সহিংসতার দায় সরকারের নয়

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২৩, ০৬:০০ এএম

আমরা যে প্রশ্নটির উত্তর এখানে খুঁজছি, তার আগে জানা দরকার উত্তরটি কেন খুঁজছি এবং কীভাবে খুঁজছি? প্রশ্নটি জানা এ জন্য দরকার যে, পাগল ও শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয় কথাটি বলেছিলেন বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সে হিসেবে গণমাধ্যম কর্মীও নিরপেক্ষ নয়। তারাও দলীয় প্রভাবমুক্ত না-ও হতে পারেন। তারপরও ধরে নিচ্ছি, নিরপেক্ষতার চেষ্টা করে লিখতে হবে। সে জন্য আমাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করতে হবে যে দেশে কোনো রাজনৈতিক দল আছে!

যখন একটি গাড়িতে কেউ আগুন লাগিয়েছে, তাতে গাড়িটি পুড়েছে এবং কয়েকজন হতাহত হয়েছে। তখন প্রথমেই দৃষ্টি চলে যাবে আইনপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের দিকে। কেননা আইনের প্রথম পদক্ষেপ হবে, যারা আগুন দিয়েছে ও আগুন দিতে প্ররোচিত করেছে তাদের চিহ্নিত করা এবং বিচারের আওতায় আনা। এরপর জানতে হবে, যে অপরাধটি করেছে এবং অপরাধটি করার জন্য যে প্ররোচিত করেছে তার বয়স কত? তারা পাগল বা শিশু কিনা? যদি তা না হন, তবে তাদের দোষী দেখিয়ে অভিযোগ গঠন করে তথা দায়ী করে মামলা দিতে হবে। মোট কথা অপরাধ যে বা যারা করেছে, তার দায় তাকেই নিতে হবে। এরপর কোনো কোনো ব্যক্তি বা গণমাধ্যম যদি প্রশ্ন করে, অপরাধটির জন্য আসলেই দায়ী কারা? এর উত্তরে প্রথমে জানব, কোনো তথ্যের ঘাটতির কারণে আমি জানি না কারা দায়ী। যদি তথ্য ঘাটতি থাকে সেটা আগে সঠিকভাবে পূরণ করা দরকার। এরপরও যদি না জানি, ‘দায়ী কারা’ তাহলে প্রশ্ন হতে পারে, আমরা কি আইনের শাসনের প্রতি সন্দিহান? নাকি আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট, যা আমাকে সঠিক অনুধাবনে বাধা দিচ্ছে? আমরা শুধু সন্দেহের বশে যখন উত্তরটা খুঁজছি তখন কেন খুঁজছি? নিশ্চয় কাউকে দায়ী করার জন্য। অবশেষে সন্দেহের বশেই কাউকে দায়ী করছি। সে কে? এবং আমিই কে? উত্তর দুটি মিলিয়ে দেখুন, আসলেই পক্ষপাতদুষ্ট কিনা?

আর সেই উত্তরটা কীভাবে খুঁজছি, সেটা কী অনুমানের ওপর নির্ভর করে নাকি প্রমাণাদির ওপর নির্ভর করে? যারা অনুমানের ওপর নির্ভর করে বলছেন, তারা অবশ্যই কোনো না কোনো পক্ষপাতে প্রভাবিত। তাই তাদের জন্য বাক্য ব্যয় কারও কোনো কাজে আসবে না। তবে যারা প্রমাণাদির ওপর নির্ভর করে উত্তর খুঁজছেন তার কি খেয়াল করেছেন যে,

ক) নৈরাজ্য ও সংঘাতকে উসকে দিতে কোন দলের নেতারা বক্তব্য রেখেছিলেন বা রাখছেন?

খ) তাদের বক্তব্য কারা অনুসরণ করে ও বাস্তবায়ন করে?

গ) সহিংস সংঘাত বা হঠাৎ আগুন দেওয়ার মতো অপরাধের অভিযোগে ঘটনাস্থল থেকে কিংবা সিসি-ক্যামেরা ফুটেজ অনুসরণ করে যাদের আটক হচ্ছে তারা কোন দলের?

ঘ) তারা ছাড়া অন্য কেউ এ অপরাধটি করে থাকলে তার পক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ আছে কিনা?

ঙ) যে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মস্তিষ্কের লোকের অপরাধের দায় আইন অনুযায়ী কার হয়ে থাকে?

এসব উত্তর আমাদের সবার জানা। আমরা বিবেচনা বা বিশ্লেষণতাড়িত না হয়ে আবেগ বা পক্ষ নিয়ে যখন কথা বলি, তখনই বিকৃতি ঘটাই। ফলে যারা অপরাধটি ঘটিয়েছে তাদের দায় না দিয়ে সরকারকে বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে দায়ী করার পেছনে বিশেষ কোন প্রবণতা আমাদের প্রভাবিত করে।

গত ২৮ অক্টোবরের পর দেশে বিএনপির ডাকা পঞ্চম দফা প্রায় লাগাতার অবরোধ বা হরতাল চলছে। ২৮ অক্টোবর বিএনপির ডাকা সমাবেশের দিন থেকে পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করা, বিভিন্ন যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, চলমান যাত্রীবাহী বাস, থেমে থাকা যাত্রীবাহী ট্রেনসহ অসংখ্য গণপরিবহনে আগুন দেওয়া ইত্যাদি সহিংস ঘটনা ঘটে চলছে। সরকার বলছে এই দায় বিএনপির। পুলিশের অভিযানে এ পর্যন্ত ১২ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে বলে বিএনপির দাবি। সরকার পতনের এবং নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এরূপ আন্দোলন (তাদের ভাষায় শান্তিপূর্ণ) চলবে বলে বিএনপির বিভিন্ন নেতার বক্তব্য গণমাধ্যমে এসেছে। তাই আবারও প্রশ্ন আসে, দায়টি কার?

এবার আরেকটা হাইপোথিসিস দাঁড় করাই। বিএনপির আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত জনসাধারণের ওপর অতর্কিত হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার জন্য যদি সরকারকে দায়ী করতে হয় তাহলে প্রমাণ করতে হবে যে, সরকার তাদের দলীয় লোকজন ও বাহিনী দিয়ে এসব অপরাধ ঘটিয়েছে। কিংবা প্রমাণ করতে হবে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী বিএনপির লোকজনকে লক্ষ্য করে পুলিশ অ্যাকশনে গিয়েছে অতঃপর তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে ভাঙচুরের মতো সহিংস ঘটনার আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশের রাজপথের আন্দোলনে এতটুকু ঘটনা অনেক সময়ে জনসমর্থিত হয়েছে। কিন্তু সাধারণ জনগণকে হত্যা করে, ভীতি প্রদর্শন করে, থেমে থাকা ট্রেনে আগুন দিয়ে, চলমান বাসে সিএনজিতে আগুন দিয়ে, পেট্রোল বোমা ছুড়ে সাধারণ মানুষ পুড়িয়ে, মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদ ধ্বংস করার নামে আন্দোলন জনসমর্থিত হয়নি। বিএনপির চলমান আন্দোলনের সহিংসতায় সরকারকে দায়ী করার পক্ষে আরেকটা লঘু যুক্তি হতে পারে, যদি যে কারও দ্বারা হামলা বা অগ্নিসংযোগের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পদক্ষেপ নিতে দেরি করে এবং এর জন্য ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কীভাবে প্রতিরোধ করছে, তাদের সক্ষমতা কতটুকু ইত্যাদি এখানে বিবেচ্য। 

নিরীহ জনগণের ওপর অতর্কিত হামলা গুরুতর অপরাধ। এটা রাজনৈতিক দাবি আদায়ের বা ক্ষমতায় যাওয়ার আন্দোলনের কোনো রীতি বা পদ্ধতি হতে পারে না। বিএনপির আন্দোলন চলাকালে যেহেতু এরূপ ঘটেছে তাই এটা কে করছে নিশ্চিত করা বিএনপির জন্য আগে দরকার। যদি তারা অস্বীকার করে এসব অপরাধের জন্য দায়ী নয়, তবে এই অপরাধ আদতে কারা করছে তা পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি স্থগিত করা উচিত। কারণ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা আগে এবং ক্ষমতায় যাওয়া পরে এটাই গণতন্ত্রের রীতি। যেসব সাধারণ মানুষ হামলা বা যারা সংঘাতের শিকার তাদের দোষ কী ছিল? তাদের প্রতি অবিচারের দায় তো ঘটনাকারীকে নিতেই হবে? নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির যে আন্দোলন, তার বয়স পনেরো বছরের অধিক। সমস্যা নেই, বিএনপি এই সময়টা আরও দীর্ঘায়িত করতেই পারে। শত বছর পরেও যদি কোনো আন্দোলন জনসমর্থন পায়, সেটাও একটা সফলতা। কিন্তু এই আন্দোলন জনসম্পৃক্ততা না থাকলে সেই সফলতা কখনোই আসবে না। ইতিহাসে তার প্রমাণ নেই। অন্তত আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস এমন কথাই বলে।

জ্বালাও-পোড়াও হত্যা দিয়ে জনসম্পৃক্ততার পরিবর্তে জনবিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। এই কথা মনে রাখতে হবে। এভাবে চলতে থাকলে, সেটা একসময় দলটির ধ্বংসের কারণও হতে পারে। অন্য দল তো দূরের কথা, নিজ দলের অনুসারীরাই একসময়ে এসব অপরাধের দায় আর নিতে চাইবে না। তারা শান্তির ও মর্যাদার জীবন চাইবে। রাজনীতি যারা করতে জানে, তারা ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো দলের কাছে মাথা বিক্রি করে না। জন-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হলে জনগণের পাশাপাশি সচেতন নেতাকর্মীরাও মুখ ফিরিয়ে নেবে। আর এভাবেই উদোর পি-ির দায় বুধোর ঘাড়ে চাপানোর দিন শেষ হয়ে আসবে।

নিজের নাক কেটে, অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করার রাজনীতি দিয়ে আর যাই হোক, দেশের কোনো মঙ্গল হয় না। রাজনীতির নামে বিকারগ্রস্ত হয়ে, জনগণকে জিম্মি করে যা ইচ্ছা করার দিন চলে গেছে। এখন আর এটা সম্ভব নয়। যত তাড়াতাড়ি বিরোধী দল বিষয়টি উপলব্ধি করবে, ততই মঙ্গল। আর না করলে, পরিণতির জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। সাধারণ মানুষ সব বোঝে। তাদের যারা বোকা মনে করে, সেই ‘রাজনীতিবিদদের’ প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি শুধু শুধু বিশৃঙ্খলা না করে, সুস্থ ধারার রাজনীতি-সংগ্রামে বিরুদ্ধাচরণ করুন। হয়তো এর ফলে, কিছুটা হলেও অর্জন হতে পারে। না হলে পরিণতি কী হবে, তা দেখা যাবে দ্রুতই।  

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত