২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় কোনো আসর ছিল না। তাই সারা বছর ক্লাব ফুটবল, বিশেষ করে ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলেই মেতে ছিলেন ফুটবলপ্রেমীরা। বছরটা স্বপ্নের মতো কাটিয়েছে ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটি। এক বছরে পাঁচটি শিরোপা ঘরে তুলেছে। এই বছরে ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের দল-বদলে ছিল বেশ চমক। তাছাড়া সৌদির ক্লাব ফুটবলের নতুন শুরুর বছরও এটি। লিওনেল মেসি মেজর লিগ সকারে যোগ দেন এই বছর।
প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, এফএ কাপ, উয়েফা সুপার কাপ এবং ক্লাব বিশ্বকাপ। সবই এই বছর জিতেছে সিটিজেনরা। প্রিমিয়ার লিগের মৌসুম শুরু হয় আগস্ট থেকে। তাই ২০২২-২৩ মৌসুমের অর্ধেকটা হয়েছে এই বছর। প্রিমিয়ার লিগে চার পয়েন্টে পিছিয়ে থেকে বছর শুরু করেছিল ম্যানসিটি। আর্সেনাল ছিল শীর্ষে। ৩২তম রাউন্ড শেষে এক পয়েন্টে পিছিয়ে ছিল সিটি। তবে ৩৩তম রাউন্ডে পাল্টে যায় পয়েন্ট টেবিল। দুই পয়েন্টের লিড নেয় পেপ গার্দিওলার দল। মৌসুম শেষে পাঁচ পয়েন্টে এগিয়ে থেকে শিরোপা জেতে ম্যানসিটি।
জুন মাসে হওয়া এফএ কাপ ফাইনালে ম্যানসিটি ২-১ গোলে ম্যানইউকে হারিয়ে শিরোপা জেতে। একই মাসে হওয়া চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে সিটিজেনরা মুখোমুখি হয়েছিল ইন্তার মিলানের। ১-০ গোলে জিতে প্রথমবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের সঙ্গে ট্রেবল পূর্ণ করে ম্যানসিটি। ট্রেবল পূর্ণ করা সিটির অবশ্য উয়েফা সুপার কাপে ভুগতে হয়। মৌসুমের ইউরোপা চ্যাম্পিয়ন সেভিয়ার সঙ্গে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচ ছিল ১-১ সমতায়। পরে টাইব্রেকারে ৫-৪ ব্যবধানে জেতে ম্যানসিটি। আর বছরের শেষে এসে ক্লাব বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে পাঁচ পূর্ণ করে পেপ গার্দিওলার দল।
লা লিগায় রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা বছরটা শেষ করেছিল ১৫ ম্যাচ শেষে সমান ৩৮ পয়েন্টে। তবে শেষ পর্যন্ত ২০২২-২৩ লা লিগার শিরোপা জেতে বার্সেলোনা। শেষ পর্যন্ত ১০ পয়েন্টের ব্যবধান ছিল শীর্ষে থাকা বার্সেলোনা ও দ্বিতীয় স্থানে থাকা রিয়ালের মধ্যে। লিগ শিরোপা হারালেও কোপা দেল রে জিতেছিল রিয়াল মাদ্রিদ।
ইতালিয়ান লিগ সিরি আ’তে ছিল চমক। ১৯৮৯-৯০ মৌসুমের পর আবারও পরম আরাধ্য ‘স্কুদেত্তা’ জয়ের উল্লাসে মাতোয়ারা হয় নেপলসবাসী। ৩৩ রাউন্ড শেষে অর্থাৎ পাঁচ ম্যাচ হাতে রেখেই শিরোপা জেতে নাপোলি।
জার্মান বুন্দেসলিগা জয়ের ধারা অব্যাহত রাখে বায়ার্ন মিউনিখ। তবে ২০২২-২৩ মৌসুমে তাদের পরীক্ষায় ফেলে বরুসিয়া ডর্টমুন্ড। লিগে মৌসুমের শেষ দিনে অর্থাৎ ২৭ মে ডর্টমুন্ড নিজেদের ম্যাচটি জিতলেই লিগ শিরোপা ঘরে তুলত। কিন্তু ডর্টমুন্ডের ম্যাচ ড্র হয়। আর বায়ার্ন শেষ ম্যাচটি জেতে। তাতে দুদলের পয়েন্ট সমান ৭১ হলেও গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে শিরোপা জেতে বায়ার্ন।
ফ্রেঞ্চ লিগে প্রত্যাশিতভাবেই শিরোপা জেতে পিএসজি। কিলিয়ান এমবাপ্পে, নেইমার ও মেসির একসঙ্গে জেতা শেষ শিরোপাও এটি। কারণ মৌসুম শেষে ক্লাব ছাড়েন মেসি, নেইমার দুজনই।
মূলত গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর জানা যায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো যোগ দিচ্ছেন সৌদির ক্লাব আল নাসরে। ১ জানুয়ারি অর্থাৎ ২০২৩ এর প্রথম দিন থেকেই রোনালদো নাসরের খেলোয়াড় হয়ে যান। ২০২৩ সালে ক্রিশিয়ানো রোনালদো গোল করেছেন ৫১টি (গতকাল পর্যন্ত)। জানুয়ারি মাসে হয় শীতকালীন দল-বদল। রোনালদো ছাড়া শীতকালীন দল-বদলে ঝড় তোলেন বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন এনজো ফার্নান্দেজ। প্রায় ১০৭ মিলিয়ন পাউন্ডে বেনফিকা থেকে চেলসিতে যোগ দেন তিনি।
এরপর বছরের মাঝে জুলাই-আগস্টে গ্রীষ্মকালীন দল-বদলে পিএসজি ছাড়েন মেসি। কিছুদিন পর নেইমারও ছাড়েন ক্লাব। মেসি কোথায় পাড়ি দেবেন তা নিয়ে ছিল জল্পনা-কল্পনা। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে পাড়ি দেন তিনি। যোগ দেন ইন্টার মায়ামিতে। মায়ামি দলে টানে বুসকেটস, আলবা এবং সবশেষ লুইস সুয়ারেজকে। অনেকের মতেই বার্সেলোনা ২.০ হতে যাচ্ছে মায়ামি।
নেইমার পাড়ি দেন সৌদি ক্লাব আল হিলালে। এছাড়া করিম বেনজেমা আল ইত্তিহাদে, সাদিও মানে যোগ দেন আল নাসরে। আরও বহু খেলোয়াড় যারা আগে ইউরোপের লিগে খেলতেন যোগ দেন সৌদির লিগে। ফলে বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে বিশ্বব্যাপী ফুটবলপ্রেমীদের নজরে নতুন করে আসে সৌদি ও যুক্তরাষ্ট্রের লিগ ফুটবল।
৩৬ বছর পর তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জেতা আর্জেন্টিনাকে নিয়ে এ বছর জুড়েও আগ্রহটা বেশি ছিল বিশ্বজুড়ে ভক্ত-সমর্থকদের। ২০২২-এ আর্জেন্টিনা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলেও র্যাংকিংয়ে তারা এক নম্বরে ছিল না। এই বছরের এপ্রিলে ফিফা প্রকাশিত র্যাংকিংয়ে শীর্ষে ওঠে আলবিসেলেস্তেরা। বছরটা মেসিরা শেষ করছেন এক নম্বরে থেকেই। আর্জেন্টিনা দেশের বাইরে প্রীতি ম্যাচ খেলতে গেলে সেই ম্যাচের টিকিটের চাহিদা ছিল তুঙ্গে। ২০২৩-এ আর্জেন্টিনা মোট ১০টি ম্যাচ খেলেছে। ৯টিতে জিতেছে তারা, হেরেছে একটি।
জাতীয় দলে এই বছরও সফল ছিলেন মেসি। ইন্টার মায়ামিতে যোগ দিয়েও হন সফল। ক্লাবটিকে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম শিরোপা (লিগস কাপ) এনে দেন। এছাড়া মায়ামি উঠেছিল আরও একটি টুর্নামেন্টের ফাইনালে। ২০২২-এর পারফরম্যান্সের কারণে এই বছর অষ্টম ব্যালন ডি’অর জেতেন মেসি। গেল ফেব্রুয়ারিতে ফিফা দ্য বেস্টের পুরস্কারও ওঠে মেসির হাতেই। তবে ২০২৩টা ভালো কাটেনি মেসির বন্ধু নেইমারের। এ বছরও ইনজুরির কারণে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ছিলেন আল হিলালে যোগ দেওয়া নেইমার।
এই বছর বাংলাদেশে এসেছিলেন বিশ্বকাপজয়ী দুই ফুটবলার। একজন আর্জেন্টিনার গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, আরেকজন ব্রাজিল কিংবদন্তি রোনালদিনহো।
বছর জুড়ে যে সব ফুটবল ম্যাচ সুষ্ঠুভাবে হয়েছে তা কিন্তু নয়। নানা কারণে স্থগিতও হয়েছে। ইসরায়েলের সঙ্গে হামাসের যুদ্ধের কারণে ফুটবল ম্যাচ স্থগিত হয়েছে। স্প্যানিশ লিগ লা লিগায় গ্রানাদা ও আথলেতিক বিলবাওয়ের ম্যাচ চলাকালে গ্যালারিতে এক দর্শকের মৃত্যু হওয়ায় ম্যাচ স্থগিত হয়। ইউরো বাছাইয়ের বেলজিয়াম-সুইডেন ফুটবল ম্যাচের সময় স্টেডিয়ামের বাইরে বন্দুক হামলায় মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় খেলা। সুইডেনের জার্সি পরিহিত দুই সমর্থক নিহতও হন। সবশেষ এই ডিসেম্বরে চেক প্রজাতন্ত্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্দুকধারীর হামলায় ব্যাপক হতাহতের ঘটনায় নারীদের চ্যাম্পিয়নস লিগের একটি ম্যাচ স্থগিত করা হয়। বছরের শেষ দিকে তুর্কি লিগে রেফারিকে এক ক্লাব প্রেসিডেন্টের ঘুষি মারার ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
এ বছর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন ১৯৬৬-তে ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপ জেতা ববি চার্লটন। এছাড়া তুরস্কের ভূমিকম্পে ঘানার ফুটবলার ক্রিস্টিয়ান আতসু নিহত হন। আলবেনিয়াতে লিগ ম্যাচ চলাকালে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মৃত্যুবরণ করেন ফুটবলার দিওয়ামেনা।
আসছে ২০২৪ আন্তর্জাতিক ফুটবলের বছর বলতে হবে। কারণ ২০২৪-এ আছে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ ও কোপা আমেরিকা টুর্নামেন্ট। এছাড়া বছর জুড়ে ক্লাব ফুটবল তো থাকছেই।
