নিয়মিত শরীরচর্চা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শরীরচর্চা বা ব্যায়াম ডায়াবেটিস রোগীদের যাপিত জীবনের প্রধান অভ্যাস। শরীরচর্চার মাঝে সবচেয়ে উত্তম ও ফলপ্রসূ হলো নিয়মিত হাঁটা। টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন থাকে অকার্যকর বা ভোঁতা। হাঁটার ফলে ইনসুলিন শানিত হয়। পেশি কোষে গ্লুকোজ প্রবেশ করার জন্য প্রয়োজন পড়ে শানিত ইনসুলিন। হাঁটার ফলে পেশি কোষে গ্লুকোজ প্রবেশ সহজ হয়। ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের দিকে নেমে আসে। হাঁটার ফলে ওজোন নিয়ন্ত্রিত থাকে, যা প্রকারান্তরে রক্তের চিনির মাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। হাঁটার ফলে রক্তের চর্বির মাত্রা বাগে রাখা সম্ভব হয় ফলে ডায়াবেটিসের জটিলতা হ্রাস পায়। হাঁটার ফলে ঘুম ভালো হয়, যা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য খুব জরুরি।
কখন হাঁটবেন : সকাল-বিকেল-রাত্রি যে কোনো সময় হাঁটা যায়। তবে হাঁটার জন্য একটা নির্ধারিত সময় থাকা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুবই জরুরি। সকালে হাঁটুন। টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের সকালে হাঁটা উত্তম। সময় না পেলে তিন বেলা খাবারের এক ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা পর পনেরো-বিশ মিনিট করে হাঁটুন। খাবার খাওয়ার এক দেড় ঘণ্টা পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ধাই ধাই করে বেড়ে যায়। ডায়াবেটিস রোগীরা এ সময় হাঁটতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, হাঁটার এমন অভ্যাস গ্লুকোজের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য দারুণ কার্যকর। এমনটি না পারলে বিকেলে হাঁটুন।
কতক্ষণ হাঁটবেন : সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন আধা ঘণ্টা করে হাঁটতে হবে। এই হাঁটা একেবারে ঘাম ঝরানো হাঁটা। যারা স্থূলতায় আক্রান্ত তাদের জন্য হাঁটতে হবে আরও বেশি। সপ্তাহে অন্তত পাঁচ ঘণ্টা জোর কদমে। হাঁটার প্রথম দিকে ৩-৫ মিনিট আস্তে ধীরে হাঁটুন। শরীরকে গরম করুন। এরপর ২০-২৫ মিনিট দ্রুত কদমে হাঁটুন। শেষ ১-৩ মিনিট শিথিল করুন হাঁটা।
হাঁটার প্রস্তুতি : হাঁটার জন্য এক জোড়া কেডস কিংবা জুতা নির্বাচন করুন, যা পায়ের সঙ্গে এঁটে থাকে। জুতার সঙ্গে অবশ্যই পরিষ্কার নরম মোজা পরুন। ডায়াবেটিস পরখ করে নিন হাঁটার আগে। গ্লুকোজের মাত্রা ৫.৩-এর নিচে থাকলে হাঁটতে গেলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে চিনির মাত্রা কমে যেতে পারে, যা মারাত্মক হতে পারে। এমতাবস্থায় কিছু পরিমাণ শর্করা খাবার খেয়ে হাঁটতে বেরুন। চিনির মাত্রা ১৬.৭-এর ওপরে থাকলে হাঁটার ক্ষেত্রে সাবধান। কেননা এটি কিটো এসিডোসিস করতে পারে। তাই হাঁটার আগে চিনির মাত্রা জেনে নিন।
কমপক্ষে বড় এক গ্লাস পানি পান করুন হাঁটার আগে। বেশি সময় হাঁটার পরিকল্পনা থাকলে সঙ্গে পানির বোতল রাখুন। প্রতি ২০ মিনিট হাঁটার জন্য এক কাপ পানি পান করুন। পানিশূন্যতা যাতে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন।
হাঁটার সময় লক্ষণীয় : ইনসুলিন নিয়ে হাঁটার সময় হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয় কিনা সেদিকে খেয়াল রাখুন। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যাওয়ার নাম হাইপোগ্লাইসেমিয়া। এটি হলে বেশ কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়। এমনটি হলে দ্রুত কার্যকরী শর্করা গ্রহণ করুন। হাঁটায় ক্ষান্তি দিন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মারাত্মক হাইপোগ্লাইমিয়ায় অজ্ঞান পর্যন্ত হতে পারে কেউ। সুতরাং নিজের শরীরের লক্ষণের প্রতি নজর দিন। দীর্ঘ পথ হাঁটতে চাইলে সঙ্গে রাখুন স্ন্যাকস, সহজপাচ্য শর্করা।
ঘরের মধ্যে হাঁটা : ঘরে কিংবা সারাদিন করপোরেট অফিসে বন্দিদশায় থেকেও হাঁটতে পারেন। হাঁটার মেশিনে হাঁটা আর বাইরে হাঁটার মাঝে ক্যালোরি খরচে কোনো পার্থক্য নেই। ঘর থেকে বেরুতে না পারলে ঘরেই হাঁটুন। বাড়ির ছাদে হাঁটার ব্যবস্থা থাকলে সেখানে হাঁটুন। মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় বসে না থেকে হাঁটুন। দেখবেন ক্যালোরি খরচ হচ্ছে। বাগে আসছে রক্তের চিনির মাত্রা। রক্তে চিনির মাত্রা স্বাভাবিকের নিয়ে আসতে শারীরিক কসরতের সহজসাধ্য কোনো বিকল্প নেই।
