পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। দেশে চলমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। এ অবস্থায় সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী
দেশ রূপান্তর : রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে?
আহসান এইচ মনসুর : এটা তো ইতিমধ্যেই আমাদের একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। দুই দিক থেকে এটা হচ্ছে। একটা হচ্ছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাটা কবে নাগাদ শেষ হবে আমরা জানি না। এটা কি ইলেকশনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে নাকি ইলেকশনের পরে এটা আবার অন্য রূপ ধারণ করবে, তা আমরা জানি না। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, এ বছর অন্যান্য বছরের তুলনায় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাটা অনেক বেশি এবং একটা অর্থনৈতিক ক্রাইসিস চলমান আছে। যেটা আমরা দেখতে পারি মূল্যস্ফীতিতে, অস্থিতিশীল ডলারের মূল্যে এবং ক্রমবর্ধমানভাবে ডলারের বিপরীতে টাকার পতনে। সঙ্গে অন্যান্য সমস্যাও আছে। সরকারের রাজস্ব কম, সরকারের ব্যয় করার সক্ষমতা কম। সেই সঙ্গে আমাদের দেশটা বিভিন্নভাবে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে। তো, সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক যে অস্থিরতা, তাতে সেটা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। টাকা পাচার বাড়ছে, আমদানি প্রবাহ কমে যাচ্ছে, রপ্তানিও কমছে। এর মধ্যে নতুন ইস্যু যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট। এটা কোন দিকে যাবে আমরা জানি না। আর ভালোর দিকে এটা যাবে না, মানে যেভাবে আছে সেভাবেই থাকবে অথবা খারাপের দিকে যাবে। আমরা একটা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই যাচ্ছি এবং যাব।
দেশ রূপান্তর : খরচ সামলাতে সাধারণ মানুষ চাপে আছে, অন্যদিকে ডলার সংকটে কমেছে আমদানি, বাজার মোটামুটি নিয়ন্ত্রণহীন। নিকট ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি কমার কি সম্ভাবনা দেখতে পান?
আহসান এইচ মনসুর : এখানে দুটো জিনিস আমাদের মনে রাখতে হবে। আমরা যদি মৌসুমি প্রবণতাটা যদি দেখি সাধারণত শীতকালে মূল্যস্ফীতিটা একটু কমে আসে। কারণ হলো এ সময় নতুন শাকসবজি বাজারে চলে আসে। এ সময়টাতে পেঁয়াজ, আলু যেসবের দাম বেড়েছে সেগুলোও বাজারে আসে, মাছ-টাছও পাওয়া যায়। কিন্তু এ বছর এসব এখনো সেভাবে বাজারে আসেনি। আসলে তার একটা প্রভাব পড়বে হয়তো। কিন্তু খারাপ যেটা, ডলার পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাচ্ছে। ডলারের দাম ঊর্ধ্বমুখীই রয়ে যাচ্ছে। এটা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে যে সরকার কিছুটা হলেও অনুধাবন করেছে যে পরিস্থিতিটা ভালো না। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে বস্তুনির্ভর কিছু নীতিমালা পরিবর্তন করতে হবে। সেদিক থেকে সরকার ইন্টারেস্ট রেট কিছুটা বাড়িয়েছে। টাকা ছাপানো বন্ধ করেছে। এ দুটো ভালো দিক। সব মিলিয়ে হয়তো মূল্যস্ফীতি একটু কমলেও কমতে পারে, তবে সেটা খুব বেশি কমবে বলে আমার মনে হয় না।
দেশ রূপান্তর : সরকার তো ডলারের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সমালোচনার জবাবে যাকে বাংলাদেশ ব্যাংক সঠিক সিদ্ধান্ত বলে দাবি করেছে। আপনি কী মনে করেন?
আহসান এইচ মনসুর : আমি মনে করি এটা একটা প্রি-ম্যাচিউরড সিদ্ধান্ত। অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত। বাজারের অবস্থার কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়নি। এখনো বাজারে ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। বেশিরভাগ আমদানিকারক ব্যাংক টু ব্যাংক হন্যে হয়ে ডলারের সন্ধান করছেন এলসি খোলার জন্য, কিন্তু পাচ্ছেন না। এবং তারা ডলারের জন্য ১২২/১২৪ টাকা দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে ডলারের দাম কমিয়ে দেওয়াটা আমি মনে করি একেবারেই অযৌক্তিক এবং অপ্রাসঙ্গিক। এর প্রভাব কার্ব মার্কেটেও পড়বে না। সেখানে প্রভাব পড়বে তখনই, যখন আমরা আমাদের ফ্লো অব ফান্ড বাড়াতে পারব। রেমিট্যান্সের প্রভাবও বাড়াতে পারব, রপ্তানির প্রভাবও বাড়াতে পারব। সেটা তো হচ্ছে না।
দেশ রূপান্তর : দেশের আর্থিক খাতের অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনা নতুন নয়। সর্বশেষ খবর হচ্ছে মন্দ ঋণের চাপে সংকটে পড়েছে ৯ ব্যাংক। আশা করা হচ্ছিল যে অন্তত আইএমএফের শর্তেও কারণে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাবে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
আহসান এইচ মনসুর : আমার অবজারভেশন হচ্ছে, পরিবর্তন তো হয়ইনি বরং গুণগতভাবে আরও খারাপের দিকে গিয়েছে। আর্থিক খাতে কোনো ভালো লক্ষণ আমরা এখনো পর্যন্ত দেখিনি। পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপের দিকেই যাচ্ছে। যদিও বলা হচ্ছে এই প্রান্তিকে খারাপ ঋণ কিছুটা কমে ৬০০ কোটি টাকার মতো হয়েছে। কিন্তু আসলে তো তা নয়। এর পেছনে প্রধানত দুটি ঋণ দায়ী। এর মধ্যে একটি ২২ হাজার কোটি টাকার, অন্যটি সাড়ে ৫ বা ৭ হাজার কোটি টাকার। দুই প্রতিষ্ঠানের এই দুই বড় ঋণের পুনঃতফসিলি করার কারণে সরকারি ব্যাংকের ঋণ হঠাৎ করে কমে গিয়েছে। কিন্তু বেসরকারি ব্যাংকে মন্দ ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। এবং সামগ্রিকভাবে ওই টাকাটাকে যদি আমরা বাদ দিয়ে ধরি, তাহলে তো কুঋণ বেড়েছে। ওই টাকাটা তো আপনার শোধ করা হয়নি, রাজনৈতিক প্রভাবে পুনঃতফসিলিকরণ হয়েছে।
দেশ রূপান্তর : কিছুদিন আগে ব্যাংক রান হবে বলে একটা আতঙ্ক ছিল। সে সম্ভাবনা কি আছে?
আহসান এইচ মনসুর : ব্যাংক রান হলে টাকা ছাপিয়ে সরকার গ্রাহকের টাকা দিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু এতে বিশালভাবে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেওয়া হবে। শ্রীলঙ্কাতে যেটা হয়েছিল। কাজেই ব্যাংক রান তো হতেই পারে। এটা ঠেকাতে সরকার তার প্রিন্টিং মেশিন দিয়ে টাকা ছাপিয়ে তাদের সাপোর্ট দেবে এবং সরকার সে সাপোর্ট দিয়েছে তো। ব্যাংক রান যে হয়নি তা তো না, ইসলামী ব্যাংকে ব্যাংক রান হয়েছিল।
দেশ রূপান্তর : পোশাকশ্রমিকরা কিছুদিন আগে ন্যায্য মজুরির দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছিল। পরে সরকার তাদের সর্বনিম্ন মজুরি বেঁধে দেয়। সিপিডিসহ অনেকে বলছে মজুরি পুনর্বিবেচনা করতে। আপনার মতে সরকারের বেঁধে দেওয়া মজুরি কি যৌক্তিক হয়েছে?
আহসান এইচ মনসুর : যৌক্তিক অযৌক্তিকের বিষয়টা হচ্ছে কালেক্টিভ বার্গেনিংয়ের জায়গা। মাছের বাজারের মতো দামাদামি করতে হবে। এবং দুই পক্ষকেই একটি সন্তুষ্টিপূর্ণ স্থানে সেটেলডাউন করতে হবে। ইকোনমিস্ট হিসেবে আমি যদি বলি মজুরি ৫৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, সেটা কি কম? কম না। এটা কি মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি না কম? মূল্যস্ফীতির চেয়ে একটু বেশি। কিন্তু এটা দিয়ে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান কমবে না। হয়তো খুব বেশি বাড়বে না, কিন্তু মান কমবে না। এটা কি আরও বাড়ানো যেত? হয়তো যেত। হয়তো কিছুটা বাড়ানোর সুযোগ এখনো আছে। ভবিষ্যতে সেটা আরেকটু বাড়ানো যায় কিনা, সরকার এবং মালিক পক্ষ তা দেখতে পারে। মজুরি যেটা বেঁধে দেওয়া হয়েছে সেটা একেবারে অযৌক্তিক কিছু নয়। তবে এখানে ত্রিপক্ষীয়ভাবে যদি কিছু করা যায় মালিক পক্ষ, লেবার ইউনিয়ন এবং যারা ক্রেতা, এই তিন পক্ষ আলাপ করে যদি আরও এক/দুই হাজার টাকা বাড়ানো যায়, সেটা হতেই পারে। কিন্তু সরকার এখন যে সর্বনিম্ন মজুরি বেঁধে দিয়েছে, সেটা একদমই খারাপ সেটা আমি বলব না।
দেশ রূপান্তর : শ্রমিক অধিকার হরণ হলে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে বলে আমেরিকা নতুন ঘোষণা দিয়েছে। ঘোষণায় বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের প্রসঙ্গ এসেছে। এই নতুন শ্রম অধিকার নীতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় দেশের রপ্তানিকারকরা। বিষয়গুলো কীভাবে দেখছেন?
আহসান এইচ মনসুর : এখানে তাদের কথা হলো লেবার ইউনিয়ন করতে দিতে হবে। এটা তাদের মৌলিক অধিকার। এটা আইএলও স্বীকৃত। বাংলাদেশ সরকারও কিন্তু এই সনদে সাইন করেছে। কাজেই তাদের সে অধিকার দিতে হবে। এর সঙ্গে কোনো দ্বিমত নেই। দ্বিতীয়ত যেটা হচ্ছে, কিছু শ্রমিক নেতার বিরুদ্ধে মামলার পাশাপাশি অনেকে গুম-খুন হয়েছেন বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলোও তো গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে তারা সঠিক বিচার-তদন্ত চাচ্ছে। এই জায়গায় একটা বড় ইস্যু দানা বেঁধেছে। সেদিনও জয়দেবপুরে একজন খুন হয়েছেন। এর আগেও যারা গুম-খুনের শিকার হয়েছেন কয়েক বছরে তার কোনো তদন্ত হয়নি। তো এখানে আমাদের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আছে। এখানকার শ্রমিক নেতারা কেন মার্কিন আশ্রয়ে থাকবে, আমাদের আইন কেন তাদের প্রোটেকশন দেবে না?
দেশ রূপান্তর : অন্যদিকে ইইউ বলেছে জিএসপি (অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য-সুবিধা) প্লাস পেতে হলে বাংলাদেশকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার ও পরিবেশগত বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে হবে। বাংলাদেশ সেই সব শর্ত পূরণে সক্ষম হবে কি না, সরকার শর্ত পূরণে পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না তা নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।
আহসান এইচ মনসুর : হ্যাঁ, এই ইস্যুগুলো আমরা যখন গ্র্যাজুয়েশনের জন্য পরবর্তী স্টেপে যাব, সেটা জিএসপি হোক অথবা অন্য কোনো অগ্রাধিকারভিত্তিক সুবিধা হোক এই বিষয়গুলো কিন্তু আসবে। পরিবেশগত বিষয় আসবে। হিউম্যান রাইটস তো আসবেই। এসব আমাদের এখনই অ্যাড্রেস করতে হবে।
দেশ রূপান্তর : সরকার আইএমএফের ঋণের ওপর অনেকটা নির্ভর করছে। কিছুদিন আগে মার্কিন রাষ্ট্রদূত আইএমএফের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো না, রিজার্ভের অবস্থাও তেমন ভালো নয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের সঙ্গে সরকারের একটা টানাপড়েন দৃশ্যমান। তো আইএমএফের ঋণের পরবর্তী কিস্তি পেতে কোনো অসুবিধা হতে পারে বলে মনে করেন কি?
আহসান এইচ মনসুর : আমি মনে করি আইএমএফের পরবর্তী কিস্তিটা চলে আসবে। তবে এটাও বলব যে মার্কিন সরকার যদি চায় তারা যে কোনো লোন ব্লক করতে পারে। সেই ক্ষমতা তাদের থাকলেও আমার মনে হয় না তারা সেটা প্রয়োগ করবে। তারা চাইলে বাংলাদেশের প্রোডাক্টের ওপরও স্যাংশন দিয়ে দিতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি তারা সেটাও করবে না।
দেশ রূপান্তর : এটা মনে করার কারণ কী? এটা কি তাদের ইন্টারেস্টের জন্য? কারণ এখানে দাম কম।
আহসান এইচ মনসুর : না, তাদের ইন্টারেস্ট এখানে অত বেশি না। কিন্তু পণ্যে নিষেধাজ্ঞা দিলে তার অভিঘাতটা গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। যার ক্ষতি ব্যাপক। সেটা হয়তো তারা চাইবে না। তারা টার্গেটেড ভিসানীতি, নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করতে পারে। আমি এটা আশা করি। আমি মনে করি বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত যে প্রেক্ষাপট তাতে ওই ধরনের সিচুয়েশনে যাওয়ার অবস্থা দেখি না। যৌক্তিকভাবে আমার মনে হয় না তারা এটা করবে।
