যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে ভারতের অ্যাপোলো হাসপাতালের বিরুদ্ধে কিডনি কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, হাসপাতালটি মিয়ানমারের দরিদ্র মানুষদের কাছ থেকে যুক্তরাজ্যসহ সারা বিশ্বের ধনীদের জন্য কিডনির ব্যবস্থা করছে। এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে হাসপাতালের পক্ষ থেকে ইন্দ্রপ্রস্থ মেডিকেল করপোরেশন লিমিটেড (আইএমসিএল) এই খবরকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বলে বর্ণনা করেছে।
অ্যাপোলো হাসপাতাল আইএমসিএল-এর অংশ এবং ভারতের অন্যতম বড় হাসপাতাল গ্রুপ। অ্যাপোলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর।
আইএমসিএল মুখপাত্র বলেছেন, কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের জন্য প্রতিটি আইনি ও নৈতিক বিধিবিধান মেনে চলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি নির্দেশিকা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া। সব ধরনের সম্মতি নিয়েই প্রতিটি ট্রান্সপ্লান্টের কাজ করা হয় বলে জানিয়েছে ইন্দ্রপ্রস্থ মেডিক্যাল করপোরেশন লিমিটেড।
তবে অ্যাপোলোর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছে দিল্লির স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়। দিল্লির স্বাস্থ্যসচিব জানিয়েছেন, অভিযোগের তদন্ত করতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিডনি দাতা ও গ্রহীতাদের সম্পর্ক খতিয়ে দেখতে তাদের বিস্তারিত পরিচিত সংগ্রহ করা হবে। এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত ফলাফল পাওয়া পাবে।
গত রবিবার (৩ ডিসেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে, কিডনি-বাণিজ্য চক্রের সঙ্গে দিল্লির অ্যাপোলো হসপিটালের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের কিডনি কেনা-বেচা অবৈধ। তবু বেআইনিভাবে মিয়ানমারের দুস্থ মানুষদের কাছ থেকে কিডনি কিনে ধনীদের কাছে চড়ামূল্যে বিক্রি করছে নামকরা এই হাসপাতালটি।
টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয় মূলত দিল্লির ইন্দ্রপ্রস্থ অ্যাপোলো হসপিটালকে নিয়ে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে টেলিগ্রাফ বলেছে, এ হাসপাতালে প্রতি বছর ১ হাজার ২০০টিরও বেশি কিডনি কেনাবেচা হয় এবং চোরাই পথে ভারতের বাইরে, এমনকি যুক্তরাজ্যেও পাঠানো হয় কিডনি।
এসব কিডনি মূলত সংগ্রহ করা হয় মিয়ানমারের দরিদ্র লোকজনের শরীর থেকে। প্রতিটি কিডনির জন্য ডোনার বা দাতাকে দেওয়া হয় ৮০ থেকে ৯০ লাখ রুপি, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ কোটি ৫ লাখ ৫৭ হাজার থেকে ১ কোটি ১৮ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। দালাল বা এজেন্টের মাধ্যমে অর্থের লোভ দেখিয়ে মিয়ানমারের বিভিন্ন গ্রাম থেকে তরুণ-তরুণীদের দিল্লিতে নিয়ে আসা হয়। তারপর অ্যাপোলো বা এই গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত কোনো হাসপাতালে হয় অপারেশন।
এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত একজন দালালের সঙ্গে কথা হয় টেলিগ্রাফের। তিনি বলেন, ‘কিডনির ব্যবসা বিরাট। কিডনি দাতাদের আনা-নেওয়ার জন্যঢ়দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাদের বিপুল অর্থ ঘুষ দেওয়া হয়।’
মিয়ানমারের এসব দরিদ্র মানুষদের কিডনি কেনেন বড়লোক ক্রেতারা। এসব ক্রেতাদের মধ্যে বিভিন্ন দেশে বসবাসরত ধনী বার্মিজরাও রয়েছেন।
টেলিগ্রাফে উঠে এসেছে ৫৮ বছর বয়সী বার্মিজ নারী দাও সোয়ে সোয়ে নামের এক ক্রেতার কথা। যুক্তরাজ্য প্রবাসী দাও সোয়ে সোয়ে প্রচুর অর্থসম্পদের মালিক। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে দিল্লির আইসিএমএল হাসপাতালে এসে অপারেশনের মাধ্যমে নতুন কিডনি নেন তিনি। কিডনি ক্রয় বাবদ সেসময় ডোনারকে ৩১ হাজার ইউরো, বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৬ লাখ ৭৭ হাজার টাকা দিয়েছিলেন তিনি।
ভারতের অন্যতম শীর্ষ চিকিৎসক এবং সার্জন ডা. সন্দ্বীপ গুলেরিয়ার সংশ্লিষ্টতার তথ্যও পাওয়া গেছে এই চক্রের সঙ্গে। দেশটির তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্ম শ্রী অর্জন করা এই চিকিৎসক কিডনি প্রতিস্থাপনসংক্রান্ত অনেকগুলো অপারেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে দাবি করেছে টেলিগ্রাফ।
ডা. গুলেরিয়া অবশ্য এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে বলেছেন, তার পর্যায়ের একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ আনা ‘হাস্যকর’ এবং ‘আক্রমণাত্মক’।
তবে ডা. গুলেরিয়ার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ নতুন নয়। এর আগে ২০১৬ সালে ভারতের সংবাদমাধ্যম ডেকান হেরাল্ড তাদের এক অনুসন্ধানি প্রতিবেদনে এই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ এনেছিল। এবং সেই সময়েও এ অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
প্রসঙ্গত, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচার ও প্রতিস্থাপন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক চোরাকারবারগুলোর মধ্যে একটি। যুক্তরাজ্যের সেন্ট মেরি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জানিয়েছেন বিশ্বে প্রতি ১০টি প্রতিস্থাপিত অঙ্গের একটি চোরাই পথে আসছে।
