সিলেটে আধিপত্য বিস্তারের জেরে ছাত্রলীগের এক গ্রুপের হাতে প্রতিপক্ষ গ্রুপের কর্মী আরিফ আহমদ (১৯) খুন হয়েছেন। নিহত আরিফ নগরীর বালুচর এলাকার ফটিক মিয়ার ছেলে। তিনি টিলাগড়ের স্টেইট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। গত সোমবার রাত ১২টার দিকে নগরীর টিবি গেট এলাকায় আরিফকে উপর্যুপরি কোপানো হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে রাত দেড়টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আরিফের শরীরে ১৫-১৬টি কোপ ও ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। অধিক রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে। আরিফ সিলেট জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি নাজমুল ইসলামের অনুসারী হিসেবে ছাত্রলীগে সক্রিয় ছিলেন। বালুচর এলাকায় জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও নবনির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর হিরণ মাহমুদ নিপুর গ্রুপের সঙ্গে আধিপত্য নিয়ে আরিফ ও তার সহযোগীদের বিরোধ চলছিল। হত্যাকা-ের চার দিন আগেও আরিফের ওপর আরেক দফা হামলা হয়েছিল। এ ঘটনায় গত সোমবার রাতে থানায় এজাহার দেন আরিফের মা। এরপর মধ্যরাতে আরিফকে হত্যা করা হয়।
নিহত আরিফের মা আঁখি বেগম দাবি করেছেন, সিলেট সিটি করপোরেশনের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের নবনির্বাচিত কাউন্সিলর, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিরণ মাহমুদ নিপুর নেতৃত্বে ১৫-২০ জন অতর্কিত হামলা চালিয়ে তার ছেলেকে হত্যা করেছে। আরিফকে যেখানে কোপানো হয়েছে, সেখানে দৌড়ে ছুটে গিয়েছিলেন আঁখি বেগম। এ সময় তিনি হিরণ মাহমুদ নিপুকে মোটরসাইকেলে করে চলে যেতে দেখেছেন। এরপর তিনি স্থানীয়দের সহায়তায় গুরুতর আহত ছেলেকে সিএনজি অটোরিকশায় করে ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরিফ তার মাকে জানিয়েছেন, হিরণ মাহমুদ নিপু, রনি, মামুন, হেলালসহ ১৫-২০ জন মিলে তাকে কুপিয়েছে।
সিলেট জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি নাজমুল ইসলামও এই হত্যাকা-ের জন্য জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিরণ মাহমুদ নিপুর পক্ষকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ‘হিরণ মাহমুদ পক্ষের কর্মীরা আরিফকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছে। কয়েক দিন আগেও তারা আরিফের ওপর আরেক দফা হামলা চালিয়েছিল।’ হামলাকারীরা ছাত্রলীগের কেউ নয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘এরা স্থানীয়ভাবে বখাটে হিসেবে পরিচিত। এলাকায় নিপুপক্ষের আধিপত্য বাড়াতে এরা সক্রিয়।’
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে ওয়ার্ড কাউন্সিলর হিরণ মাহমুদ নিপুর মোবাইল ফোনে কল করে তা বন্ধ পাওয়া যায়।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের শাহপরান থানার ওসি আবুল খায়ের জানান, হত্যাকা-ে জড়িত অভিযোগে দুজনকে আটক করা হয়েছে। এরা হলেন আনাছ আহমদ ওরফে রনি (২৩) ও মামুন মজুমদার (৩২)। এরা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। ওসি আরও জানান, এর আগে আরিফকে মারধর করার ঘটনায় তার মা আঁখি বেগমের করা অভিযোগটি সোমবার রাতেই মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। মামলায় ৭ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামি হিসেবে বালুচরের আনাছ, জুনেদ, কালা মামুন, কুদরত, শরিফ, সবুজ ও হেলালের নাম উল্লেখ রয়েছে। ওসি জানান, হত্যাকা-ে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
পুলিশ ও নিহত আরিফের পরিবারসূত্র জানায়, সোমবার রাতে বাসার কাছের ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে বের হয় আরিফ। এরপর তাকে নির্জন সড়কে ধরে নিয়ে উপর্যুপরি কুপিয়ে সড়কে ফেলে রেখে চলে যায় হামলাকারীরা। আরিফের চিৎকার শুনে তার মা আঁখি বেগম ও আশপাশের লোকজন এগিয়ে গিয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে নেওয়ার কিছুক্ষণ পরই চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, আরিফের বাবা ফটিক মিয়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান এবং মা আঁখি বেগম অন্যের বাসায় রান্নার কাজ করেন। তারা বালুচর এলাকার রাজা মিয়ার কলোনিতে ভাড়ায় থাকেন। চার ভাইয়ের মধ্যে আরিফ সবার বড়। তিনি টিলাগড়ে অবস্থিত স্টেট কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়তেন।
আরিফের মা আঁখি বেগম বলেন, কলেজে ভর্তির পর আরিফ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে তিনি ছেলেকে রাজনীতি না করতে বলেন। তখন আরিফ তাকে জানায় ছাত্রলীগ না করলে কলেজে পড়তে পারবে না। কোনো পদে না থাকলেও আরিফ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল বলে জানিয়েছেন জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি নাজমুল ইসলামও।
নাজমুল আরও বলেন, ‘টিলাগড়, বালুচর, টিবি গেট এলাকার কোনো কর্মী আমার সঙ্গে রাজনীতি করুক সেটা চান না হিরণ মাহমুদ নিপু। ওই এলাকায় তিনি চান একক আধিপত্য। আর সেই আধিপত্য বিস্তারের জেরেই নিপুপক্ষের হাতে খুন হয়েছে আরিফ।’ নাজমুল এই হত্যাকা-ের বিচার দাবি করে বলেন, খুনিদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দাবিতে ছাত্রলীগ আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
