দল হারছে ভারতে সুজন ব্যস্ত রাজশাহীতে

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৩, ০১:১৯ পিএম

ভারতের মাটিতে চার দলের টুর্নামেন্টে ৬ ম্যাচের ৫টিতেই হেরেছে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল। মাত্র মাসখানেক পরই দক্ষিণ আফ্রিকায় হবে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ, যা আইসিসির সবশেষ সভায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে শ্রীলঙ্কা থেকে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক খালেদ মাহমুদ সুজন গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের পরিচালক, কিন্তু যুবদলের চেয়ে জাতীয় দলের সঙ্গেই তার সম্পৃক্ততা বেশি। বিশ্বকাপে জাতীয় দলের টিম ডিরেক্টর হয়ে মাস দেড়েকের বেশি সময় ভারতে জাতীয় দলের সঙ্গে কাটিয়ে এসেছেন সুজন। কিন্তু সেই একই দেশে যুবদল যখন খেলছে এবং একের পর এক ম্যাচ হারছে, তখন সুজন ব্যস্ত রাজশাহীতে, যেখানে বাংলাট্র্যাক ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে তিনি কর্মরত।

বিশ্বকাপের ডামাডোলের ভেতরই ১০ নভেম্বর ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের বিজয়ওয়াড়াতে চার দলের টুর্নামেন্টে অংশ নিতে যায় অনূর্ধ্ব-১৯ দল। বাকি তিন প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৯, ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ ‘এ’ ও ‘বি’ দল। মূলত বিশ্বকাপ সামনে রেখেই যুবদলের প্রস্তুতিতে এই আয়োজন, যেখানে বাংলাদেশের তরুণদের পারফরম্যান্স হতাশাজনক। ৬ ম্যাচের ৫টিতেই হেরেছে বাংলাদেশ, যার সবশেষটি শুক্রবার। ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কাছে ৬৮ রানে হেরেছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ১৯ দল, ইংল্যান্ডের ২৬৫ রানের জবাবে অলআউট হয়েছে ১৯৭ রানে। শুধু এই ম্যাচেই নয়, গোটা আসরেই বাংলাদেশকে ভুগিয়েছে ব্যাটিং। ১১৬, ২২৫, ১৯৭ এমন সব রানেই অলআউট হয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্বকাপে জাতীয় দলকেও দেখা গেছে ব্যাটিং নিয়েই বেশি ভুগতে, সেই রোগ ছড়িয়ে গেছে বয়সভিত্তিক দলেও। জাতীয় দলেও দেখা যায় বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের বিশ্বকাপ জিতে আসা ক্রিকেটারদেরও ব্যাটিং নিয়ে ভুগতে। এখন রোগটা প্রকট হয়ে উঠেছে বয়সভিত্তিক পর্যায়েও। বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের ব্যবস্থাপক আবু ইমাম কাওসার দেশ রূপান্তরকে বলেন, 'আমাদের ব্যাটিংটা একটু খারাপ হচ্ছে। কেন খারাপ হচ্ছে জানি না, পারছে না হয়তো। আসলে আমরা সব ধরনের চেষ্টা করছি ওদের (অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটার) সব রকম সহযোগিতা করে যাওয়ার। আমরা (বাংলাদেশ-১৯) কিন্তু বিশ্বের মধ্যে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে এক-দুই বছরে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছি। সামনে এশিয়া কাপ, সেসবের ম্যাচগুলো ধরলে প্রায় ৩০টার মতো যুব -ওডিআই খেলার অভিজ্ঞতা হয়ে যাবে আমাদের খেলোয়াড়দের। স্টুয়ার্ট লর মতো কোচ আছে, ইয়ান হার্ভে মাঝে এসেছিলেন, -একজন বিদেশি উইকেটরক্ষকও এসেছেন। আমরা সব ধরনের চেষ্টা করছি, হতাশ হচ্ছি না।'

বাংলাদেশ যুবদল দেশে পাকিস্তানের যুবাদের সঙ্গে ৪-১ ব্যবধানে হেরেছে ওয়ানডে সিরিজ। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে জিতেছে ৩-২ ব্যবধানে। ২০২২ সালে যদিও পাকিস্তান সফরে গিয়ে ২-১ ব্যবধানে স্বাগতিকদের হারিয়েছিল বাংলাদেশ। মার্চে আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় সিরিজে শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্ত নিকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ।

ক্রিকেটের র‍্যাংকিং টেবিলের দিকে তাকালে যে বাস্তবতা চোখে পড়ে, বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। সিনিয়র পর্যায়ে বৈশ্বিক বা মহাদেশীয় আসরে কেবল শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তানের মতো দলের সঙ্গেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলছে বাংলাদেশ, পারছে না ভারত, ইংল্যান্ড এবং পাকিস্তানের মতো দলের সঙ্গে। একই চিত্র বয়সভিত্তিক পর্যায়েও। অথচ একটা সময় বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ নিয়মিত লড়াই করত প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেট শক্তির জুনিয়র দলগুলোর সঙ্গেও। ২০১৯ সালে আকবর আলীদের দলটা নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়ে জুনিয়র ব্ল্যাকক্যাপদের ওয়ানডে সিরিজে হারিয়েছিল ৪-০ ব্যবধানে। ইংল্যান্ডের মাটিতে ভারত এবং স্বাগতিকদের নিয়ে আয়োজিত ত্রিদেশীয় সিরিজে দুই দলকেই হারাতে পেরেছিল বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ দল। কিন্তু এখন পার্থক্যটা চোখে পড়ার মতো। ২০২০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর, ২০২২ সালে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে হয় অষ্টম। পরের বিশ্বকাপের আগেও বাংলাদেশের ফল হতাশজনক।

বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগে কাজ করেছেন নাজমুল আবেদীন ফাহিম। বর্তমানে বিকেএসপির ক্রিকেট উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত এই কোচ এবং ক্রিকেট বিশ্লেষক মনে করেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটে অরাজকতা ও দুর্নীতির শেকড় অনেক গভীরে ছড়িয়ে পড়ার কারণেই মান হারাচ্ছে বয়সভিত্তিক দলগুলো, ‘আমাদের বয়সভিত্তিক ক্রিকেট ক্লাব ক্রিকেট মানে দ্বিতীয় বিভাগ, তৃতীয় বিভাগ, যেখানে অনেক জুনিয়র ক্রিকেটাররা খেলে, একাডেমি-সবকিছু মিলিয়ে ভালো পরিবেশ নেই। ভালো ক্রিকেটারদের গড়ে ওঠার যে ভালো পরিবেশ দরকার, সেই পরিবেশটা নেই বোধ হয়। মোদ্দাকথা হচ্ছে স্কুলটা, সেই অর্থে ভালো স্কুলে আমাদের ছেলেরা পড়ছে না আরকি। একটা সেইং আছে কিন্তু, নো কোচিং ইজ বেটার দ্যান রঙ কোচিং। যে পরিবেশটা তারা পাচ্ছে, সেটা ভালো নয় এবং এটা অনেক বছর ধরে হচ্ছে।'

অনূর্ধ্ব-১৯ দলটা পরিচালিত হয় বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের মাধ্যমে। এই বিভাগের প্রধান খালেদ মাহমুদ। যদিও তাকে জাতীয় দলের সঙ্গেই বেশি সম্পৃক্ত দেখা যায়। সম্প্রতি বিশ্বকাপেও খালেদ মাহমুদ টিম ডিরেক্টর হিসেবে দলের সঙ্গে ছিলেন, যদিও চন্ডিকা হাথুরুসিংহের একনায়কতন্ত্রে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি তিনি। গণমাধ্যমে যে হতাশা না লুকিয়ে মাহমুদ বিশ্বকাপ চলাকালে ভারতেই সাংবাদিকদের বলেছেন, “খুশি না, আমি তো এভাবে থাকতেই চাই না। যেহেতু আমার রক্তেই ক্রিকেট। কোচিং করি, এটা আমার পেশা। টেকনিক্যাল মানুষ হিসেবে গত ট্যুরগুলাতে যে ভূমিকা ছিল। এসব থেকে আমি দূরেই আছি। আমি উপভোগ করছি কি না? না, অবশ্যই না। একটা ট্যুরে আমি অভিভাবক হিসেবে থাকব, নিয়ম- শৃঙ্খলা বা অন্য বিষয় দেখব। সেটা তো আমার কাজ না। সেটাও আমি দেখতাম, তবে আমি মূলত ক্রিকেটটা দেখতাম।'

বিসিবির কর্তারা নিজেরা নিজস্ব গণ্ডির বাইরে গিয়ে অন্য জায়গায় ব্যস্ততা দেখাচ্ছেন, এ ব্যাপারে গেল ডেভেলপমেন্ট বিভাগে একসময় কাজ করা ফাহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, “সেটা তো কিছুটা বটেই, জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার আগ্রহ সবার মধ্যেই বেশি। উপস্থিতির চেয়ে বড় কথা হচ্ছে নীতিমালাটা কী, তরুণ ক্রিকেটারদের গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে আমরা কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছি, এসব ব্যাপারে খুব পরিষ্কার থাকা দরকার। এই বিভাগের বর্তমান ম্যানেজার কাওসার অবশ্য বলছেন, দলের সঙ্গে না থাকলেও সম্পৃক্ত আছেন মাহমুদ, ব্যাক টু ব্যাক হয়ে যাওয়ায় হয়তো ভারতে যেতে পারেননি উনি (খালেদ মাহমুদ), তবে দলের সব খোঁজখবর রাখছেন।' পরের মুখে ঝাল খেয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ দল নিয়ে ভাবছেন মাহমুদ আর দেশে ফিরে কাজ করছেন রাজশাহীর বাংলা ট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমিতে। এই প্রতিষ্ঠানে কোচ হিসেবে কর্মরত মাহমুদ, সপ্তাহে দুই-তিন দিন তিনি পদ্মাপাড়ের এই ক্রিকেট একাডেমিতেই উঠতি ক্রিকেটারদের শেখান। দিন তিনেক আগেও তিনি ছিলেন রাজশাহীতে, সেখানে পাকিস্তানের শাহেদ মাহমুদকে এনে লেগস্পিনার তৈরির চেষ্টায় ব্যস্ত দেখা গেছে তাকে। জাতীয় দল এবং নিজস্ব চাকরি- এই দুই জায়গায় সুজন মনোযোগী আর বিসিবিতে তার ওপর অর্পিত মূল যে দায়িত্ব, সেখানেই তিনি গরহাজির!

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ সরে গেছে শ্রীলঙ্কা থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায়। কন্ডিশনে পরিবর্তন হবে আকাশ-পাতাল, প্রস্তুতিতে পরিবর্তন আনার সময়ও নেই পর্যাপ্ত। অথচ এমন সময় যুবদলের সঙ্গে নেই মাহমুদ। সামনের মাসে এশিয়া কাপ হবে দুবাইয়ে, সেখানে হয়তো তাকে ঠিকই দেখা যাবে পদাধিকার বলে দলের সঙ্গে জুড়ে যেতে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত