প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা হবে কার সঙ্গে

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২৩, ১১:২১ এএম

ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী তালিকা যেটা তারা দিয়েছে, সেটা আওয়ামী লীগ তাদের দলীয় বিবেচনা থেকেই করেছে। তারা দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৮টি আসনের প্রার্থী নিশ্চিত করেছে। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তারা প্রার্থীদের যোগ্যতা, জনপ্রিয়তাসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করেছে। দেখা যাচ্ছে, পুরনো কয়েকজন বাদ পড়েছেন। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় বর্তমান সংসদে এমপি ছিলেন এমন ৭১ জন বাদ পড়েছেন, ১৯২ জন আবার মনোনয়ন পেয়েছেন, নতুন প্রার্থী ৭৯ জন, নারী ২৪ জন। এছাড়া, আগে এমপি ছিলেন, সর্বশেষ সংসদে ছিলেন না এমন ২৭ জন ফের আওয়ামী লীগের প্রার্থিতা পেয়েছেন। এবারে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হওয়ার জন্য বিভিন্ন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ছাড়াও শ্রেণি-পেশার মানুষের ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী এবার ৩৩৬২টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়েছে, যা একটি রেকর্ড। এখন যারা নির্বাচন করতে চান, ক্ষমতাসীন দলের প্রতি তাদের আগ্রহ থাকবেই। বড় বিরোধী দলের প্রতিও আকর্ষণ থাকে, তবে এবার সেটা দেখা হচ্ছে না। বাংলাদেশের নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি উভয় দল থেকেই ভোটে দাঁড়ানোতে প্রচুর আগ্রহী লোক আছে। কিন্তু বিএনপি যেহেতু নির্বাচনে আসছে না, তাই আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করার আগ্রহ বেশি সৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ, তাদের ধারণা আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিলে তো আর শক্ত প্রতিযোগিতার মুখে পড়ব না। অবশ্য আওয়ামী লীগ একটি প্রাচীন আর বড় দল এবং ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে। ফলে দলীয় নেতাকর্মীর বাইরেও যারা নির্বাচন করতে চান, তাদের পছন্দে দলটি থাকবে স্বাভাবিকভাবেই।

যাদের বাদ দেওয়া হয়েছে তাদের বিষয়ে নিশ্চই জরিপ চালিয়ে দলীয় মূল্যায়ন করা হয়েছে। কয়েকজন মন্ত্রীও বাদ পড়েছেন দলীয় মনোনয়ন থেকে। সব মিলিয়ে তারা জনপ্রিয় মানুষদের প্রার্থী করছেন। আবার দুয়েকজন মন্ত্রী যারা সমালোচিত যেমন বাণিজ্যমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী তাদের বাদ দেওয়া হয়নি। সমালোচিত কয়েকজন এমপিও আবার মনোনয়ন পেয়েছেন। এলাকায় খোঁজ নিলে এমন এমপি, মন্ত্রী আরও কয়েকজনকে পাওয়া যাবে যাদের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। ফলে একদম সঠিকভাবে প্রার্থী বাছাই করে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তা বলা যাবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ দাবি করছে যে তারা যোগ্য প্রার্থী দিতে চেষ্টা করেছে। তবে ভবিষ্যতের পার্লামেন্টের চেহারা কেমন হয় সেটা এখনই বলা যাবে না। নির্বাচনটা কেমন হবে তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।

এবারের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার তারকাদের দেখা গিয়েছে। এবার নতুন একজন ক্রিকেটার মনোনয়ন পেয়েছেন যিনি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন। একজন বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্যাপ্টেনসিও করবেন আবার নির্বাচন করবেন, এমপি হবেন। দুটি এ ধরনের কাজ বা দায়িত্ব যা শতভাগ মনোযোগ দাবি করে। তাছাড়া আমি মনে করি এটা নৈতিকভাবে ঠিক কি না তা প্রশ্নসাপেক্ষ। ক্রিকেটার হিসেবে তার রাজনীতিতে আসতে বারণ নেই। তবে খেলার ক্যারিয়ার শেষ করে বা ছেড়ে দিয়ে তারপর রাজনীতিতে এলে ভালো হতো। তাছাড়া যারা তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে আসছেন, দল করছেন, তাদের বাদ দিয়ে হঠাৎ করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার তারকা ব্যক্তিদের হাতে রাজনীতি চলে যাওয়াটা লক্ষণ হিসেবে শুভ না। যেমন ঢাকা-১০ আসনে প্রার্থী হিসেবে একজন চলচ্চিত্র নায়ককে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। আসনটির মধ্যে ধানম-ির মতো এলাকা রয়েছে। এখন ধানম-িবাসী তো আরও ভালো প্রার্থীর দাবি রাখেন, যিনি তাদের চিন্তা-চেতনা, মেধা, দক্ষতার প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্য। এখানে তো বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িও রয়েছে। কাজেই সেখানকার দলীয় নেতাকর্মীরাই একজন নায়ককে তাদের প্রার্থী হিসেবে নাও চাইতে পারেন। তারা হয়তো দলীয় ঘোষণার বাইরে অবস্থান নেবেন না, কিন্তু খোঁজ নিলে অন্য চিত্র পাওয়া অসম্ভব নয়। নায়ক, গায়ক, ক্রীড়াবিদদের যে রাজনীতি করা মানা, তা না। কিন্তু কেউ ভালো বা জনপ্রিয় নায়ক, গায়ক, ক্রিকেটার হলেই যে তিনি রাজনীতিবিদ হতে পারবেন তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। এখানে হুট করে এলে হবে না, তাদের কারোর যদি প্রথাগত রাজনীতির অভিজ্ঞতা বা সংশ্লিষ্টতা থাকে তাহলে হতে পারে। এখন হতে পারে আপনি একটা রথযাত্রা করছেন সেখানে আপনার কিছু মুখ দরকার, জনগণকে দেখাতে পারবেন যে এই এই মানুষকে আমি আনতে পেরেছি। নির্বাচন তো সেই রথযাত্রা নয়। পাশর্^বর্তী দেশ ভারতে জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ভোটের রাজনীতিতে নিয়ে আসার এক ধরনের প্রবণতা আমরা দেখে আসছি। এখন ভারতে কী হয় বা তাদের রাজনৈতিক চর্চা আর আমাদের বিষয় এবং চর্চা তো একরকম না। কাজেই সেটা দেখে বিবেচনা করা যাবে না। তাছাড়া ভারতে তো দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ। সেখানে উচ্চ কক্ষে শিক্ষাবিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেক্টরের বিশেষায়িত লোকজনকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা আছে। এর বাইরে তারকা ব্যক্তিত্ব যারা ভোটে দাঁড়ান তারা রাজনৈতিক দলে যোগদান থেকে শুরু করে দীর্ঘসময় মাঠে-ময়দানে পার্টি পলিটিকস করার অভিজ্ঞতা নিয়ে আসেন। ফলে আমাদের দেশে ভারতকে ফলো করে এটা করছি তা মনে হয় না। হয়তো আওয়ামী লীগ মনে করেছে যে তাদের নিলে এবারের নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে তারকাদের জনপ্রিয়তা কাজে লাগবে। কিন্তু এটা রাজনীতির জন্য সুখবর না। আমরা ব্যবসায়ীদের কথা যেমন চিন্তা করি যদি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যবসায়ী সংসদে সদস্য হয়ে আসেন সেটা তো রাজনীতির জন্য সুখবর হয় না। এমন অবস্থা হলে বাজার অস্থিতিশীলতার জন্য দায়ী সিন্ডিকেট ভাঙা যায় না। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সব তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সরকারই অসহায় হয়ে পড়ে। কিছুদিন আগেই আমরা সর্বশেষ যে পরিস্থিতি দেখলাম, একবার ডিমের দাম তো একবার পেঁয়াজের দাম, একবার আলুর দাম তো একবার তেলের দাম। রাজনীতিবিদদের হাতে যদি রাজনীতি না থাকে সরকার অসহায় হয়ে পড়ে। রাজনীতি যদি রাজনীতিবিদদের হাতে থাকে তাহলে সরকারের জন্য কন্ট্রোল করা সহজ হয়। কিন্তু রাজনীতি যদি অন্য কারও হাতে চলে যায় তখন কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা করার জন্য যে সুশাসন, বাজার নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদিতে ব্যত্যয় হয়।

তাছাড়া আওয়ামী লীগ তাদের মনোনীত প্রার্থীদের যেভাবে জনপ্রিয়, যোগ্য ইত্যাদি বলছে সেটা যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয় তাহলে এই দাবির সত্যতা পরীক্ষা করা যেত। এখন পর্যন্ত যা মনে হচ্ছে এসব প্রার্থীর যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার পরীক্ষা ভোটের মাঠে দিতে হবে না। পরীক্ষা হওয়ার আগেই জি-ফাইভ পেয়ে গেছেন এমন বলছেন অনেকে। তারকা প্রার্থী ছাড়াও নিয়মিত যারা রাজনীতি করে প্রার্থিতা পেয়েছেন তাদের নিয়েও এলাকায় খোঁজ নিলে বিস্তর অভিযোগ পাওয়া যাবে। তবে বেশ কিছু নতুন মুখ রয়েছেন প্রার্থীদের মধ্যে। নতুন মুখের সুবিধা হচ্ছে- আগের জনপ্রতিনিধিদের কর্মকা-, ভালো-মন্দ সম্পর্কে তো জানা যায়, ফলে এলাকায় ক্ষোভ বা গ্রহণযোগ্যতা টের পাওয়া সহজ, কিন্তু নতুন যারা তাদের ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাদের কর্মকা- অজানা। ফলে তারা একটা সুবিধা পেয়ে থাকেন।

এবারের আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের বলা হয়েছে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতে আসতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা হবে কার সঙ্গে? ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন কিন্তু পাননি এমন, এবং এর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তো থাকছেনই। যে ডামি প্রার্থীর কথা শোনা যাচ্ছে, তারা মূলত এনারাই। এখন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এই ডামি প্রার্থীরা সহায়ক কি না, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। এই ডামি প্রার্থীরা কারা, তারা তো দলেরই লোক। ‘এ’ দলের একটা প্রার্থী আছে আবার সেই দলেরই একজন ডামি প্রার্থী আছে। এতে কি ভোট বেড়ে যাবে? এ দলের ৫০ শতাংশ ভোট থাকলে দলীয় প্রার্থী ৪০ শতাংশ আর ডামি প্রার্থী পাঁচ বা ১০ শতাংশ ভোট পাবেন, হিসাবটা তো এমন। পুরো বিষয়টা ম্যানেজড ইলেকশনের মতোন শোনায়। আমার মনে হয় ২০১৪ সালে ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনায় ওই নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। ক্ষমতাসীনরা এবার সমালোচিত হওয়া এড়াতে আগে থেকেই এই ডামি প্রার্থী দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের ব্যবস্থা বা পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু বাস্তবে এর মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচনের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা বেশ কঠিন। এই আসনে ৫ জন প্রার্থী ছিলেন তাই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছে, এই সরল সিদ্ধান্তে আসা তো কঠিন। কারণ, অংশগ্রহণমূলক হতে হলে সব দল না হলেও বৃহৎ দলগুলোর অংশগ্রহণ থাকতে হবে। আর আমাদের বড় দলই তো আছে দুটি, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এখানে এই দুই দলের উপস্থিতি জরুরি। ভোটারের হিসাবেও এই দল দুটির বাইরে অন্য দলগুলোর ভোটার সংখ্যা ১০ শতাংশও হবে না। বড় দুটি দলের একটিকে বাদ দিয়ে এসব ছোট ছোট দল নিয়ে নির্বাচন করে যদি বলা হয় ৪৩টা নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৪০টি দল অংশ নিয়েছে, তাতেও সে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে না।

নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও বড় বিষয়। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বাছাইয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, ডামি প্রার্থী রাখার পেছনেও ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর চিন্তা কাজ করেছে মনে হয়। যেমন ক্রিকেটার সাকিব বা নায়ক ফেরদৌসকে দেখতেও হয়তো অনেক লোক ভোটকেন্দ্রে যাবেন। অবশ্য নির্বাচনী প্রচারণায় এই জনপ্রিয় ব্যক্তিরা জনসমাগম টানতে পারলেও ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের নিতে পারবেন কি না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু আজ আওয়ামী লীগ যেমন ফেরদৌসকে দাঁড় করিয়েছে, বিএনপি নির্বাচন করলে তারাও যদি আরেকজন সুপারস্টার দাঁড় করিয়ে দিত, তাহলে অন্যরকম চিত্র হতো। অন্যদিকে ডামি প্রার্থীও কিছুসংখ্যক ভোটার টানবেন বলে আশা করা যায়। তবে এই জনপ্রিয় ব্যক্তি আর ডামি প্রার্থীরা নির্বাচনের দিন কতটা ভোটার টানতে পারবেন তা নিশ্চিত না। কিন্তু কোনো নির্বাচনে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ ভোটার না থাকলে সেটিতে ভোটারদের অংশগ্রহণ আছে বলেও প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।

লেখক: স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সচিব

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত