ঝড়ের কেন্দ্রে থেকেও শান্ত হাথুরু

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:৪০ এএম

বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগে ওঠা দমকা হাওয়া পরবর্তী সময়ে রূপ নিয়েছিল ঘূর্ণিঝড়ে, যে ঝড় ল-ভ- করে দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সেমিফাইনাল খেলার স্বপ্ন। যাদের সঙ্গে নিয়ে বিশ্বকাপ পরিকল্পনা করেছিলেন চন্দিকা হাথুরুসিংহে, সেই নাজমুল হাসান এবং সাকিব আল হাসান দুজনের কাছেই ক্রিকেটের গুরুত্ব আগামী মাসখানেক নেই। আওয়ামী লিগের হয়ে জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়ে তাদের ডায়েরির সব পাতা এখন সম্পূর্ণভাবেই নির্বাচনী প্রচারণায় সমর্পিত। হাথুরুসিংহে আছেন, ঝড়ের কেন্দ্রে থেকেও তিনি শান্ত। জানেন, চুক্তির জোরে তার গায়ে যে আঁচও লাগবে না।

১৯৯৯ সালে, প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে পাকিস্তান এবং স্কটল্যান্ডকে হারাবার পরও চাকরি যায় বাংলাদেশের কোচ গর্ডন গ্রিনিজের। ২০১৯ সালেও স্টিভ রোডসের হাত ধরে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে হয়েছিল অষ্টম। সেবারের ৯ ম্যাচে ৩ জয় ৫ হার আর ১টি বৃষ্টির কল্যাণে পরিত্যক্ত ম্যাচের খতিয়ানও বাংলাদেশের কাছে সফল সাকিব আল হাসানের অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের কল্যাণে। তবুও চাকরি বাঁচেনি ‘ভদ্রলোক’ রোডসের। বিশ্বকাপের পর তাকে রীতিমতো ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে ডেকে এনে ছাঁটাই করা হয়। হাথুরুসিংহে বেঁচে যাচ্ছেন কারণ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ থেকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় মেয়াদের চুক্তিটা ২ বছরের জন্য। মেয়াদ পূর্তির আগে ছাঁটাই করায় শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ডকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে নিয়ে গিয়েছিলেন হাথুরুসিংহে, বিসিবিকেও যে তিনি এমন আইনি প্যাঁচে ফেলতে পারেন সেটা তো আগের অভিজ্ঞতা থেকেই বোঝা যায়।

বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন করে শুরুর পর প্রথম টেস্টে শক্ত কোনো প্রতিপক্ষকে পাচ্ছেন হাথুরুসিংহে। এর আগে আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ড ছিল টেস্ট পরিবারের ‘দুধের শিশু’, তারা বাংলাদেশ দলকে খুব একটা চাপে ফেলতে পারেনি। এবারের নিউজিল্যান্ড দলটা একদমই তেমন নয়, বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে খেলা কিউইদের ১০ জন এসেছেন বাংলাদেশ সিরিজে। মাস দুয়েক ভারতের জলহাওয়ায় কাটিয়ে কন্ডিশন আর উপমহাদেশের উইকেট নিয়েও অভ্যস্ততা চলে এসেছে। প্রায় মাসপাঁচেক পর টেস্ট খেলতে নামা, সেই সঙ্গে দলের শীর্ষ ক্রিকেটারদের না থাকা...সম্ভাব্য ফলটা কী হতে পারে সেটা হাথুরুসিংহের মতো বুদ্ধিমান মানুষ আগেই আঁচ করতে পারেন। সেজন্যই বোধহয় সংবাদ সম্মেলনে আগাম অজুহাত দিয়ে রাখলেন, ‘একসঙ্গে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের অনুপস্থিতি যে কোনো দলের জন্যই কঠিন। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দলের জন্য কারণ এরাই (সাকিব-তামিম-তাসকিন-লিটন) গত ১০-১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের হয়ে সব সংস্করণেই নিয়মিত খেলছে। আমাদের একটা সুযোগ এসেছে দেখার যে তরুণরা কী করতে পারে। আমার মনে হয় এখন সময় হয়েছে সামনের দিকে দেখার কারণ এই সিনিয়র ক্রিকেটাররা আজীবন খেলবে না। তাদের না থাকাটা নানান রকম কারণেই হচ্ছে, সেই সঙ্গে তরুণ কারও জন্যও লম্বা ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ।’

ঘরোয়া ক্রিকেটের পড়তি মান এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভাবের কারণে উঠতি ক্রিকেটারদের মানটা কেমন সেটা বিশ্বকাপেই দেখা গেছে। তানজিদ তামিমকে গোটা বিশ্বকাপে খেলিয়েও এক হাফসেঞ্চুরির বেশি কিছু পাওয়া যায়নি। ইয়াসির রাব্বি, শামীম হোসেন পাটোয়ারিরা কেউ মাহমুদউল্লাহর জায়গা নিতে পারেননি। টেস্টেও মাহমুদুল হাসান জয়, জাকির হাসানরা কতটা প্রত্যাশা মেটাতে পারেন সেই প্রশ্নের এখনো সদুত্তর মেলেনি।

খামতি আছে পেস বোলিংয়েও। তাসকিন আহমেদ এবং এবাদত হোসেন নেই। এখানেও শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশের কোচ, ‘সন্দেহ নেই ওরাই আমাদের সেরা বোলার। তবে আমি যেটা বললাম আগে, এটা অন্যদের জন্য সুযোগ। আমরা গুটিকয় বোলারের ওপর সবসময় ভরসা করে থাকতে পারি না। স্কোয়াডে খালেদ (আহমেদ), শরিফুল (ইসলাম) ও হাসান ( মাহমুদ) আছে, সে (হাসান) এখনো টেস্ট খেলেনি। তাদের জন্য ব্যাপারটা রোমাঞ্চকর। সুযোগ পেলে তারাও দেখাতে পারে তাদের প্রতিভা।’

বিশ্বকাপের পর টালমাটাল দল, বিদায় নিয়েছেন কোচিং স্টাফের অনেকেই। পেস বোলিং কোচ অ্যালান ডোনাল্ডের জায়গায় হাই পারফরম্যান্স ইউনিট থেকে কোরে কোলিমোর যোগ দিয়েছেন, আগের ভিডিও অ্যানালিস্টও নেই। হাথুরুসিংহে জানালেন, অদল বদল কোনো সমস্যা নয়, ‘এসব কোনো সমস্যাই নয় কারণ আমাদের একটাই ভাষা, ক্রিকেট। ব্যাটিং, বোলিং আর ফিল্ডিং। নতুন অধিনায়ক মানে তার জন্যও নতুন সুযোগ। সে নিজের মতো একটা নেতৃত্বের দল বানাবে, তার মতো করে পরিকল্পনা করবে, সে ভিন্ন একজন মানুষ। আমিও দেখতে চাই সে কীভাবে নেতৃত্ব দেয়, পরিবর্তনগুলো কতটা কাজ করে সেটা দেখতে আমিও মুখিয়ে আছি।’

ঝড়ঝাপটায় সব কিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তন প্রকৃতির নিয়ম হলেও এখানে পরিবর্তন আনা হয়েছে খানিকটা বাধ্য হয়েই। বছর পাঁচেক আগে, সিলেটের এই মাঠে হয়ে যাওয়া একমাত্র টেস্টে বাংলাদেশ নেমেছিল দেড় জন পেসার নিয়ে। আবু জায়েদ রাহির সঙ্গে নতুন বল ভাগ করেছিলেন অলরাউন্ডার আরিফুল হক। নভেম্বরের শেষে, সিলেটের চা বাগানের কোলঘেঁষা স্টেডিয়ামে সকালের শিশির কাজে লাগিয়ে কাইল জার্ভিস, টেন্ডাই চাতারারাও এখানে হয়ে উঠেছিলেন দুর্ধর্ষ পেসার। তাদের জায়গায় এখন প্রতিপক্ষে কাইল জেমিসন, নেইল ওয়াগনার আর টিম সাউদি। স্কোয়াডে চারজন পেসার রেখেও সেই টেস্টে দেড় পেসার খেলানোর খেসারত দিয়েছিল বাংলাদেশ। হাথুরুসিংহে কি সেই অতীত থেকে শিক্ষা নেবেন? নাকি চেনা রাস্তাতেই হাঁটবেন। যে ছক কষে হারিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত