ইউক্রেন হবে ন্যাটোর ‘সমাধিক্ষেত্র’

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:২৪ এএম

ইউক্রেনে রুশ সামরিক অভিযান আর দুই মাস পরই দুই বছর পূর্ণ করবে। বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় ১৮ শতাংশ ভূখন্ডে রুশ সেনারা শক্ত অবস্থান তৈরি করে রয়েছে। ইউক্রেনের চারটি অঞ্চলকে অধিভুক্ত করেছে মস্কো। ইউক্রেন পাল্টা অভিযানে বছর জুড়ে অঞ্চল পুনরুদ্ধারের স্বপ্নে বিভোর ছিল। কিন্তু বছরের শেষে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় দুই বৈশ্বিক সমর্থকের কাছ থেকে সহায়তার প্রবাহ ধাক্কা খেয়েছে। চলতি যুদ্ধে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (ন্যাটো) ইউক্রেনের পাশে থাকলেও রুশ সেনাদের বিরুদ্ধে যৎসামাণ্য অগ্রগতিও তৈরি করা যায়নি।

এ অবস্থায় ন্যাটো জোট কৌশলগতভাবে এবং রাশিয়ার মতো পরাশক্তিকে ঘায়েল করতে এমন গর্তে পড়েছে যে, সেখান থেকে উঠে দাঁড়ানো মুশকিল। কারণ ইইউ জোট অভ্যন্তরীণ মতবিরোধে ইউক্রেনের সহায়তা ছাড় করতে পারছে না। আবার যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকানরা উদারহস্তে ইউক্রেনকে সহায়তা দিতেও অনিচ্ছুক। সুতরাং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এমন বললে অত্যুক্তি হয় না, ইউক্রেনেই ন্যাটোর সমাধি রচিত হতে পারে। কারণ এরই মধ্যে পশ্চিমা বিশ্ব এবং তার জোটের ব্যর্থতার গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ এখন স্থবির। গত কয়েক মাস ধরে এতে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাশিয়া সোলেদার দখল করে এবং মে মাসে বাখমুতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, যা ছিল মস্কোর জন্য বড় অর্জন। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও রাশিয়া দৃঢ় মনোবল এই দুই অঞ্চলে তাদের দখল প্রতিষ্ঠার মূলে কাজ করেছে। কিন্তু গত জুন মাসে ইউক্রেনের বহুল আলোচিত পাল্টা আক্রমণ এখন পর্যন্ত কোনো অর্জন দেখাতে পারেনি। ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে সেনার সংকটে পড়েছে। পশ্চিমাদের দিক থেকে আসা সহায়তাও স্থবির হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির আইনপ্রণেতারা ইউক্রেনের অভ্যন্তরে দুর্নীতির অভিযোগে সরব হচ্ছেন। তারা আগামী বছর নির্বাচনের মুখোমুখি হতে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রশাসনকে চাপ দিয়ে যাচ্ছে। মোটকথা, ইউক্রেনের উদ্দেশে পশ্চিমাদের প্রতিশ্রুত বার্তা ‘যতদিন প্রয়োজন ততদিন সহায়তা দেওয়া হবে’ থমকে গেছে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার জয়লাভের অর্থ হচ্ছে ইইউয়ের একদম দরজায় কড়া নাড়ল রাশিয়া। এর ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর বিকল্প নেই। আবার রাশিয়ার জয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বে ইরান, চীন ও উত্তর কোরিয়ার মতো শক্তিগুলোর প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করে দেবে। পশ্চিমা অক্ষের বিপরীতে রাশিয়াসহ এসব দেশের সমন্বয়ে গঠিত অক্ষের আবির্ভাব সংঘাতের আবহে পরিপূর্ণ এক বিশ্বের সম্মুখে দাঁড় করাবে বিশ্ববাসীকে।

এ অবস্থায় মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট অব দ্য স্টাডি অব ওয়ার’-এর একটি নিবন্ধে বলা হয়, ‘রাশিয়ার জয় গোটা বিশ্বে আমেরিকার প্রতিরোধমূলক অবস্থানকে ধ্বংস করে দেবে। রুশদের জয় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভূমিকা নিতে অন্যদের উৎসাহিত করবে। এর মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় প্রত্যাঘাত পেতে পারে।’ নিবন্ধটিতে আরও বলা হয়েছে, ইউক্রেনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে রাশিয়া আরও বড় খেলায় অগ্রসর হবে, যা ন্যাটো জোটকে ধ্বংস করে দেওয়ার লক্ষ্য দিয়ে আবির্ভূত হবে।

পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা তথা অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রাশিয়াকে একঘরে করে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় একাট্টা যুক্তরাষ্ট্র। ন্যাটো জোটের মাধ্যমে ইস্পাতকঠিন মনোবল দেখানো পশ্চিমা বিশ্বে সহায়তায় ইউক্রেন মস্কোর শাসকদের রুখে দেবে, এমন স্বপ্ন অনেকটাই ধূসর। ইউক্রেনকে হারিয়ে দিয়ে রাশিয়া জয়লাভ করার মধ্য দিয়ে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস ক্ষুন্ন হবে। ইউক্রেন থেকে এরই মধ্যে ৬৩ লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছেন। ভøাদিমির পুতিনের প্রশাসন আরও অঞ্চলে দখল প্রতিষ্ঠা করতে পারলে, শরণার্থীর এই সংখ্যা আরও বাড়বে। এ পরিস্থিতি পুরো ইউরোপে শরণার্থীর চাপ বাড়াবে যা আর্থিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত