আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম বিক্রি শেষ। এখন চলছে বর্তমান সংসদ সদস্যদের আমলনামা ও গত ৫ বছরের কার্যক্রমের মূল্যায়ন। আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী এমন ৭ জন সংসদ সদস্য আছেন যারা গত ৫ বছরে দলীয় কাজে ১ দিনও এলাকায় যাননি।
এছাড়া এমন ৭৫ জন সংসদ সদস্যরা রয়েছেন যারা গত ৫ বছরে সব মিলিয়ে ৩০ দিনও নিজ এলাকায় যাননি। ৩০ দিনের চেয়েও কম সময় নিজ নির্বাচনী এলাকায় গিয়েছেন এমন এমপিদের সংখ্যাও প্রায় ৩৫ জন। এই এমপিদের এবার মনোনয়ন দেওয়া হবে না বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
তবে যে সংসদ সদস্যরা করোনা মহামারীর সময়ে নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, এলাকার জনগণের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক রেখেছেন তাদের জন্য সুখবর রয়েছে, তাদের পুরস্কৃত করা হবে।
এদিকে আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সভা বসছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। এই মনোনয়ন বোর্ডই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার মাঝি ঠিক করবে। তবে এরই মধ্যে কমবেশি অর্ধেক মাঝি মোটামুটি ঠিক করা হয়েছে গেছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র বলছে, গত দশম ও একাদশ সংসদে যারা দলের সংসদ সদস্য (এমপি) ছিলেন তাদের অনেকেই এবার মনোনয়ন পাচ্ছেন না। যেসব কারণে ওইসব আসনে নতুন প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো নেতাকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ, করোনাকালে এলাকার মানুষের পাশে না থাকা এবং এলাকায় না যাওয়া।
আওয়ামী লীগ দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কাল মনোনয়ন বোর্ড সভা বসলেও ৩০০ সংসদীয় আসনে নৌকার প্রার্থী চূড়ান্ত করতে কয়েক দিন লাগতে পারে। প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজটি হবে বিভাগওয়ারি। সভায় সভাপতিত্ব করবেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আজ বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সকাল ১০টায় ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে মনোনয়ন বোর্ডের সভা হবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান কাজী জাফর উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সুনির্দিষ্ট কিছু ক্যাটাগরি ধরে প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতা বিবেচনায় নেওয়া হবে। তিনি বলেন, এত বড় সংগঠন, কোটি কোটি নেতাকর্মীর মধ্য থেকে ৩০০ জন বেছে নেওয়া খুবই কঠিন কাজ। মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা সে কঠিন কাজ নিয়ে বসতে যাচ্ছেন।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান শেখ হাসিনা প্রায় ছয় মাস ধরে প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজ এগিয়ে রাখতে শুরু করেছেন।
তারা বলেন, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও দলীয় একটি টিম সংসদ সদস্যরা কে কী করছেন তার খোঁজ রেখেছেন। কার কী অবস্থা সেটা তুলে ধরতে কাজ করেছেন। তাদের কাছ থেকে পাওয়া প্রতিবেদন একাধিকবার যাচাই-বাছাই করে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫০টিতে কাকে মনোনয়ন দেবেন তিনি এরই মধ্যে চূড়ান্ত করে রেখেছেন। এসব আসনে দেওয়া সব প্রার্থী জিতবেন এমন হিসাবও করে রাখা হয়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এই নেতারা বলেন, নতুন ও পুরনো মিলিয়ে এই ১৫০ আসনের মনোনয়ন একেবারেই চূড়ান্ত করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির তিন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সর্বোচ্চ তিন দিনের মধ্যে ৩০০ আসনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত হয়ে যাবে। কারণ অর্ধেক আসনে প্রার্থী চ‚ড়ান্ত আগেই হয়ে আছে। মনোনয়ন বোর্ডের সভায় বাকি ১৫০ আসন নিয়ে মূলত আলোচনা হবে। সভা শেষ করে একসঙ্গে ৩০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে।
তারা বলছেন, বাকি যে ১৫০ আসনের জন্য মনোনয়ন বোর্ড প্রার্থী বাছাই করবে, সেখান থেকে অর্ধেক দলীয় প্রার্থী জিতবেন, এমনটাই ধরে রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে ২২৫ আসনে এবার নির্বাচন প্রস্তুতি রয়েছে আওয়ামী লীগের। তবে ১৭০-১৮০ আসন নৌকাকে জিততেই হবে, এমন পরিকল্পনা নিয়ে নির্বাচন প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে যারা সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছেন তারা বাদ পড়বেন বলে জানিয়েছেন নীতিনির্ধারকরা। দুবারের এমপিদের আসনগুলোতে নতুন প্রার্থী দিয়ে চ্যালেঞ্জ নিতে চান শেখ হাসিনা।
এই নেতারা বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেই তালিকার বেশিরভাগই গত দুই সংসদের এমপি।
আওয়ামী লীগের রীতি অনুযায়ী সংসদীয় আসন-১ তথা পঞ্চগড়-১ থেকে মনোনয়ন চূড়ান্ত করা শুরু হয়। এবারও সে রীতি বজায় রাখা হবে বলে জানা গেছে। ৩০০ আসনের প্রার্থী চূড়ান্ত করতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগতে পারে। প্রথম দিন রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের সংসদীয় আসনের দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।
এরপর পর্যায়ক্রমে বরিশাল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, সিলেট ও সর্বশেষ চট্টগ্রাম বিভাগের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। চূড়ান্ত করার পর পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকা আওয়ামী লীগ প্রকাশ করবে বলে সূত্রে জানা গেছে। সে ক্ষেত্রে জোটের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনগুলো ফাঁকা রাখা হবে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের জন্য শনিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে আওয়ামী লীগ। চার দিনে দলটি ৩৩৬২টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে। এতে দলটির আয় হয়েছে ১৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
