জাপাকে আসন ছাড়তে নারাজ শেখ হাসিনা

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:৫৬ এএম

দলের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের মতো সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) ব্যাপারেও একেবারেই অনমনীয় আওয়ামী লীগ। দলটির সঙ্গে কোনো আসন সমঝোতায় যাবে না ক্ষমতাসীনরা। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, জাপাকেও নিজের শক্তি দিয়েই জিতে আসতে হবে। এ সিদ্ধান্তে জাপা নির্বাচনে থাকবে, থাকবে না তাও আমলে নিচ্ছেন না তিনি। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জাপার বিষয়ে দলীয় প্রধানের এমন অনমনীয় অবস্থানের কথা জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমি কোনো কিছু পরিষ্কার নই। জেনেবুঝে কথা বলব।’

গতকাল কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে জাপার নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সংশয় প্রকাশের খবর ছাপা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেছেন, গতকাল মঙ্গলবার জাপার নেতা রওশন এরশাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের পর আসন সমঝোতা হবে না বলে দলের নেতাদের জানানো হয়। বৈঠকে রওশন জাপাকে জোটে না নিতে ও আসন সমন্বয় না করতে অনুরোধ করেন। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বিএনপি ভোটে নেই, জোট করব কেন?

তারা জানান, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান কাজী জাফর উল্লাহসহ কয়েকজনকে জাপার কাছে তথ্য পৌঁছে দিতে বলা হয়েছে। এ নেতারা আরও বলেন, জাপা নির্বাচন বর্জন করার মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত বদল করবেন না। স্বতন্ত্র প্রার্থী রেখে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ দুই নেতা বলেছেন, নির্বাচন ঘিরে সব দলই চাপে রেখে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার কাছ থেকে দাবি আদায় করতে চায়। তিনি সেই সুযোগ কাউকে দিতে চান না।

রওশনের সঙ্গে বৈঠকে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ ও দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকের একটি সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী আসন ভাগাভাগি নিয়ে চলা চলমান আলোচনা বন্ধ করার জন্যও নির্দেশনা দেন। দলের নেতাদের এ নির্দেশনা জানিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন কাজী জাফর উল্লাহকে।

বিকেলে কাজী জাফর উল্লাহ রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে নির্বাচন উপলক্ষে গঠিত দপ্তর উপকমিটির বৈঠকে যোগ দেন। এ কমিটির আহ্বায়ক তিনি নিজেই। যাতে উপস্থিত ছিলেন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের জাতীয় পার্টি নির্বাচনে না যাওয়ার আশঙ্কা করেন। যদিও সকালের ব্রিফিংয়ে জাতীয় পার্টির সঙ্গে আলোচনা চলার কথা জানান তিনি।

বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রওশন জাপার সংকটগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জাপার সঙ্গে জোট ও আসন ভাগাভাগি না করতে অনুরোধ করেছেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি চান সবাই নিজের শক্তিতে জিতে আসুক। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ফলে নিজের শক্তিতে নির্বাচন করতে বাধা কোথায়।

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে এ নেতা বলেন, জাতীয় পার্টি নির্বাচন করবে না, সে ভয় পাচ্ছেন না আওয়ামী লীগ। তারা তো আর বিএনপি না যে নির্বাচন না করে টিকে থাকবে তারা। নির্বাচন না করলে জাপার কপাল পুড়বে। জাতীয় পার্টি তো বিএনপির মতো নয়। তারাই তো ভুলে ভুলে শেষ হয়ে গেল।

শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে তিনি আরও বলেন, বাইরে সবাই বড় বড় কথা বলে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ হতে হবে। কিন্তু তা নিয়ে কোনো কথা নেই। সবাই চায় নিজের জয়ের নিশ্চয়তা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনে করেন, জাপা এই মুহূর্তে নির্বাচনে না গেলে দলটি আরেকবার ব্র্যাকেট (বিভক্ত) বন্দি হবে। দুই-চারজন নেতা যারা দলের ভেতরে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন, সংসদ সদস্য হওয়ার প্রত্যাশায় নির্বাচন থেকে কোনোভাবেই সরবেন না তারা।

জাপার দায়িত্বশীল একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনার এমন অবস্থানের কথা তাদের জানা আছে। তাই অবস্থান পাল্টাতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন জাপার শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। তারা বলেন, এখন জাপাকে নির্বাচন থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই। ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসন সমন্বয় না করার ব্যাপারে অনড় অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু জাপা সম্মানজনক আসন পেয়ে সংসদে থাকতে চায়। এর জন্য আওয়ামী লীগকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

জাপার অন্য একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, তাদের প্রত্যাশা যে, এখন যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে শেষ পর্যন্ত কোনো একটি মহল যুক্ত হয়ে তার একটা সুরাহা করতে হবে।

সূত্রটি আরও বলেছে, জাপার চেয়ারম্যান জিএম কাদের জানিয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনের পক্ষে নন। কিন্তু জাপা নির্বাচনে আসুক বা না আসুক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচন করে ফেলবেন। জাপার শীর্ষসারির নেতারাও নির্বাচনে যেতে আগ্রহী। এ ছাড়া বিদেশি একটি মহলের চাপও রয়েছে দলটির ওপর। ফলে নির্বাচন থেকে দূরে থাকার সুযোগ জাপার নেই।

জাপার শীর্ষস্থানীয় এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা জাপাকে নানা ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। নির্বাচনে যাবে না এ ঘোষণা দেওয়ার সুযোগও জাপার হাতে নেই। যেকোনো মূল্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নমনীয় করার জন্য কাজ করছেন জাপার শীর্ষস্থানীয় নেতারা। আজকালের মধ্যে জাপা চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন নেতা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ চাইবেন। সেখান থেকে ফলাফল আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাপার প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্দেহ ও সংশয় শুরু থেকেই রয়েছে। তবুও জাপার পক্ষ থেকে একাধিকবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে কথা দিলেও রাজনৈতিক অঙ্গীকারে বরাবরই দুর্বলতার পরিচয় দিয়ে আসা জাপার প্রতি অবিশ্বাসও রয়েছে আওয়ামী লীগ সভাপতির। কিন্তু জাপা এ পর্যায়ে নির্বাচন থেকে সরে গেলে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক এ নেতারা বলেন, জাপায় স্বতন্ত্র ভীতি ভর করেছে। দলটি মনে করে, নৌকার চেয়ে স্বতন্ত্র মাঠে থাকলে ৫-৭ আসনের বেশি জাপার জয়লাভ করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই যেকোনো মূল্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রত্যাহার চায় তারা।

জাপার গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সর্বশেষ পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে সব চাওয়া বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত চাইবে জাপা। কারণ, অনেক আসনে স্বতন্ত্র না থাকলে নৌকা থাকলেও জাপা প্রার্থীর জেতার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

রাতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাপার বৈঠক : গতকাল রাতে বনানীর একটি বাড়িতে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন জাপার নেতারা। বৈঠকে আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম। অন্যদিকে জাপা নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে বৈঠক চলে।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ভূমিকা রয়েছে। সারা দেশে যেভাবে নির্বাচনের উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তা অব্যাহত কীভাবে রাখা যায় এবং সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন কীভাবে করা যায় এসব বিষয়ে জাপার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এই আলোচনা চলমান থাকবে। আগামীকাল ও পরশু আবার আলোচনা হতে পারে বলে তিনি জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত