মুখ ঢাকে ধুলার ঢাকায়

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩, ১২:২৫ এএম

নগরজীবনে যেমন আনন্দ রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিড়ম্বনা। জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত রাজধানীবাসীর প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতার। একদিকে বেঁচে থাকার তাড়না, অন্যদিকে আপনজনকে সুস্থ রাখার প্রাণান্ত  প্রচেষ্টা। তবু যেন কখনো থমকে দাঁড়াতে হয়। আবার অবস্থা এমন, পরিবেশের কারণে হুমকির মুখোমুখি পড়ে নিজের জীবন। অস্থির রাজনীতিতে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ এখন জড়িয়ে যাচ্ছে ধুলাদূষণে। পরিবেশদূষণ, খাদ্যদূষণে মানুষ যেন পরিণত হচ্ছে অদ্ভুত এক জড় পদার্থে।

এমনিতেই বছর জুড়ে বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধিতে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। এর ফলে আয়ের বড় একটা অংশ চলে যাচ্ছে চিকিৎসার পেছনে। তার ওপর এই শীত মৌসুমে ধুলায় বিপর্যস্ত হচ্ছেন মানুষ। ফলস্বরূপ শরীর আক্রান্ত হচ্ছে নানান ব্যাধিতে। শীতে ধুলাদূষণের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ফলে সর্দি, কাশি, ফুসফুস ক্যানসার, ব্রঙ্কাাইটিস, শ্বাসজনিত কষ্ট, হাঁপানি, যক্ষ্মা, অ্যালার্জি, চোখজ্বালা, মাথাব্যথা, বমি ভাব, চর্মরোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ। এর মধ্যে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় ধুলাদূষণের ফলে তারাই বেশি রোগাক্রান্ত হচ্ছে। বিষয়টি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। শীত মৌসুমে হাজার হাজার ইটভাটার পাশাপাশি মহানগরীতে পরিকল্পনাহীনভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, ড্রেনেজ, ফ্লাইওভার, রাস্তাঘাট উন্নয়নের কারণে রাস্তাঘাটে খোঁড়াখুঁড়ির পরিমাণ বাড়ে। ফলে যে ধুুলার সৃষ্টি হয়, তাতে শুধু মানুষ নয় জলজ প্রাণীসহ সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এই দূষণ থেকে পরিত্রাণ পেতে, সাধারণ মানুষের মধ্যে যতটুকু সচেতনতা রয়েছে, তা কি শেষ পর্যন্ত নিজকে রক্ষা করতে যথেষ্ট? এ বিষয়ে রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘শীতের ধুলায় কষ্ট বাড়ছে’ প্রতিবেদনে যা উল্লেখ করা হয়েছে, তা যেন আমাদের নিত্যদিনের যন্ত্রণারই কথা। প্রতিবেদন জানাচ্ছে ঢাকায় ধুলা সৃষ্টির অন্যতম কারণ চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের খোঁড়াখুঁড়ি। যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আবর্জনা। গাছ ও লতাগুল্মের গোড়ার মাটি, অতিরিক্ত গাড়ি ও মানুষ, গাছের পাতা শুকিয়েও ধুলার সৃষ্টি হয়। চলাচলের সময় ধুলায় একাকার হয়ে যাচ্ছে মানুষ। ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া যারা চলাচল করেন নগরীতে, তারা খুবই অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়েন। প্রতিবেদনে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাছের খান গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে। এতে কর্মসংস্থান বাড়ছে, জিডিপি বাড়ছে। তবে পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিবেচনা না করে উন্নয়ন করায় অসুস্থতাও বাড়ছে। সারা জীবন যা উপার্জন করছেন, অসুস্থ হয়ে পড়লে সেই জমানো টাকা চলে যাচ্ছে চিকিৎসায়। তাহলে এসব উন্নয়ন দিয়ে কী হবে? আবার নগর পরিকল্পনাবিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ঢাকায় অতিরিক্ত গাড়ি, অতিরিক্ত মানুষ ও নিয়মকানুন না মেনে উন্নয়নকাজ করায় ধুলাদূষণ বাড়ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার অবহেলার কারণে ধুলাদূষণের মাত্রা বাড়ছে। তবে সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় ধুলাদূষণ কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব। অবশ্য খুব বেশি কমবে বলে মনে হয় না।

ঢাকার ভবন নির্মাণ ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে নিয়ম মেনে কাজ করলে ধুলাদূষণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে কর্র্তৃপক্ষকে তৎপর হতে হবে। একইসঙ্গে বিভিন্ন যানবাহনকেও এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। চলাচলের সময় তারা যেন, অযথাই ধুলা উড়িয়ে দ্রুতগতিতে চলাচল না করে। এ থেকে উদ্ধার পেতে সিটি করপোরেশন, বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ এবং সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। আর যাই হোক, তিলোত্তমা ঢাকার পরিচিতি যেন কোনোভাবেই ‘ধুলারাজ্য’ হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত না হয়। মনে রাখতে হবে, দেশ ছাড়িয়ে এই সুখ্যাতি (!) বিদেশের মাটিতে যেতেও সময় নেবে না। এমনিতেই দূষণের শহর ঢাকা, এর বাইরে আবার ধুলার শহর! সময় থাকতেই উদ্যোগী হওয়া ভালো। না হলে, যা হওয়ার তাই-ই হবে। সাধারণ মানুষ শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবে। তারা সত্যিই বড় অসহায়। তাদের পাশে কি, প্রকৃত অর্থেই কেউ নেই!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত