মাস্টারপ্ল্যানে ঢাবির পরিবেশ ফিরুক

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২৩, ১০:১২ পিএম

আবাসন ও অবকাঠামো সংকট, গণরুম, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের দৌরাত্ম্য, শিক্ষার মান এবং পরিবেশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় সারা বছরই গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে থাকে। চলতি সপ্তাহের তিনটি ঘটনার কথা উল্লেখ করলেই এর একটি চিত্র পাওয়া যাবে। গত বুধবার ঢাবির একটি হলের ‘গেস্টরুমে’ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নির্যাতনের শিকার হয়ে টিএসসিতে তিন ঘণ্টা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন এক ছাত্র। পরে অভিভাবকের সহায়তায় তাকে হলের কক্ষে তুলে দিয়েছেন হল প্রাধ্যক্ষ। একই দিনে ঢাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের বাথরুমের লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে মারামারির ঘটনায় দুই শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। সর্বশেষ ঘটনাটি গত সোমবারের। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় ঢাবির আলোচিত অপরাধী চক্র ‘প্রলয় গ্যাংয়ের’ ৪ সদস্যকে সেদিন সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এই তিনটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলেই ঢাবির আবাসন ও অবকাঠামো সমস্যা, রাজনৈতিক চর্চা এবং নিরাপত্তার বিষয়টির চিত্র পাওয়া যায়, যা মোটেই শিক্ষার্থীবান্ধব নয়।

প্রশ্ন হলো শিক্ষার্থীরা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেও বছরের পর বছর যথাযথ আবাসনের সুবিধা না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হয়, অবকাঠামো সংকটের কারণে ঠিকমতো ক্লাসরুম না পায়, অনুশীলন ও পড়ালেখার মতো পরিসর ও পরিবেশ না পায় এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে তাহলে তারা শিক্ষায় মনোনিবেশ করবে কীভাবে? পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বিশ্বমানের গ্রন্থাগার ও আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র না থাকা, হলে আসনস্বল্পতা, গণরুম কালচার প্রভৃতি সমস্যায় ভারাক্রান্ত উচ্চশিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান অর্জনের স্বপ্ন এসব ছাড়া কীভাবে সম্ভব? দিনে দিনে সমস্যাগুলো প্রকটতর হচ্ছে। বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘স্বপ্নগুলো মাস্টারপ্ল্যানে বন্দি’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সমস্যা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) গ্রহণ করা হলেও তাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। নতুন করে ৯৭টি ভবন নির্মাণ, পুরনো ভবনগুলোর সংস্কার, টিএসসিকে আধুনিক করে গড়ে তোলা, লাইব্রেরি সংস্কার, বিদ্যুৎব্যবস্থাকে সোলার করা, শিক্ষার্থীদের হাঁটার জন্য আলাদা লেন করা, সাইকেল চলাচলের জন্য আলাদা লেন করা প্রভৃতি বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে এই মাস্টারপ্ল্যানে।

বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীরা সংকট সমাধানের দাবিতে উপাচার্যের শরণাপন্ন হলে কিংবা আন্দোলনে নামলে, তাদের স্বপ্ন দেখানো হয় মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হলে সমস্যা আর থাকবে না। আশ্বাসের মুলা দেখিয়েই তাদের ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। অথচ, সিন্ডিকেট মাস্টারপ্ল্যান অনুমোদন করার চার বছর পার হলেও অগ্রগতি নেই। জানা গেছে, প্রথম ধাপের প্রকল্পও এখনো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ওঠেনি। কবে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে তা স্বয়ং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও জানে না। গত ২৩ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ হাজার ৯৮ জন শিক্ষার্থী বাড়লেও হলগুলোতে আসনসংখ্যা বেড়েছে মাত্র ৫ হাজার ৬৯৬। আবাসন সংকটে প্রকটতর হয়েছে ‘গণরুম সংস্কৃতি’। লাইব্রেরি সমস্যা অনেকটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পড়ার জন্য একটি আসন পেতে ভোরবেলা থেকে শিক্ষার্থীদের ছোটাছুটি শুরু হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মুর্তজা মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসাসেবা নিয়ে ক্ষুব্ধ। পর্যাপ্ত ক্লাসরুম না থাকায় ভোগান্তি পোহাতে হয় অনুষদের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। পর্যাপ্ত ল্যাব, আধুনিক জিমনেশিয়াম, পার্কিং সুবিধাসহ যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণসহ বেশ কিছু দাবি রয়েছে শিক্ষার্থীদের। জ্ঞানচর্চার অন্যতম শর্ত শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ধরনের পরিবেশের অভাব প্রকট। পুরো ক্যাম্পাসে নোংরা আবর্জনার জন্য ভীষণ দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া ক্যাম্পাসে অনেক ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়।  নারী শিক্ষার্থীদের চলাচল অনেক সময়ই এদের কারণে বিঘ্নিত হয়। আর ক্যাম্পাসের রাস্তায় অনেক সময় মাত্রাতিরিক্ত যানবাহনের কারণে যানজট, এমনকি দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, মৌলিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। প্রশাসন আন্তরিক হলেই মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব। একই দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা। শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলোর সমাধান দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক নেতারাও। সার্বিকভাবে এজন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছাও দেখাতে হবে। মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হোক, স্বপ্ন ডানা মেলুক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত