নির্বাচনে নীরব ঘাতক শব্দদূষণ

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ১২:৫০ এএম

শুধু ঢাকা না, শব্দদূষণ যেন পুরো দেশেই এক ‘নীরব ঘাতকে’ পরিণত হয়েছে। এর বিরুদ্ধে আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই। বাংলাদেশে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় স্পষ্ট বলা আছে কোন এলাকায়, দিনের কোন সময়, কী ধরনের শব্দদূষণ করা দণ্ডনীয় অপরাধ? কিন্তু দেশের মানুষকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে এর বিরুদ্ধে কি সচেতন করা হয়েছে? কোনো মানুষ আইন মেনে চলছেন?

চলছে নির্বাচনী মৌসুম। নতুন বছরের ৭ জানুয়ারি নির্বাচন। এই ১৫ দিনে দেশ জুড়ে কী পরিমাণ মাইক বাজবে, তাও আবার উচ্চৈঃস্বরে একবারও কি তা ভেবে দেখেছি? কখনো চিন্তা করেছি, পাশের মানুষের কথা? তারা কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন? শুধু ঢাকা শহর নয়, দেশের প্রত্যেকটি জেলা-উপজেলা এমনকি গ্রামপর্যায়েও এখন মাইক-মিছিল-মিটিংয়ের অবাধ উৎসব। এসবে কোনো বাধা নেই। কিন্তু এরও একটা সীমা থাকা দরকার। নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে আমার ভেতর, আমি কী পরিমাণ শব্দ সৃষ্টি করে চলাচল করব? সেই ‘আমি’ যখন ‘গোষ্ঠী’তে পরিণত হয়ে যাই, তখন মনে হয় সবাই যেন ‘বধির’। নিজেও শুনি না, মনে করি অন্যেও শোনে না।   

শব্দদূষণ বিষয়ে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ২০২২ : নয়েজ, ব্লেজেস অ্যান্ড মিসম্যাচেস’ শীর্ষক প্রতিবেদন জানাচ্ছে  কীভাবে এটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা প্রভাবিত করছে। যানবাহনের হর্ন, উড়োজাহাজ, ট্রেন, শিল্পকারখানা ও বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট শব্দের পাশাপাশি এখন যোগ হয়েছে ‘নির্বাচনী শব্দ’। অন্যান্য শব্দের কথা বাদই দিলাম। যেন এক ঘোরের মধ্যে আমাদের বসবাস। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে দূষণ। বর্তমানে সুস্থ মতো বেঁচে থাকাটাই ভীষণ কষ্টকর। যেহেতু সমাজের সব বিষয় আমাকে প্রভাবিত করে, সেহেতু আমি যেন এখন আর আমার নেই। নিয়ন্ত্রণ করে ফর্মালিন দেওয়া মাছ-মাংস, কার্বাইড দেওয়া শাকসবজি আর ব্রয়লার মুরগির অ্যান্টিবায়োটিক। এসবই আমরা গোগ্রাসে খাচ্ছি। অনেকটা নিরুপায় হয়েই। এই খাদ্যদূষণের সঙ্গে বাড়তি পাওনা ‘শব্দদূষণ’।

বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীনে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা রয়েছে। তাতে কী? বিধিমালা-নীতিমালা থাকবে, সেটা সরকারের কাজ। আর আমরা করব আমাদের কাজ। নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম চালানোর ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সচিবালয়েরও একটি বিধিমালা রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮-এ বলা হয়েছে ‘কোন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিংবা উহার মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা তাহাদের পক্ষে অন্য কোন ব্যক্তি কোন নির্বাচনী এলাকায় মাইক বা শব্দের মাত্রা বর্ধনকারী অন্যবিধ যন্ত্রের ব্যবহার দুপুর ২ (দুই) ঘটিকা হইতে রাত ৮ (আট) ঘটিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখিবেন।’ এই সামান্য নিয়মও কেউ মানছেন না। মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে ইতিমধ্যে দেশের প্রায় ১২% মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক জরিপে উঠে এসেছে।

কেউ কেউ বলেন শব্দদূষণ হয় এমন জায়গা এড়িয়ে চলতে হবে। নয়েজ লিমিট ৮৫ ডেসিবেল মেনে চলতে হবে। প্রয়োজনে ব্যবহার করতে হবে ইয়ার প্লাগ। তার সঙ্গে বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে। কারণ গাছ শব্দ শোষণ করে। একই সঙ্গে আমরা যদি বিবেকসম্পন্ন সক্রিয় নাগরিকের ভূমিকা পালন করি, তাহলে এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু তা হওয়ার নয়। যে কারণে দূষণের মাত্রা আরও বাড়বে।

দেশের সিংহভাগ মানুষকে একটি ঘোরলাগা জীবনযাপনে অভ্যস্ত করা হচ্ছে। আমরা যেন রোবটের মতো বেঁচে আছি। নিয়ন্ত্রণহীন এই সমাজ ব্যবস্থার মধ্যেই আমাদের টিকে থাকা। সেই ‘সারভাইবল অব দ্য ফিটেস্ট’। পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়ানো ছাড়া কোনো পথ আপাতত নেই। এ রকম অনেকটা বোধহীন সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে, শব্দদূষণ আইনের কথাগুলো মনে হয় ঠকঠকানি। এর শুধু বর্ণময় আকার রয়েছে। শব্দে শব্দে শুধু ঘর্ষণ হয়। এ এক অদ্ভুত সময়। তবু একটা কথা মনে হয় বধির শ্রেণির মানুষকে শ্রবণশক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো তাগিদ কি কারও নেই? নাকি যার যেমন খুশি তেমন করেই চলবে একটি সমাজ? চিন্তা, বোধ, সততা এবং দায়িত্ব সম্পর্কে আমাদের সচেতন করব কি আমরাই? নাকি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ ব্যাপারে অসহায়ের সহায় হবে? এই মুহূর্তে মনে পড়ছে স্বামী বিবেকানন্দের একটি কথা। তিনি বলেছেন ‘একজন সুস্থ মানুষ তখনই শোনে, যখন তার শোনার ইচ্ছা রয়েছে। যখন দুর্মর আকর্ষণ রয়েছে কোনো বিষয়ের প্রতি। সে জন্য তাকে গড়ে তুলতে হয়। যিনি গড়ে তুলবেন, তাকে হতে হয় বিবেকসম্পন্ন।’ এরপর তিনি বলেছেন, কীভাবে একজন মানুষের বিবেক জাগ্রত হয়। সেই জেগে ওঠার মধ্যে অপরের প্রতি ভালোবাসা, কোন প্রক্রিয়ায় তাকে সজীব করে তোলে। শেষে বলেছেন ‘দায়িত্ববোধ এবং মানবপ্রেমই একজন মানুষকে জ্ঞানচক্ষু দান করে। এর জন্য চাই বিবেকসম্পন্ন মানবপ্রেম শিক্ষা।’

যে দেশের সমাজব্যবস্থার মধ্যে হাজারো অনিয়ম আর দুর্নীতির প্রতিযোগিতা, সেখানে ‘সুনীতি’ কখনোই প্রতিষ্ঠা পায় না। মানবপ্রেম শিক্ষা দূরের কথা। এই অনিয়ন্ত্রিত সমাজব্যবস্থার মধ্যেই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। যদি কেউ তা না চান, সেটা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। সুতরাং, দূষণ থাকবে। সেটা খাদ্য বা পরিবেশ যাই হোক না কেন।

লেখক : সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত