দৃশ্যপট ১: মালেতে স্বাগতিক মালদ্বীপের বিপক্ষে ৮৭ মিনিটে গোল খেয়ে হারের শঙ্কায় বাংলাদেশ। ২ মিনিট পর বিশ্বনাথ ঘোষকে উঠিয়ে হাভিয়ের কাবরেরা মাঠে নামালেন সাদউদ্দিনকে। এই রাইটব্যাক অতিরিক্ত সময়ে গোল করে এক ঝটকায় খুলে ফেললেন গায়ের জার্সি। গোলের উদযাপন শেষ হতেই রেফারির পকেট থেকে বের হলো হলুদ কার্ড।
দৃশ্যপট ২: ৭২ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে ডান পায়ের জোরালো শটে লেবানন কিপারকে পরাস্ত করেই দৌড়ে গ্যালারির ফেন্সিংয়ে চড়ে বুনো উল্লাসে মাতলেন শেখ মোরসালিন। কয়েক মিনিটে উদযাপন শেষ করে মাঠে ফিরতেই কোরিয়ান রেফারি তাকে দেখালেন হলুদ কার্ড। যা দেখে সাধারণ গ্যালারির চেয়ার থেকে আচমকা উঠে দাঁড়ালেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। পাশে থাকা সহ-সভাপতি ইমরুল হাসানের কাছে একটু বিরক্তিই যেন প্রকাশ করলেন সাবেক এই ফুটবলার।
দৃশ্যপট ৩: খেলা শেষ হয়েছে। ৭৯ ধাপ এগিয়ে থাকা লেবাননকে ১-১ গোলে রুখে দিয়ে উল্লাসে মেতেছে বাংলাদেশের ফুটবলাররা। খানিক বাদে মিক্সড জোনে মোরসালিনকে পেয়ে গেলেন বাফুফে বস। কাছে ডেকে অহেতুক কার্ড দেখায় একটু বকে দিলেন তরুণ ফরোয়ার্ডকে। সতর্ক করে বললেন আবেগ সংবরণ করতে। নিজে শীর্ষ পর্যায়ে সুনামের সঙ্গে খেলেছেন দীর্ঘদিন। কোচিংয়েও পেয়েছেন সাফল্য। তাই তিনি জানেন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অহেতুক হলুদ কার্ড দলের জন্য ভীষণ ক্ষতির।
তিনটি দৃশ্যপটের সারমর্ম- দলের জন্য দুর্ভাবনার। এতে জাতীয় দলের শেষ চার ম্যাচের পরিসংখ্যানে কেবল শঙ্কা বাড়ে। শেষ চার ম্যাচে খেলোয়াড়রা দেখেছেন ১৫টি হলুদ কার্ড! যার একটি রঙ বদলে হয়েছে লালকার্ড (দুই হলুদ কার্ড)। গড়ে সাড়ে তিনটি কার্ড দেখা মোটেই ভালো বার্তা দিচ্ছে না। কার্ডের অহরহ দর্শনে দলকে দিতে হচ্ছে চড়া মাশুল। ফি ম্যাচেই কার্ডের খাঁড়ায় কাটা পড়তে হচ্ছে একাধিক ফুটবলারকে। অতিরিক্ত কার্ড দর্শনে মøান হচ্ছে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ দলের বিল্ড-আপ ফুটবল। ফিকে হচ্ছে পাসিং ফুটবলে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার ইতিবাচক দিকটি।
চারটি ম্যাচ দেখেছেন, তারা অন্তত মেনে নেবেন স্প্যানিশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরা বাংলাদেশ দলের খেলার গুণগত মানে এনেছেন পরিবর্তন। বলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ফুটবলাররা একেবারে নিজ ঘর থেকে শুরু করছে বিল্ড-আপ ফুটবল। গোলকিকে গোলকিপার এখন আর উদ্দেশ্যহীন লম্বা বল ফেলেন না; বরং ছোট পাস বাড়ান কাছের কোনো ডিফেন্ডারকে। কিপার-ডিফেন্ডাররা নিজেদের বক্সেই খেলে ফেলছেন একাধিক পাস। বল দেওয়া নেওয়া করে চাইছেন আক্রমণে যেতে। লেবাননের বিপক্ষে বাংলাদেশের একটা মুভ চোখের আরাম দেয়। আক্ষেপ, সেটিকে গোলে পরিণত করতে পারেননি মোরসালিন। ৮৯ মিনিটে রফিকুল ইসলামের পাসে মোরসালিনের শট বাইরের নেট কাঁপালে নিশ্চিত জয় হাতছাড়া হয় বাংলাদেশের। জেনে অবাক হবেন, বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা টানা ১৬টি পাস খেলে রচনা করেছিল সেই আক্রমণ! এর মধ্যে ব্যাকপাস, থ্রু-পাস, এরিয়াল, স্কয়ার পাস যেমন হয়েছে, আবার প্রান্ত বদলও হয়েছে। বিশ্ব ফুটবলে যে চিত্রের দেখা মেলে অহরহ, সেটাই এখন খেলছে বাংলাদেশ। কাবরেরা ফুটবলারদের বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে শেখাচ্ছেন।
বদলে যাওয়া ফুটবলে বাহবা পেলেও, মাত্রাতিরিক্ত কার্ডের দায়টাও এড়াতে পারবেন না ফুটবলাররা। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের চার ম্যাচের প্রথম দুটি ছিল মালদ্বীপের বিপক্ষে প্রথমপর্ব। মালেতে প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ দেখে চার হলুদ কার্ড। সাদউদ্দিন, বিশ্বনাথ ঘোষ, মোহাম্মদ হৃদয় ও মোহাম্মদ সোহেল রানা কার্ড দেখে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়েন। ফিরতি ম্যাচে কার্ড সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। ম্যাচের ৫৯ মিনিটে মোহাম্মদ সোহেল রানা অহেতুক ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। তাতে দল যেমন বিপদে পড়ে, তিনিও বাদ পড়েন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ থেকে। মালদ্বীপের বিপক্ষে ঘরের মাঠে আরও কার্ড দেখেন ফয়সাল আহমেদ ফাহিম, রাকিব হোসেন ও বড় সোহেল রানা। মালদ্বীপ বাধা টপকে দ্বিতীয়পর্বে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৭-০ তে বিধ্বস্ত হওয়া ম্যাচে হলুদ কার্ড দেখেন রাকিব, সাদ ও হাসান মুরাদ। প্রথম দুজনের আগেও কার্ড থাকায় বাইরে থাকতে হয় লেবাননের বিপক্ষে ঘরের মাঠের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে। লেবাননের বিপক্ষে মঙ্গলবার মোরসালিন ছাড়াও কার্ড দেখেন বড় সোহেল রানা ও ডিফেন্ডার শাকিল হোসেন। পরিণতিতে বাছাইয়ের সামনের ম্যাচটা খেলতে পারবেন না বড় সোহেল রানা। একটি করে কার্ড দেখায় নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে আছেন সাতজন- মোহাম্মদ সোহেল রানা, ফাহিম, মোরসালিন, বিশ্বনাথ, হৃদয়, হাসান মুরাদ ও শাকিল।
কার্ড নিয়ে একটা বিতর্ক এর মধ্যেই হয়েছে দলের অভ্যন্তরে। লেবাননের বিপক্ষে ম্যাচে নামার দুদিন আগে রাকিব ও সাদ জানতে পারেন তারা খেলতে পারবেন না। এ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য শোনা গেছে খেলোয়াড় ও টিম ম্যানেজমেন্টের কাছ থেকে। খেলোয়াড়দের দাবি তারা জানতেন তিন হলুদ কার্ডে নিষেধাজ্ঞা। এই বাছাইয়ে যে নিয়ম বদলেছে, সেটা তারা জানতেন না। আর টিম ম্যানেজমেন্ট বলছে এ সব কিছুই খেলোয়াড়দের জানানো হয়েছে।
অহেতুক কার্ড দর্শনে বাফুফে প্রধানের বিরক্তিটা যেমন প্রকাশিত হয়েছে, কাবরেরার মনোভাব প্রকাশ না পেলেও বুঝতে বাকি নেই এ নিয়ে তিনি আছেন অস্বস্তিতে। বিল্ড-আপ ফুটবল, পাসিং ফুটবলে খেলোয়াড়দের অভ্যস্ত করে তোলা কোচকে তাই কার্ডের বদভ্যাস বদলাতেও নিতে হবে এক্সট্রা ক্লাস।
