সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি-জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর হরতাল-অবরোধে ২০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন কক্সবাজারের পর্যটন খাতের ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, বিজয় দিবস ঘিরে পর্যটনে আশার আলো দেখছেন তারা।
তারা বলছেন, আজ ও আগামীকাল ছুটি। বৃহস্পতিবার কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না। ফলে পর্যটকরা আসার সুযোগ পেয়েছেন। এরপর কিছুটা কমে গেলেও থার্টিফাস্ট নাইট উপলক্ষে আবারও সমুদ্র সৈকতে ছুটে আসবেন পর্যটকরা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, হোটেল-মোটেলগুলোতে বুকিং আশাব্যঞ্জক। কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকার লেনদেন হতে পারে বলে তারা আশা করছেন।
পর্যটন-সংশ্লিষ্ট নানা সূত্রের তথ্যমতে, অক্টোবর মাস থেকে শুরু হয় পর্যটন মৌসুম। তবে এবারের মৌসুম শুরু হতে না হতেই ২৯ অক্টোবর থেকে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর ডাকা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ে কক্সবাজার। ভরা মৌসুমে প্রতিদিন কমপক্ষে এই খাতের ব্যবসায়ীদের গড়ে প্রায় সোয়া ৪ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। তবে পর্যটনের এই অন্ধকারে আলো হয়ে আসে রেল যোগাযোগ। ১ ডিসেম্বর থেকে বাণিজ্যিকভাবে ঢাকা-কক্সবাজার ট্রেন চালু হলে ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে পর্যটক। সর্বশেষ বিজয় দিবস উপলক্ষে গত ১৩ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত হোটেল-মোটেলের প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ বুকিং হয়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাঁচ তারকা হোটেলসহ কক্সবাজারে ৫ শতাধিক হোটেল, মোটেল, কটেজ ও ফ্ল্যাট রয়েছে। এর অধিকাংশই আগামী ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বুকিং রয়েছে। এ ছাড়া ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বর সেন্টমার্টিনগামী জাহাজের টিকিটও শেষ হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে হোটেল মোটেল গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, অবরোধের কারণে শুধু হোটেলগুলোতে প্রতিদিন কর্মচারীর বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ ও জেনারেটরসহ অন্যান্য খাতে কমপক্ষে গড়ে ৩০ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। সে হিসেবে আবাসন খাতেই দিনে ক্ষতি হয়েছে দেড় কোটি টাকা।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মুখপাত্র কলিম উল্লাহ বলেন, অবরোধের কারণে গণপরিবহন বন্ধ থাকে। এই কারণে পর্যটনে ধস নামছে। আর এই থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে কক্সবাজারে রেলের সংখ্যা বাড়ানো। সারা দেশকে যুক্ত করা।
ট্যুর অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মিজানুর রহমান মিল্কী বলেন, পর্যটন মানেই আবাসিক প্রতিষ্ঠান ও রেস্তোরাঁ নয়। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গণপরিবহন, জাহাজ, ট্যুর অপারেটর, দর্শনীয় স্থানসহ পর্যটন এলাকায় অবস্থিত প্রায়ই সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এভাবে হিসাব করলে গত ৪৭ দিনে পর্যটন খাতে কমপক্ষে ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পর্যটন শহরে প্রায় ১৫০টি ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ভরা মৌসুমে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে গড়ে তিনজন করে কাজ করলেও এবার অবরোধের কারণে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই কর্মচারী নেই। এ ছাড়া এই খাতে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে রেল যোগাযোগ চালু হওয়ায় ও বিজয় দিবস এই অবরোধের ক্ষত শুকাতে মলমের কাজ করছে।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির কক্সবাজার জেলা সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম ডালিম জানান, পর্যটকদের জন্য কক্সবাজার শহরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪৫০ রেস্তোরাঁ রয়েছে। একেকটি রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন গড় ব্যয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। অথচ অবরোধে বেচাকেনা হয়েছে হাজার দশেক টাকা। অর্থাৎ রেস্তোরাঁ মালিকদের প্রতিদিন ২০ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে।
শহরের পাঁচ তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের মুখপাত্র সায়ীদ আলমগীর বলেন, দিবস উপলক্ষে কক্সবাজারে লাখের কাছাকাছি পর্যটক আসছে, এটি সত্য। তবে তাদের মৌসুমের পর্যটক বলতে পারবেন না। টানা ছুটিতে এমনিতেই এখানে লোকজন আসে। তা ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠান এখানে তাদের সেমিনার, সভাসহ নানা বার্ষিক আয়োজনের জন্য এসেছেন। তাদের পর্যটক বলা যাবে না। তবু পর্যটন খাতে যে ক্ষতি হয়েছে তাতে কিছুটা হলেও প্রলেপ দিচ্ছে বিজয় দিবস।
তিনি আরও বলেন, ট্রেন চালু হওয়ার পর মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ জন পর্যটক আসার সুযোগ পাচ্ছে। এ সংখ্যা বাড়াতে হবে। কক্সবাজারের সঙ্গে দ্রুত অন্যান্য জেলার রেল যোগাযোগ বাড়ালে পর্যটক এমনিতেই বেড়ে যাবে বলে তিনি মনে করেন।
হোটেল মোটেল গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম নেওয়াজ বলেন, গত বছর বিজয় দিবস উপলক্ষে পর্যটন খাতে হাজার কোটি টাকার লেনদেন হলেও এবার তা অর্ধেকে নেমে আসবে। এবার বিজয় দিবসের দিন কক্সবাজারে কমপক্ষে দেড় লাখ পর্যটকের সমাগম হবে বলে তিনি ধারণা করছেন।
গতকাল বিকেলে সরেজমিনে সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, হাজার হাজার পর্যটকের পদভারে মুখরিত সৈকত। এখানে দেশীয় পর্যটকের পাশাপাশি রয়েছে বিদেশিদের আনাগোনা।
নেপাল থেকে আসা পর্যটক বেহরেশ রাজ বলেন, প্রাকৃতিকভাবে কক্সবাজার অপরূপ। বিশে^ এমন শহর বিরল যেখানে সাগর, পাহাড়, ঝরনা একসঙ্গে দেখতে পাবেন। আমি ও আমার সঙ্গীরা এখানকার সৌন্দর্যে মুগ্ধ। তবে এখানে অনেক বেশি ফটোগ্রাফার ও হকারের যন্ত্রণা রয়েছে। তা ছাড়া ছোট শিশুরা ভিক্ষার জন্য হাত পাতে। এটিও যন্ত্রণাদায়ক।
নেপালের কাঠমান্ডু থেকে আসা আরেক পর্যটক ধীরাজ ঘোরাং বলেন, তিনি ১২ অক্টোবর ঢাকায় এসেছেন। গত বুধবার এসেছেন কক্সবাজার। আজ শুক্রবার আবার ঢাকায় ফিরে যাবেন।
তিনি বলেন, ‘আজ (গতকাল) মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে টেকনাফ পর্যন্ত গিয়েছি। অপরূপ, মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখেছি। মন বলছে, এই শহরে থেকে যাই।’ কিন্তু এই শহরে সবকিছুর দাম আকাশচুম্বী বলে মনে হয়েছে ধীরাজের। তিনি বলেন, ঢাকা থেকে ফ্লাইটে আসতে যত টাকা খরচ হয়েছে, দূরত্ব অনুযায়ী তা বেশি বলেই মনে হয়েছে।
