সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে কাল হঠাৎ হাজির ১৮০ কিশোরী। তারা মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বার্ষিক শিক্ষা সফরের দিনটা তারা কাটাচ্ছে নাজমুল শান্তদের খেলা দেখে। ক্রিকেটের প্রতি সিলেটের মেয়েদের আগ্রহ এতটা প্রবল! যা দেখে স্থানীয় ক্রিকেট কর্তাদের চোখও যে কপালে উঠবে। কেননা জাতীয় লিগের বিভাগীয় দলে যে স্থানীয় ক্রিকেটারের দেখাই মেলে না। সেই বিভাগের মেয়েরাই কিনা মাঠের ক্রিকেটে আছে পিছিয়ে।
জাতীয় লিগে সিলেট বিভাগ হয়েছে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন। অথচ বিভাগটিতে সংকট স্থানীয় নারী ক্রিকেটারের। ‘ভাড়াটে’ ক্রিকেটার দিয়েই মুখে হাসি ফুটছে দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলটির ক্রিকেট কর্তাদের। পদে পদে বাধার সম্মুখীন এখানকার মেয়েদের ক্রিকেটে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেই কোনো। সাহায্যের হাত বাড়ায় না বিসিবিও।
সিলেটের মেয়েরা ক্রিকেটে অনাগ্রহী হওয়ার পেছনে আছে পারিবারিক ও সামাজিক বাধা, সঙ্গে আছে পারিপাশির্^ক চাপ। চায়ের দেশের পাশাপাশি সিলেট আবার ‘৩৬০ আউলিয়ার’ পুণ্যভূমি হিসেবেও পরিচিত। দেশের নানাপ্রান্ত থেকে হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার দর্শনে আসেন। এখানকার মানুষরাও ধর্মপ্রাণ। তাই মেয়েদের ক্রিকেটে পরিবার থেকেই নাকি নিরুৎসাহিত করা হয়। পাশাপাশি বিসিবি থেকেও পর্যাপ্ত সহযোগিতা করা হয় না। যে কয়েকজন সিলেটের মেয়ে সব বাধা উপেক্ষা করে খেলে থাকেন, তাদেরও আলোর পথ দেখানোতে আগ্রহ নেই বোর্ডের। নিজ বিভাগের হয়ে দলে পর্যন্ত রাখা হয় না। কোটা পূরণ করতে অন্য বিভাগের মেয়েদের খেলানো হয় সিলেটের জার্সিতে।
এমনটাই জানা গেল স্থানীয় কয়েকজন কোচের সঙ্গে কথা বলে। তারা জানান, এত অনাগ্রহের পরেও বিভাগে নারী ক্রিকেটারের সংখ্যা ১০ জন। চার জেলাতেই তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। কিন্তু নিজেদের বিকাশের সেরকম কোনো সুযোগ পাচ্ছেন না। তার দায়টা বিসিবির ঘাড়েই চাপালেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক কোচ। ‘আমাদের ১০ জন নারী ক্রিকেটার আছে। কিন্তু কেউ সেভাবে নিজেকে বিকাশের সুযোগ পাচ্ছে না। স্বয়ং ক্রিকেট বোর্ডই তা হতে দিচ্ছে না। সিলেটের স্থানীয় ক্রিকেটারদের তো দলেই রাখা হয় না। অল্প কয়েকজনকে রাখলেও আবার একাদশে সুযোগ পায় না। এমনটা হতে থাকলে এই বিভাগের মেয়েরা ক্রিকেটে আগ্রহী হবে কীভাবে!’
এমন সমস্যায় একসময় ছেলেদের ক্রিকেটেও জর্জরিত সিলেট। জাতীয় দলের নিয়মিত মুখ অথচ ছন্দে নেই, এমন ক্রিকেটারদের একসময় সিলেট বিভাগীয় দলে জায়গা দেওয়া হতো। এ নিয়ে স্থানীয়দের অনেক লড়াই করতে হয়েছে। মাঝে তা বন্ধ হলেও জাতীয় লিগের সবশেষ আসরেও একই দৃশ্য দেখা গেছে ছেলেদের সিলেট বিভাগীয় দলে।
সেই কোচের দাবি স্থানীয় ক্রিকেটারদের প্রাধান্য দিয়ে তবেই বাকিদের সুযোগ দেওয়া। ছেলেদের ক্রিকেটে যেমন সিলেট থেকে উঠে আসছে অনেক পেসার। তাদের একজন কুলসুমা আক্তার। গত বছর জাতীয় লিগে একাদশে তাকে দেখাই যায়নি। আবার নিলেও তাকে দিয়ে বোলিং করানোই হয়নি। শুধু কুলসুমাই নন। পিংকি রহমান ও উইকেটকিপার ব্যাটার রুমি খানমরাও সুযোগ পান না। লড়াই সংগ্রাম করেও সুযোগ না পাওয়ায় একটা সময় তারা হারিয়ে যেতে পারেন বলে শঙ্কা স্থানীয় ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের।
সিলেট বিভাগীয় দলের হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ী কোচ তপন মালাকার বলছিলেন, ‘এখানকার মেয়েরা পরিবার থেকে সমর্থন পায় না। তাছাড়া খেলতে যে আসবে ভবিষ্যৎ কী! স্থানীয় ক্রিকেটে মেয়েদের কোনো লিগ হয় না। বয়সভিত্তিক কোনো ক্রিকেট নেই। হয় জাতীয় লিগ খেলো, নয়তো ঢাকায় গিয়ে লিগ। তাই অনেকেই আগ্রহ হারায়। একটু বয়স বাড়লে পরিবার মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়, নয়তো লন্ডনে পাঠায়।’
সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক মারিয়ান চৌধুরী মাম্মি জানালেন চার জেলার স্কুলগুলোতে অন্বেষণ শুরু করছেন তারা ‘এই প্রক্রিয়াটা আরও আগেই আমাদের শুরু করা উচিত ছিল। নভেম্বরে স্কুল ক্রিকেট শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাসহ নানা কারণে সেটা হয়ে ওঠেনি। তবে আমরা খুব শিগগিরই স্কুল থেকে ক্রিকেটার খোঁজা শুরু করছি। আশা করি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সিলেট বিভাগীয় নারী দল শুধুই স্থানীয়দের নিয়ে গড়া হবে।’
স্থানীয় বেশ কয়েকজন ক্রীড়া সংগঠক জানালেন আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থা না থাকায় এমন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এ বিষয়ে বিসিবি পরিচালক ও নারী উইংয়ের চেয়ারম্যান শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল গতকাল বলেন, ‘আমরা যখন প্রথমবার বোর্ডের দায়িত্বে আসি তখন থেকেই আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থার কথা বলে আসছি। এই মেয়াদে সেটা আলোর মুখ দেখতে পেয়েছে। ইতিমধ্যে কিছু জায়গায় কার্যক্রম শুরু করেছে। আমি আশাবাদী আগামী বছর থেকে সিলেটেও কার্যক্রম শুরু হবে।’ আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থা চালু হলে নিজেদের কোচ ও নির্বাচকরা নিজেদের মতো করে দল গড়তে পারতেন। তাতে তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিকেটারের সংখ্যা আরও বাড়ত।
