বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচার বা দণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না। সংবিধানে এমন বিস্তৃত অধিকার থাকা সত্ত্বেও দেখা যায় আইন ও বিধির কথা বলে প্রায়শই নাগরিকের অধিকার ভঙ্গের পাশাপাশি হয়রানি ও অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে। দেখা যায় প্রায়শই কিছু ব্যক্তি ও আসামি গ্রেপ্তারে পুলিশের অতি উৎসাহ। ভুক্তভোগীদের অমানবিকভাবে টানাহেঁচড়া করা, ডান্ডাবেড়ি, হাতকড়া ও কোমরে দড়ি বাঁধার মতো ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়। এসব খবর ও ছবি প্রচার পাওয়ার পর পুলিশ বিভাগও প্রায়ই বিব্রত হয়।
মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘ছেলে পলাতক মাকে ধরে নিয়ে গেল পুলিশ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে অপহরণ মামলার আসামি ছেলেকে না পেয়ে বৃদ্ধ মাকে ‘টেনেহিঁচড়ে’ ধরে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আনোয়ারা বেগম (৬৫) নামে ওই নারীকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারেও পাঠানো হয়েছে। ছয় দিন ধরে তিনি কারাবন্দি। মামলা ছাড়াই ধরে নিয়ে যাওয়া এবং কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় নাঙ্গলকোট থানা-পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ওই নারীর স্বজন ও স্থানীয় মানুষ। আমাদের কথা হচ্ছে ওই বৃদ্ধার অপরাধ থাকলে আদালত তাকে শাস্তি দেবে। তাছাড়া, অপরাধ প্রমাণিত হলেও কি পুলিশ একজন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধাকে ‘টেনেহিঁচড়ে’ নিয়ে যেতে পারে? এক্ষেত্রে কি নারী পুলিশ থাকার দরকার নেই? বলা হচ্ছে, কেউ ওয়ারেন্টভুক্ত কিংবা এজাহারভুক্ত আসামি না হলে পুলিশ তদন্তে যদি তার সম্পৃক্ততা পায় তবে তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে। পুলিশের এই ক্ষমতার ব্যবহারে আরও সতর্কতা জরুরি। কারণ এর যথেচ্ছা প্রয়োগ মানবাধিকার লঙ্ঘন তো বটেই অপপ্রয়োগের কালিমাও লেগে যেতে পারে।
একই দিনে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাছে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার ও দাগি অপরাধীদের ধরতে নানা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে অপরাধীদের তালিকার কাজও সম্পন্ন করে আনা হয়েছে। ওই তালিকায় ২৭ হাজার ৫১২ অপরাধীর নাম উঠে এসেছে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশন অপরাধীদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে।
বিরোধীদের দাবি, গত ২৮ ও ২৯ জুলাই থেকে অদ্যাবধি সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৯২৭ মামলায় ২২ হাজার ৪৮১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একদিকে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করছে, অন্যদিকে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নানা রকম নাশকতার ঘটনা ঘটছে। আমাদের কথা হচ্ছে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার অভিযান চালাবে; সেটা বাহিনীর নিয়মিত কাজ। আমরা চাই, সুনির্দিষ্ট অপরাধে দায়ী ব্যক্তিকেই যেন ধরা হয়। মূল অপরাধীদের না ধরে তাদের পরিবারের কোনো সদস্যকে বা অন্য কাউকে গ্রেপ্তার করা না হয়।
বিশেষ কারণ ছাড়াই সংবিধান, উচ্চ আদালত ও আইনের তোয়াক্কা না করে কোমরে দড়ি, ডান্ডাবেড়ি ও হাতকড়া পরানো ও বয়স বিবেচনায় না এনে টেনেহিঁচড়ে গ্রেপ্তার এবং আসামিকে না পেলে পরিবারের সদস্যদের আটকের ঘটনা ঘটছে অহরহ। যেন মানবতাই গ্রেপ্তার হচ্ছে এসব ঘটনায়। গত তিন মাসে বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়াই ডান্ডাবেড়ি, হাতকড়া ও কোমরে দড়ি পরানোর অন্তত চারটি ঘটনা আলোচনায় এসেছে। যদিও বাস্তবে এমন ঘটনা অনেক বেশি, কিন্তু আলোচনায় আসে না। অনেকে প্রতিবাদও করেন না। গ্রেপ্তার বা আটকের আগে-পরে নির্যাতন ও খারাপ আচরণের অভিযোগও পুরনো।
গ্রেপ্তার ও আটকের ক্ষেত্রে আইন ও অন্যান্য বিধিতে কিছু সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। কিন্তু কোথাও অভিযোগের নামে কোনো নাগরিককে অসম্মান ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের কথা বিন্দুমাত্র বলা নেই। আর সব আসামির ক্ষেত্রে কিন্তু আমরা পুলিশের সমান তৎপরতা দেখি না। তাহলে আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে কীভাবে?
