১৯৮২ সালে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে আক্রমণ চালায় ইসরায়েল। ওই সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিনকে বোমাবর্ষণ বন্ধ করার আহ্বান জানান। তাকে উদ্দেশ্য করে রিগ্যান বলেছিলেন, ‘এখন আমাদের এখানে রাত; রাত শেষ হওয়ার পর আমাদের দেশের জনগণ এই যুদ্ধের চিত্র দেখবে এবং এটি হলোকাস্ট (ইউরোপে ইহুদি নিধনের ঘটনা ‘হলোকাস্ট’ হিসেবে পরিচিত)।’
আজকের দিনে যিনি হোয়াইট হাউজে বসে রয়েছেন (মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন) তার মতো কোনো ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা নন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে ওই আহ্বান জানিয়েছিলেন রিপাবলিকান পার্টির নেতা রোনাল্ড রিগ্যান। ওই সময় রিগ্যানের প্রশাসন ইসরায়েলের কাছে ক্লাস্টার বোমা ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছিল।
লেবাননের সাবরা এবং শাতিলা শরণার্থী শিবিরে পরিচালিত চার মাসের সামরিক অভিযানে ১৮ হাজারেরও বেশি লেবানিজ ও ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান। ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থার (পিএলও) পরিসংখ্যানে প্রায় ৫০ হাজার হতাহত হওয়ার তথ্য তুলে ধলা হয়। গত ৭ অক্টোবরের পর দুই মাসের মতো সময়ে ইসরায়েল গাজায় হত্যা করেছে ২০ হাজারেরও বেশি যার ৭০ শতাংশই নারী ও শিশু। গত ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত হিসাবে গাজার ৬৮ শতাংশ ভবন ধ্বংস করে দিয়েছে যা এখন আরও বেড়েছে।
ফিলিস্তিনিদের হত্যায় ইসরায়েলিদের মনোভাব কেমন তা বোঝা যায় তাদের কথা শুনলে। আবার ফিলিস্তিনিদের মাটিতে অবৈধ বসতি স্থাপন আন্দোলনের পক্ষের একটি সংগঠনের প্রধান দানিয়েলা ওয়েইস বলেন, গাজা এমনভাবে নিঃশেষ করা উচিত যেন বসতি স্থাপনকারীরা সাগর দেখতে পারে। ১৯৮২ সালে লেবাননেন গণহত্যা টিভিতে সরাসরি প্রচারিত হয়নি। তবে এখন সময় বদলেছে, মানুষ নৃশংসতার চিত্র দেখতে পাচ্ছে। এ অবস্থায় লাখ লাখ আরব খালি চোখে শুধু এই বর্বরতা দেখেই যাবে, এমন হবে না। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল গণহারে ফিলিস্তিনিদের অভুক্ত রাখাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
ইসরায়েল যে গাজাবাসীকে অভুক্ত রাখার নীতি রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করেছে তা দেশটির পরিবহনমন্ত্রী মিরি রেজেভের কথায়ই পরিষ্কার। তিনি মন্ত্রিসভার বৈঠকে জিজ্ঞাসা করেন, গাজাবাসীকে ক্ষুধার্ত রাখা হামাস নেতৃত্বকে প্রভাবিত করতে পারে কি-না। অবশ্য মন্ত্রিসভায় তার সতীর্থরা বিষয়টিকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হতে পারে বলে মনে করিয়ে দেন।
সামগ্রিকভাবে ইসরায়েল প্রশাসনের এসব আচরণ ও কর্মকা- প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারই শুধু নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য শঙ্কা তৈরি করবে। গাজা উপত্যকাকে ধ্বংস করা আগামী ৫০ বছরের জন্য যুদ্ধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার মতো। গাজার ফিলিস্তিনি, আরব সম্প্রদায় এবং মুসলিমরা এই বর্বরতা ভুলবে না যেখানে পুরো গাজাই এখন শরণার্থী শিবিরে পরিণত হয়েছে।
ইসরায়েলের নৌবাহিনীর সাবেক কমান্ডার ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা অ্যামি আয়ালন বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন। প্রথাগত প্রক্রিয়ায় যেভাবে ইসরায়েল অভিযান চালাচ্ছে তার মৌলিক দুর্বলতা শনাক্ত করেন। মার্কিন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক অ্যারন ডেভিড মিলারকে তিনি বলেন, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী কঠোর শক্তির (হার্ড পাওয়ার) প্রিজমে নিজেদের জয় দেখছে। আর হামাস মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার নরম ক্ষমতার (সফট পাওয়ার) প্রিজমে ফিলিস্তিনিদের মন জয় করছে। ইসরায়েল যত মানুষ মারবে, ততই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনবে এবং তারা (হামাস) ততই জয়ী হবে। ফ্রান্স ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত আলজেরিয়ায় ৫ লাখ থেকে ১৫ লাখ মানুষ হত্যা করে যা ওই সময় দেশটির মোট জনসংখ্যার ৫-১৫ শতাংশ ছিল। তারা ভেবেছিল, যত বেশি আলজেরীয়কে মারা যাবে, ততই জয়লাভ সহজ হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি এবং ফলে আলজেরিয়া স্বাধীন হয়। এবার ফ্রান্সের মতো কাজ করছে ইসরায়েল। পশ্চিম তীর, জর্ডান কিংবা সৌদি আরবে পর্যন্ত হামাস যেভাবে শক্তিবৃদ্ধি করছে, এই প্রেক্ষাপটের বাইরে তার অন্য কোনো ব্যাখ্যা নেই।
পিএলও নেতা খলিল শিকাকি হামাসের গুণগ্রাহী নন। একটি জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, গত ৭ অক্টেবার হামাস যা করেছে তা সমর্থন করেন জরিপে অংশ নেওয়া ৭২ শতাংশ মানুষ এবং পশ্চিম তীরের ৮২ শতাংশ মানুষ একে সমর্থন করেন। অন্যদিকে ফাতাহ নেতা মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের (পিএ) জনপ্রিয়তায় ধস দেখা গেছে যেখানে ৬০ শতাংশই পিএ প্রশাসনের অস্তিত্ব দেখতে চায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হামাসের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। আরব বিশ্ব এবং মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ‘ফিলিস্তিনিদের রক্ষাকর্তা’ হিসেবে অবস্থান শক্ত করেছে হামাস। ইসরায়েলে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন দূত ডেভিড এমন ফ্রিডম্যান এবং সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জ্যারেড কুশনার ফিলিস্তিন ইস্যুটিকে আলোচনার বাইরে নিয়ে ‘ভেটো’ প্রদানকেই অপ্রাসঙ্গিক করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু না! তা আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ফিরে এসেছে। বরং এখন রাজনৈতিক ও বিচারিকভাবে টিকে থাকতে নেতানিয়াহুর সামনে যুদ্ধ ছাড়া বিকল্প নেই। ইসরায়েলের কট্টর ইহুদিবাদী মন্ত্রী ইতামার বেন-গ্যভিরসহ অন্যরা জানে, শেষ পর্যন্ত বাইডেন প্রশাসনের চাপে যুদ্ধ বন্ধ করতে হলে পশ্চিম তীরে ইহুদি ও ফিলিস্তিনি জনবিন্যাস আমূল পরিবর্তনের যে স্বপ্ন তারা দেখেছিলেন তা একেবারে হারিয়ে যাবে।
হিব্রু ভাষায় একটি কথা রয়েছে ‘মিতুত হামাস’ যার অর্থ হচ্ছে ‘হামাসের ধ্বংস’। কিন্তু দুই মাসব্যাপী ইসরায়েলি সরকার যেভাবে ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে, তাতে হিব্রু ভাষায় সেই কথাকে বলতে এখন বলতে হবে এভাবে- ‘মিতুত ইসরায়েল’। কারণ যুদ্ধ শেষে সেইটাই হতে যাচ্ছে ফলাফল।
