এএফসি কাপের ‘ডি’ গ্রুপের শ্রেষ্ঠত্ব পেতে জয়ের বিকল্প ছিল না বসুন্ধরা কিংসের। কিংস অ্যারেনায় অপরাজিত থাকার রেকর্ডটা অটুট রাখারও একটা দায় ছিল। অথচ এই মাঠেই শুরুর ৮০ মিনিট সত্যিকারের কিংসকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। উল্টো ম্যাচের দশম মিনিটে গোলকিপার মেহেদী হাসান শ্রাবণের মহাভুলে পিছিয়ে যায় স্বাগতিকরা। চোটের কারণে মাঠে নেই ব্রাজিলিয়ান প্লে-মেকার রবসন রবিনহো ও আইভরিয়ান মিডফিল্ডার চার্লস দিদিয়ের। লিড নিয়ে মিগেল ফিগেইরা ও ডরিয়েলটন গোমেজকেও বোতল বন্দি করে রাখে মাজিয়া। ৮০ মিনিট পর্যন্ত সেটা করেছেও তারা। তবে শেষের দশ মিনিটেই ভোজবাজির মতো বদলে যায় চিত্রপট। ৮০ মিনিটে উজবেক ডিফেন্ডার ববুরবেকের হেডে ম্যাচ ফেরে কিংস। আর ৮৮ মিনিটে মিগেলের রংধনু শট জাগিয়ে দেয় কিংসের গ্যালারি। ২-১ গোলের জয় কিংসকে রেখেছে গ্রুপের শীর্ষে। ১১ ডিসেম্বর ভুবনেশ্বরে স্বাগতিক ওড়িশা এফসিকে হারালেই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হবে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নরা।
গেল দুই মৌসুমে কিংসের সাফল্যের কেন্দ্রে ছিল আক্রমণভাগে রবিনহো ও মিগেলের রসায়ন। দুই ব্রাজিলিয়ান আক্রমণ রচেছেন, গোলও করেছেন নিয়মিত, আবার স্বদেশি ডরিয়েলটনকে দিয়ে গোলও করিয়েছেন। তবে মাংসপেশির চোটে এই ম্যাচে দর্শক হতে হয় রবিনহোকে। তাতেই আক্রমণের শক্তি কমে অনেকটা। নাইজেরিয়ান এমফন উদোহর সংযুক্তি সেই শূন্যস্থান সেভাবে পূরণ করেনি। মিগেলও একা আক্রমণ গোছাতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছে। আর প্রায় পুরোটা ম্যাচেই ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। ফলে কিংসের আগ্রাসী রূপটা দেখা যায়নি বেশিরভাগ সময়। তারপরও এই মাঠ মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। একজন ক্রীড়া সাংবাদিক তো মিগেলের অসাধারণ গোলের পর বলেই দিলেন এই মাঠে কিছু একটা আছে। নইলে এরকম গোল কীভাবে হয়!
এএফসি কাপে মাজিয়ার কাছে ৩-১ গোলে হেরে দুঃস্বপ্নের শুরুর পর টানা চার ম্যাচে আগে গোল করেও পয়েন্ট পেয়েছে কিংস। ওড়িশার বিপক্ষে এই মাঠেই গোল হজমের পর দারুণভাবে ফিরে জিতেছিল ৩-২ গোলে। এরপর মোহনবাগানের কাছেও ভুবনেশ্বরে প্রথমে গোল হজম করে পরে ড্র করতে সমর্থ্য হয়। এরপর ঘরের মাঠে বাগানের বিপক্ষে পিছিয়ে গিয়ে জিতেছে ২-১ গোলে। গতকালও সেটাই হয়েছে। দারুণ প্রত্যাবর্তনের শেষটায় মিগেল বনে গেছেন রাজা।
তার অবিশ্বাস্য গোল, তার আগে ববুরবেকের লক্ষ্যভেদ কিংস সমর্থকদের জোড়া উদযাপনের সুযোগ এনে দিলেও, ম্যাচের আগের ৮০ মিনিট জুড়ে ছিল শুধুই আক্ষেপের গল্প। যার শুরুটা হয়েছে চরম হতাশায় নিষেধাজ্ঞায় এক নম্বর কিপার আনিসুর রহমান জিকো নেই। বাকি দুই গোলকিপারের মধ্যে কোচ অস্কার ব্রুজন বেছে নেন মেহেদী হাসান শ্রাবণকে। দিনকতক আগে এই মাঠেই লেবাননের বিপক্ষে তার ভুলে পিছিয়ে যেতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। শ্রাবণের সেরকমই এক ভুলে গ্রুপসেরা হওয়ার স্বপ্ন প্রায় মুছে যেতে নিয়েছিল কিংসের। শুরুতে বার দুয়েক মাজিয়ার রক্ষণে হানা দিয়ে স্বার্থপরতায় গোল পাননি এমফন উদোহ ও ডরিয়েলটন। দশম মিনিটে ভুলটা করেন শ্রাবণ। তারিক কাজীর ব্যাক পাস শ্রাবণ ক্লিয়ার না করে ছোট পাস দিতে গিয়ে তুলে দেন মাজিয়ার সার্বিয়ান ফরোয়ার্ড বালবানোভিচের পায়ে। এই সার্বিয়ানের শট ববুরবেক ব্লক করলেও ফিরতি বল ডানপায়ের শটে ফাঁকা জালে জড়ান ঘানার ফরোয়ার্ড রেগান ওবেং।
পিছিয়ে পড়ে কিছুটা এলোমেলো হয়ে যায় কিংস। মাজিয়াও মিগেল, ডরিয়েলটনদের খোলসমুক্ত হতে দেয়নি প্রথমার্ধে। ৪২ মিনিটে অবশ্য ডানদিক থেকে বিশ্বনাথের ক্রসে সাদ উদ্দিন লাফিয়ে হেড করেছিলেন, যা মাজিয়া কিপার হুসেইন শারিফ রুখে দেন। ফিরতি বলে এমফন উদোহর এলোমেলো শট বাইরে যায়। তবে বিরতি থেকে ফিরে আক্রমণে ঝাঁপায় কিংস। শুরুতেই গোল পেতে পারত তারা। মিগেলের বাড়ানো পাস বক্সে পেয়ে উদোহ দেখেশুনে শট নিয়েছিলেন কিন্তু তা দারুণ দক্ষতায় ফিস্ট করে ফেরান মাজিয়া গোলকিপার। পরের মুহূর্তে ডরিয়েলটনের হেড পোস্ট ঘেঁষে বাইরে যায়। ৫১ মিনিটে প্রতি আক্রমণ থেকে বল পেয়ে যান উদোহ। অনেকটা এগিয়ে আড়াআড়ি পাস দেন আনমার্কড বিশ্বনাথকে। তবে কিপারকে একা পেয়েও গোল করতে পারেননি বিশ্বনাথ। ৬৭ মিনিটে রাকিবের জায়গায় শেখ মোরসালিন ও সোহেল রানার জায়গায় রফিকুল ইসলামকে নামান ব্রুজন। এই দুই পরিবর্তনে আক্রমণে গতি বাড়লেও প্রতিপক্ষের গোলের দরজাটা ঠিক খুলছিল না। ৭৭ মিনিটে ভালো জায়গায় বল পেয়েও কিপার বরাবর শট মেরে সুযোগ নষ্ট করেন মোরসালিন। তবে তিন মিনিট পর তার কর্নারেই গোলমুখের জটলা থেকে ববুরবেকের হেড এক ড্রপে জালে জড়ালে ম্যাচে আসে সমতা। ৮৬ মিনিটে দুটি সুযোগ হাতছাড়া হয় কিংসের। মিগেলের কর্নারে জটলা থেকে পা ছোঁয়াতে ব্যর্থ হন উদোহ। এরপর মোরসালিনের থ্রো-ইন পেয়ে উদোহর ক্রসে ডরিয়েলটনের হেড পোস্টের ওপরের দিকে আঘাত হেনে বাইরে যায়। দুই মিনিট পরেই মাজিয়া শিবিরকে হতাশায় ডুবিয়ে অসাধারণ গোল করেন মিগেল। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে দুজনকে কাটিয়ে ডরিয়েলটনকে বাড়িয়েছিলেন মিগেল। ডরিয়েলটন আলতো টোকায় বল ফেরত দিলে মিগেল প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে বাঁ পায়ের শট নেন যা হাওয়ায় বাঁক খেয়ে মাজিয়া কিপারের মাথার ওপর দিয়ে জমা হয় দূরের পোস্টে। শেষ পর্যন্ত সেই লিড ধরে রেখে কিংস মাঠ ছাড়ে হাসিমুখে। আর সেই বিজয়ী দলের মহারাজা হয়ে ফেরেন অবিশ্বাস্য জয়সূচক গোল করা মিগেল।
৫টি করে ম্যাচ শেষে পয়েন্ট টেবিলে ১০ পয়েন্ট নিয়ে কিংস আছে সবার ওপরে। সল্টলেকে মোহনবাগানকে ৫-২ গোলে হারিয়ে ৯ পয়েন্টে দুইয়ে উঠে এসেছে ওড়িশা। ৭ পয়েন্ট নিয়ে বাগানও আছে সেরার লড়াইয়ে। তবে ৩ পয়েন্টে সেরার লড়াই থেকে ছিটকে গেছে মাজিয়া।
