কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের জগতে কিছুু অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটছে এবং তার সবটাই সুখবর নয় এআই বিতর্কের অন্যতম কণ্ঠস্বর গ্যারি মার্কাসের এই বক্তব্যই এখন সত্য বলে প্রতিফলিত হচ্ছে। ডিপফেক পর্নো বানিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে নারীদের। ডিপফেক পর্নো বেশ ভোগাচ্ছে বলিউডকে। ভারতীয় অভিনয়শিল্পীদের একের পর এক ডিপফেক ভিডিও তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে তুমুল বিতর্কে পড়ছেন অভিনেত্রীরা।
ডিপফেক কী?
ডিপফেক শব্দটি এসেছে ‘ডিপ লার্নিং’ অর্থাৎ গভীরভাবে শিক্ষা নেওয়া এবং অন্যদিকে ‘ফেক’ অর্থাৎ নকল বা ভুয়া এই দুই শব্দের সংমিশ্রণ থেকে। ছবি এবং ভিডিও সংশ্লেষণে প্রশিক্ষিত এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাযুক্ত সফটওয়্যার এই ভিডিওগুলো তৈরি করে থাকে।
ডিপ ফেক পর্নো হচ্ছে এমন এক ধরনের পর্নোগ্রাফিক ভিডিও, যাতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে একজন নারীর দেহের সঙ্গে আরেকজন নারীর মুখ যোগ করে দেওয়া হয়। এর শিকার হয়েছেন যে নারীরা তাদের নিয়ে ‘মাই ব্লন্ড জিএফ’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছেন রোজি মরিস। ছবিটিতে এই নারীরা বর্ণনা করেছেন, এই ডিপফেক পর্নো কীভাবে তাদের জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।
বলিউডের শিকার যারা
বলিউডে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ডিপফেক। ইতিমধ্যে বিব্রতকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন রাশমিকা মান্দানা, ক্যাটরিনা কাইফ, কাজল, আলিয়া ভাটের মতো নায়িকারা।
রাশমিকা মান্দানা
রাশমিকা মান্দানা বলিউডের প্রথম শিকার। এক নারীর মুখের মধ্যে রাশমিকার মুখ বসিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রথমে সবাই মেয়েটিকে রাশমিকাই মনে করে সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ জানায়। পরে জানা যায় সেটা ডিপফেক। দেখা যাচ্ছিল লিফটের মধ্যে ঢুকছেন রাশমিকা। পরনে তার কালো রঙের পোশাক। পোশাকটির গলা গভীরভাবে কাটা। এতটাই কাটা যে, ওই পোশাকের মধ্যে দিয়ে উঁকি মারছে অভিনেত্রীর বুক! আর মুহূর্তেই ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়। সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হতে থাকেন তিনি।
‘অ্যানিম্যাল’ সিনেমার প্রচার করতে গিয়ে অভিনেত্রী বলেন, ‘আমি যখন প্রথম ওই ভিডিওটা দেখি, তখন আমি রীতিমতো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি ভাবিওনি যে, আমি কারও কোনো রকম সাহায্য পাব। তার পর আমার পাশে এসে দাঁড়ান অমিতাভ বচ্চন।’ তিনি বলেন, ‘কিন্তু এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেলে চলবে না। নিজে এগিয়ে এসে আওয়াজ তুললে এমন অনেকেই আছেন, যারা আপনার পাশে দাঁড়াবেন।’
ক্যাটরিনা
ক্যাটরিনার ‘টাইগার থ্রি’-এর ট্রেলারে একটি দৃশ্যে ক্যাটরিনাকে দেখা গেছে তোয়ালে জড়িয়ে অন্য এক অভিনেত্রীর সঙ্গে লড়াই করতে। সেই দৃশ্যেই ক্যাটের ছবির ওপরে চলে কারসাজি। আসল ছবিতে তোয়ালে দিয়ে ঢাকা নায়িকার শরীর। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ডিপফেক ছবিতে প্রায় অনাবৃত ক্যাটরিনা। শুধু তাই নয়, ছবিকে চিত্তাকর্ষক করে তুলতে ক্যাটের চেহারাতেও একাধিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে যে ছবি ছড়িয়ে পড়েছে আগুনের মতো।
কাজল
ডিপফেকের শিকার হয়েছেন বলিউডের ‘ডিডিএলজে’খ্যাত অভিনেত্রী কাজল। ভাইরাল সেই ভিডিওক্লিপে দেখা যাচ্ছে, ক্যামেরার সামনে পোশাক বদলাচ্ছেন কাজল। মূলত এটি একটি ডিজিটালি এডিট করা ভিডিও। যেখানে অন্য কোনো নারীর মুখে কাজলের মুখচ্ছবি এডিট করে বসানো হয়েছে। কিন্তু নেটিজেনদের অনেকেই ভিডিওটিকে সত্য বলে ভেবে শেয়ার করেছিলেন।
আলিয়া ভাট
ডিপফেক ভিডিওতে আপত্তিকর পোশাকে দেখা গেছে আলিয়াকেও। আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা যায়। তবে ভিডিও থেকেই স্পষ্ট, ওই নারী মোটেও আলিয়া নন। এরপরও ছড়িয়ে পড়ে ওই আপত্তিকর ভিডিও। তবে বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলেননি অভিনেত্রী। তার স্বামী রণবীর কাপুরও এ বিষয়ে কথা বলেননি।
প্রিয়াঙ্কা চোপড়া
প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার একটি অডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে জানা যায় সেটা অভিনেত্রীর নয়। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, যে অডিও ক্লিপটিকে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি প্রিয়াঙ্কার অন্য এক ভিডিওতে ছিল। ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই অডিওর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রিয়াঙ্কার কথা। ওই অডিওতে নিজের বার্ষিক আয়ের বর্ণনা দিয়েছেন অভিনেত্রী, যা সম্পূর্ণ বানোয়াট।
বাংলাদেশে ডিপফেক
বলিউডে ভোগালেও দেশের শোবিজ অঙ্গনে তেমনভাবে এ ধরনের প্রযুক্তির প্রভাব পড়েনি। তবে বলিউড অভিনেত্রীদের পূর্বেই বাংলাদেশের নওরীন আফরোজ নামের একজন মডেল ও উদ্যোক্তা ডিপফেকের শিকার হন। বাথরুমের একটি ভিডিওতে তার মুখ জুড়ে দেওয়া হয়। দেশের একটি টেলিভিশনের সামনে এসে কেঁদে ফেলেন নওরীন। বললেন, ‘আমার মা যখন ভিডিওটি দেখেন তখন বলেন, এটা তো তুমি না। আমি বললাম, হ্যাঁ এটাই তো তোমাকে বোঝাতে চেষ্টা করছি। আমার বাবা-মা ভাবছিল, এখনো আমার মেয়ের বিয়ে হয়নি, এখনই কী হয়ে গেল আমার মেয়েটার।’
বাংলাদেশে এই অপরাধের শাস্তি
বাংলাদেশে এমন অপরাধে কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের সাবেক এডিসি ও বর্তমানে পুলিশ সুপার নাজমুল ইসলাম বলেন, ডিপফেক বা এআই দিয়ে বানানো ফেব্রিকেটেড ভিডিও বা ফটোসÑ বড় কনসার্ন আমাদের জন্য। সাধারণ মানুষ তো বটেই, তারকাদের জন্যও বড় কনসার্ন। সচেতনতাই পারে এর থেকে রক্ষা পেতে। মানুষের মধ্যে এটা প্রতিষ্ঠিত হতে হবে যে, এটা একটা ক্রাইম। কাউকে হেয় করা, ছোট করা বা পর্নোগ্রাফি করা একটি অপরাধ এই বোধটা সবার মধ্যে আসা দরকার। এটা সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে সচেতন করা যেতে পারে।
দুই ধরনের শাস্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন অপরাধ এ দেশে সংঘটিত হলে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে। এর অপরাধীকে খুঁজে পেতে প্রযুক্তি রয়েছে। আর অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনার জন্য কঠিন আইন রয়েছে। হালের সাইবার নিরাপত্তা আইন রয়েছে, রয়েছে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২। এই দুটো আইন দিয়ে আমরা এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। এমন ভিডিও বানালে পর্নোগ্রাফি আইন ব্যবহার করতে পারি আর যদি কারও সম্মানহানি ঘটানো হয় বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয় তাহলে সাইবার নিরাপত্তা আইন ২৫ ও ২৭ ধারা মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
