বাংলাদেশ সময় কাল ভোরে মারাকানায় সুপার ক্লাসিকো শুরুর আগে বাজছিল আর্জেন্টিনার জাতীয় সংগীত। গ্যালারিতে থাকা আর্জেন্টাইন সমর্থকরা গলা মেলাতে থাকেন মেসিদের সঙ্গে। তবে এ সময় ব্রাজিল সমর্থকরা দুয়ো দিতে থাকেন তাদের। আর্জেন্টাইন সমর্থকরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের ওপর চড়াও হলে বেধে যায় মারামারি। পুলিশ এসে পিটিয়ে তাদের আলাদা করে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে। দেখা যায় আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ওপর বেশি চড়াও হচ্ছে পুলিশ। মেসি-মার্তিনেজরা ছুটে যান গ্যালারির কাছে। নিবৃত্তের চেষ্টা করেন পুলিশকে। ঘটনায় ক্ষুব্ধ মেসি দল নিয়ে ড্রেসিং রুমে চলে যান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে নির্ধারিত সময়ের আধা ঘণ্টা পর খেলা শুরু হলে তারা অংশ নেন তাতে।
ম্যাচ শেষে মেসি এ নিয়ে বলেন, ‘এটি খারাপ কেননা আমরা দেখেছি তারা (ব্রাজিলের পুলিশ) কীভাবে মানুষদের পিটিয়েছে। আমাদের পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যও ওখানে ছিল। কোপা লিবার্তাদোরেসের ফাইনালেও একই কাজ করেছে তারা। মাঠে খেলার চেয়ে সে সবেই তাদের মনোযোগ বেশি থাকে। আমরা একটা পরিবার। পরিস্থিতি শান্ত করতেই আমরা ফের মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’
আর্জেন্টিনা দলের ড্রেসিং রুমে যাওয়া নিয়ে মেসিকে উদ্দেশ্য করে ব্রাজিলিয়ান নাম্বার টেন রদ্রিগো মন্তব্য করেন। মেসিকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকেন, ‘তোমরা কাপুরুষের মতো চলে গিয়েছিলে।’ জবাবে চুপ ছিলেন না মেসিও। বলেন, ‘আমরা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। আমরা কেন ভয় পাব, মুখ সামলে কথা বলো।’
সমর্থকদের এমন ঘটনার প্রভাব যেন দেখা গেল ম্যাচেও। ফাউল হয়েছে বেশ। পুরো ম্যাচে ব্রাজিল ফাউল করেছে ২৬টি, আর্জেন্টিনা ১৬টি। প্রথমার্ধে দুই দলের খেলাও ছিল অগোছালো। বলের নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা, তবে তিনটি প্রচেষ্টার কোনোটাই লক্ষ্যে রাখতে পারেনি তারা। ব্রাজিলের চার শটের একটি ছিল লক্ষ্যে।
বিরতির পর জমে ওঠে খেলা। ৫৪ মিনিটে সতীর্থের লং পাস পেয়ে রাফিনহা শটও নিয়েছিলেন কাছের পোস্টে। তবে এমি মার্তিনেজ রক্ষা করেন দলকে। ৬৩ মিনিটে মারাকানার গ্যালারি স্তব্ধ করে দিয়ে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। জিওভান্নি লো সেলসোর কর্নারে লাফিয়ে করা হেডে বল জালে পাঠান ওতামেন্দি। ৭৭ মিনিটে দুটি পরিবর্তন আনেন স্কালোনি। মেসিকে তুলে ২০২২ কোপা জয়ের নায়ক ডি মারিয়াকে নামান। হুলিয়ান আলভারেজের বদলি নামেন লাউতারো মার্তিনেজ।
৮১ মিনিটে আরেক ধাক্কা খায় ব্রাজিল। রদ্রিগো ডি পলের সঙ্গে বলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লড়াইয়ের সময় ওয়েলিংটন জিততে না পেরে প্রতিপক্ষকে ধাক্কা মেরে লাল কার্ড দেখেন। ব্রাজিল দশ জনের দলে পরিণত হলেও বাকি সময়ে আর গোল করতে পারেনি আর্জেন্টিনা। দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে ডগলাস লুইসের শট প্রথম দফায় আটকানোয় পর দ্বিতীয় চেষ্টায় মার্তিনেজ গ্লাভসবন্দি করেন। আর গোল শোধ দিতে পারেনি সেলেকাওরা।
আগের ম্যাচেই উরুগুয়ের কাছে হেরেছিল লিওনেল স্কালোনির দল। ব্রাজিলকে হারিয়ে জয়ে ফিরল আলবিসেলেস্তেরা। আর ব্রাজিল এবারের বিশ্বকাপ বাছাইয়ে এ নিয়ে টানা তিন ম্যাচ হারল। পয়েন্ট টেবিলের ছয় নম্বরে নেমে গেছে ফার্নান্দো দিনিজের দল। হারের পর ব্রাজিল কোচ দিনিজ বলেন, ‘পরিসংখ্যানই সব নয়। যদি পরিসংখ্যান দেখা হয়, তবে সবকিছুই খারাপ। কিন্তু আমরা যদি এটাকে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখি, খেলোয়াড়দের দেখি, তবে অনেক কিছুই পাওয়া যাবে। আজ আমাদের মাত্র তিনজন খেলোয়াড় ছিল, যারা গত বিশ্বকাপে খেলেছে। আর্জেন্টিনা প্রায় পূর্ণশক্তির দল নিয়ে খেলেছে।’ ইনজুরি ও নানা কারণে ব্রাজিল দলে ছিলেন না নেইমার, ভিনিসিউস, ক্যাসেমিরো, মিলিতাওসহ বেশ কিছু খেলোয়াড়।
দিনিজের মতে, দল এখন পুনর্গঠনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। যে কারণে প্রত্যাশিত ফল আসছে না। তবে ব্রাজিল দল ধীরে ধীরে উন্নতি করছে বলেও মনে করেন তিনি। ‘খেলা আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। যখন অনুশীলনে আপনার নিয়ন্ত্রণ থাকে, খেলাতেও আপনি সেটা দেখানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু কখনো কখনো ফল হাতছাড়া হয়ে যায়। বিকাশ এবং পুনর্গঠন বন্ধ রেখে কীভাবে আপনি জিতবেন? এই ছেলেদের ওপর আমরা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলব, যাদের অনেকেই জন্মেছে ২০০০ সালের পর? এরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। এই খেলোয়াড়রা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আপনি যদি উন্নতি করতে পারেন, তবে ধারাবাহিকভাবে সেটি ফুটে উঠবে।’
বিশ্বকাপ বাছাইয়ে এটাই প্রথম হার ব্রাজিলের। আর্জেন্টিনার কাছে শেষ তিন দেখাতেই হারল তারা। শেষ চার মুখোমুখিতে আর্জেন্টিনাকে হারাতে পারেনি ব্রাজিল। তিনটি জিতেছে আর্জেন্টিনা, একটি গোলশূন্য ড্র হয়। আরেকটি ম্যাচ প- হয়।
এরমধ্যে দিয়ে বাছাইপর্ব শেষ হলো। ১৫ পয়েন্ট নিয়ে আর্জেন্টিনা শীর্ষে। মাত্র ৭ পয়েন্ট নিয়ে ব্রাজিল ১০ দলের মধ্যে ছয় নম্বরে। গতকাল দারউন নুনেজের জোড়ায় বলিভিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে উরুগুয়ে ১৩ পয়েন্ট নিয়ে দুই, কলম্বিয়া ১২ পয়েন্ট নিয়ে তিনে অবস্থান করছে।
দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বের পরবর্তী ম্যাচ আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে।
