ইসলামের দৃষ্টিতে যৌবনকাল মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বড়ই নেয়ামত। যৌবনের যথাযথ মূল্যায়ন, পরিচর্যা ও সঠিক পথনির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যৌবনের নৌকা যদি একবার অনৈতিকতার প্রবল স্রোতে ভেসে যায়, তাহলে তা জীবনের প্রকৃত মোহনায় মিলিত হওয়া দুরূহ হয়ে ওঠে। যৌবনকে যদি জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে সফল করার সিঁড়ি বানাতে না পারে, ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির সোপান বানাতে না পারে তাহলে পুরো জীবনই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ইতিহাসের প্রতিটি আন্দোলনে বিজয় কিংবা সাফল্যের পেছনে আছে যুবসমাজের সংগ্রাম আর আত্মত্যাগ। অথচ আজকে যদি আমরা দেশের তরুণ-যুবকদের দিকে দৃষ্টি দিই তাহলে যে চিত্র ভেসে ওঠে তা মোটেও স্বস্তিদায়ক বা আশাব্যঞ্জক নয় বরং হতাশাজনক। আজকের যুবসমাজ তাদের আত্মপরিচয় ভুলে গিয়ে অন্ধকারের সর্বনাশা গলিপথে উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা ভুলে গেছে তাদের পরিচয়, ক্ষমতা, দক্ষতা ও শক্তি-সামর্থ্যরে কথা। আজকের যুবসমাজ ভুলে গেছে তাদের রক্তের বিনিময়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে অসংখ্য শাসক-শোষকের রাজ্যসীমা, রচিত হয়েছে হাজারো নতুন ইতিহাস। অথচ খুবই দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকে তারা এমন কোনো হীন কাজ নেই যা করছে না। চাঁদাবাজি, গুম, খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ, হল দখল, মাদকাসক্তি, ইভটিজিং এবং সবচেয়ে ভয়ংকর হলো জঙ্গিবাদের মতো ভয়াবহ সন্ত্রাসেও জড়িত।
যুবসমাজের এই অধঃপতনের প্রধান কারণ হলো মানবজীবনের জন্য স্রষ্টা কর্র্তৃক প্রেরিত বিধান আল-কোরআন এবং মানবতার সর্বজনীন কল্যাণকামী এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুকরণীয় আদর্শ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ না করা। তা ছড়াও নৈতিক শিক্ষার অভাব, অর্থনৈতিক সংকট, বেকার সমস্যাসহ চলমান সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বহুলাংশে এর নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। যুবসমাজ যখন নিজেকে অধিকারবঞ্চিত ভাবে, সমাজ বা রাষ্ট্রকে নিজের ব্যর্থতার জন্য দায়ী মনে করে এবং তা থেকে পরিত্রাণের কোনো সদুপায় জানা না থাকে, তখনই প্রতিক্রিয়াশীল কার্যক্রমে নিজেকে জড়িয়ে নেয়। জগাখিচুড়ি মার্কা আদর্শে পরিপুষ্ট আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কারণে অত্যাচার, নির্যাতন, সহিংসতা, মিথ্যাচার, প্রতারণা, দ্বিচারিতা, অমানবিকতা, অযৌক্তিকতা, দলীয়করণ, মেধার অবমূল্যায়ন, সম্পদের অসম বণ্টন, বিচারহীনতা, ঘুষ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রাচুর্যের লোলুপতা, নৈতিকতাহীন নেতৃত্ব আমাদের মুক্ত বিবেকের দুয়ারে প্রতি মুহূর্তে প্রবলভাবে যে ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে, আবেগপ্রবণ তরুণ-যুবকদের পক্ষে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের চিত্তমানস জুড়ে আকুলি-বিকুলি করতে থাকে হাজারো ভাবনা আর পরিকল্পনা। জীবনের এই সংশয়াচ্ছন্ন বয়সে যারা সঠিক শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা পেয়েছে, সঠিক আদর্শের পরশ পেয়েছে, সঠিক নেতৃত্বের সংস্পর্শে আসতে সক্ষম হয়েছে, তারা একসময় সমাধানের উপায় বা পথ খুঁজে নেয়। কিন্তু যারা কোনো পথভ্রষ্ট, আদর্শহীন, চরিত্রহীন ও স্বার্থবাদী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর খপ্পরে পড়ে, তারা সমাজবিধ্বংসী ও আত্মবিনাশী রাস্তাকেই সমাধানের যথার্থ পথ ভেবে বসে। আত্মবিস্মৃতির অতলে ভাসিয়ে দেয় জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় যৌবনকাল। এ অবস্থা থেকে আমাদের যুবসমাজকে বেরিয়ে আসতে হবে। আত্মবিস্মৃত হওয়া বা আপন অস্তিত্ব ভুলে গেলে চলবে না।
মানুষ হিসেবে সৃষ্টির যে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা এবং সময় হিসেবে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় ‘যৌবনকাল’ যেন কোনোভাবেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত না হয়, সেই পদক্ষেপ নিতে হবে। খুঁজে নিতে হবে মানবজীবনের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ, সবচেয়ে সফল ও নিষ্কলুষ জীবনচরিত। যৌবনকালকে কলুষতা ও পঙ্কিলতামুক্ত করতে হলে যুবসমাজকে অনুসরণ করতে হবে পৃথিবীর সর্বকালের সর্বোত্তম ও সর্বোৎকৃষ্ট চারিত্রিক আদর্শকে, যা শুধু নবী করিম (সা.)-এর জীবনাদর্শেই খুঁজে পাওয়া যায়। যেমনটি পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা দিয়েছেন, ‘হে রাসুল! আপনি সর্বোত্তম চারিত্রিক মাধুর্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।’ সুরা কলম
যুবসমাজকে আল্লাহর রাসুল (সা.) খুবই মূল্যায়ন করতেন। হাদিসে নবী করিম (সা.) ‘যৌবন’কে গনিমতের মাল তথা ‘মূল্যবান সম্পদ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তাই আমাদের ভাবতে হবে, আমরা যৌবনকে কোন কাজে কীভাবে ব্যবহার করছি। আমরা কি আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য ঠিকমতো পালন করছি, না শুধু দুনিয়ার সফলতার পেছনে ছুটছি। আমরা যত বড় শিক্ষিত হই না কেন, যত ডিগ্রি অর্জন করি না কেন, আমাদের মধ্যে যদি নবী করিম (সা.)-এর আদর্শ না থাকে, তাহলে জীবন বৃথা।
আমরা জানি, নবী করিম (সা.) তরুণ বয়সে সততা ও বিশ্বস্ততার কারণে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। সভ্যতা-বিবর্জিত অন্ধকার যুগে একজন তরুণ বা যুবক কতখানি বিশ্বস্ত হলে অসভ্য ও বর্বর জাতির লোকজন তাকে সম্মানের সঙ্গে স্বতন্ত্র এক অভিধায় ভূষিত করতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
আমরা চাই আমাদের যুবসমাজ সব মিথ্যা ও ভ্রান্তি ছেড়ে ইসলামের সুমহান সৌন্দর্যে নিজেদের যৌবনকে রাঙিয়ে নিক এবং দেশ ও ইসলামের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করুক। কারণ এই যুবকদের জন্যই আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যেদিন আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত শ্রেণির মানুষ আরশের নিচে প্রশান্তির সঙ্গে থাকবে। তার মধ্যে এক শ্রেণির মানুষ হলো ওই যুবক, যার যৌবন কেটেছে আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসেবে।’ সহিহ বোখারি
