক ওয়ান ডেতে ফেরাতে? তার স্কোয়ার অব দ্য উইকেটের বাইরেও স্ট্রোক তৈরির জন্য কিন্তু দ্রাবিড় আর ব্যাটিং কোচ বিক্রম রাঠোর প্রচুর খেটেছেন। জয় শ্রীরাম ডাকের চেয়ে সূর্যের আলো ক্রিকেট দেবতার অনেক পছন্দ হবে।

এবং তিনি মোহাম্মদ শামি। আন্ডারডগ থেকে যেভাবে টুর্নামেন্টের নতুন সুপারস্টার হয়ে উঠে এসেছেন, তার পাশে বসানোর মাত্র দুটো নমুনা পাচ্ছি। নিরানব্বইয়ের ক্লুজনার। আর বিরানব্বইয়ের ইনজামাম। ভারত কাপ জিতলে প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট হওয়ার দৌড়ে তিনজন কোহলি, রোহিত আর তিনি শামি। প্রথম দিকের ম্যাচগুলো না খেলেও কাপ আকাশে যিনি এমন দীপ্যমান তার কপালে শিকে ছিঁড়লে আশ্চর্য হওয়ার নেই। মাতিয়ে দিয়েছেন এই বিশ্বকাপকে শামি, যাকে মুখ্যত লাল বলের প্লেয়ার করে রাখা হয়েছিল। আগের বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করেও যিনি বাদ পড়েছিলেন তার কামব্যাক শিশুসাহিত্য উপন্যাস নয়। ম্যানেজমেন্ট ক্লাসে পড়ানোর মতো।

এক লাখ কুড়ি হাজারের স্টেডিয়াম। সেই বাতাবরণের একটা চাপ। ফাইনালের চাপ। কমেন্ট্রি বক্সেই তো যা রথী-মহারথীদের ভিড় যে দেখলে কাঁপুনি ধরে যাবে। এর মধ্যে আইসিসি নকআউটে ভারতের সবচেয়ে অপয়া আম্পায়ার রিচার্ড কেটেলবোরো। যিনি থাকলে ভারত মোটামুটি হারে। প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া। সবকিছু মিলে হাড়ে হিম ধরিয়ে দেওয়ার মতো।

কিন্তু কে বলতে পারে এটাই হয়তো রো-রা জুটির নিয়তি। পরিস্থিতি সব প্রতিকূল পড়েছে । আর তারপরও তোমরা ঢেউগুলো টপকে বেরিয়ে যাবে।

খেলার জগতে আগাম ব্যক্তিগত ভাবনাগুলো বোকা বোকা এবং আদ্ধেক সময় মেলেনি। তবু কেন জানি না এবার মনে হচ্ছে ইতিহাসের চাকা ঘোরার সময় আগত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত