বলতে না দেওয়া থেকে বিদ্রোহ হয়

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩, ১১:১৩ এএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার ও পারফরম্যান্স স্ট্যাডিজ বিভাগের অনারারি অধ্যাপক এবং নাট্য নির্দেশক ও পরিচালক সৈয়দ জামিল আহমেদ। বছরব্যাপী দেশের সাংস্কৃতিক চর্চা নানাভাবে আলোচনায় থাকে। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, শুধু নাটক নিয়ে কথা বলবেন, কারণ যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট তিনি খুলতে চান না। ফলে নাটক নিয়ে আলাপের সূত্রে আমরা দেশের সাংস্কৃতিক চর্চার তালাশ চালিয়েছি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর: আপনার নাটকে ‘কায়দা করে বেঁচে থাকার’ কথা উঠে এসেছে। এই বাস্তবতায় শিল্প, বিশেষ করে আপনার বা আপনাদের নাটক করতে কতটা কায়দা করা লেগেছে বা লাগছে?

সৈয়দ জামিল আহমেদ: আসলে ‘কায়দা করে বেঁচে থাকো’ কথাটা খুব সম্ভবত একটা কবিতার বইয়ের টাইটেলে দেখেছিলাম। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালেও চিকা মারা দেখেছি। সেখান থেকে পেয়েছি এটা। আর মনে হয়েছিল আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপটটা অর্থনৈতিকভাবে এবং রাজনৈতিকভাবে এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এটা খুব সংক্ষেপে কথা বলে যে, কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়। এখন কায়দা করে বেঁচে থাকাটা অর্থ আমার কাছে এরকম। আপনি যদি ব্রেখটের লাইফ অব গ্যালিলিও নাটকটা পড়েন, তাহলে দেখবেন গ্যালিলিওকে যখন একেবারে পোপ এবং ধর্মের যে শাসকগোষ্ঠী আছে তারা যখন নির্যাতনের ভয় দেখাল তখন সে সম্পূর্ণভাবে রিটার্ন করল। মানে সে এতদিন যা বলে এসেছিল যে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে এই তত্ত্বকে অস্বীকার করে বলল এটা আমি ভুল বলেছি। নিজের ভুল স্বীকার করে নিল। স্বীকার করে নেওয়ার পর তার ছাত্রসহ সবাই তাকে ছেড়ে চলে গেল এবং সে অনেক কষ্ট পেয়েছিল। 

তারপর দেখা গেল নাটকের শেষপ্রান্তে এসে তার ছাত্র যখন বিদেশে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। তখন সে খুব গোপনে তাকে একটা বই দেয়। যে বইটা সে লিখেছে এবং তার তত্ত্বের ফাইন্ডিংসগুলো সেগুলো সব একটা বই আকারে লিখে ডিসকোর্সি নামে তার ছাত্র আন্দ্রিয়াকে দেয়। ব্রেখটের এ কায়দাটাকে আমি খুব ভালো করে বুঝি। কারণ ব্রেখট যেভাবে কাজ করেছিলেন সেটা হচ্ছে একদিকে আপনার আমেরিকায় যখন তিনি ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। তাকে সিনেটের হেয়ারিংয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, মার্ক্সিস্ট ছিলেন বলে এবং উনি অনেক কায়দা করে ওখান থেকে পার হয়ে এসে ফেরত চলে এসেছিলেন বার্লিনে এবং সেখান থেকে আর আমেরিকা যাওয়ার কথা চিন্তা করেনি কখনো।

এই কায়দা মানে, আপনাকে হতে হবে একজন ধুরন্ধর রঙ্গকর্মী। আমার এক প্রবন্ধে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের একটা সেমিনার পেপারে, আমাদের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে পেপার উপস্থাপনে আমি বলেছিলাম যে, ধুরন্ধর রঙ্গকর্মী যে বহুরূপী। বহুরূপী হতে হয় তার মানে আপনাকে এখন কাজ করতে গেলে এমন এক রঙ্গকর্মী হতে হবে যে ধুরন্ধর এবং নৈতিকভাবে সৎ। ধুরন্ধর কিন্তু একই সঙ্গে বহুরূপী। এখন নৈতিকভাবে আপনি যদি সৎ হন তাহলে আপনি এই নিউ লিবারেল যুগে, এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে টিকতে পারবেন।

দেশ রূপান্তর: পারফরম্যান্স তো রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার এক উদ্যোগ। এটির মোকাবিলা করেন কীভাবে?

সৈয়দ জামিল আহমেদ: আমাদের মধ্যবিত্তের ভেতরে এখনো অনেক ভাবে চালু আছে বিষয়টা যে সদা সত্য কথা বলিবে। কিন্তু নিউ লিবারেল যুগে ২০২৩ সালে এটা কার্যকর না। সৎ আমি নিজের প্রতি সবসময়। আমার যেকোনো কাজের ব্যাপারে যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব। কিন্তু আমি মনে করি না যে, শহীদ হওয়ার দরকার আছে এই মুহূর্তে। যেমন র‌্যাব ধরে নিয়ে গেছে এবং তুলে নিয়ে গিয়ে একেবারে জেলখানায়, মেরে পর্যন্ত ফেলেছে। একজন কার্টুনিস্ট ছিলেন, কিশোর, তার তো কানটাই গেছে। আমি মনে করি যে, শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতে, পাকিস্তানেও, পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় আপনি যদি কাজ করতে চান আপনাকে কায়দা করতে হবে। কায়দার বিষয়টা এই যে, আপনাকে মনে রাখতে হবে আপনি গ্যালিলিওর মতো নৈতিকভাবে সৎ থেকে আপনার মূল যে উদ্দেশ্য, সেটা যেন পূরণ করতে পারেন এবং গ্যালিলিও করেছিল। গ্যালিলিও তার বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব অস্বীকার করে কিন্তু নিজে বই লিখে তার ছাত্রের হাতে তুলে দিয়েছিল। এখানেই ডায়ালেকটিস, দ্বান্দ্বিক অবস্থান। আমি মনে করি না যে, আপনাকে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে সদা সত্য কথা বলে আপনাকে জান দিতে হবে। তো ওই জায়গায় আমি মনে করি কায়দা করার অর্থ এই, যে একদিকে আমাকে নাটক করে যেতে হবে। এবং নাটক করে যেতে হবে এমন একটি জায়গা ধরে যে, আমি খুব বোকার মতো জেলখানায় নিজেকে নিয়ে যেতে দিতে চাই না।

দেশ রূপান্তর: আর্টিস্টের নৈতিক অবস্থানের কথা বললেন আপনি। ইতিহাসচর্চার একরৈখিক বাস্তবতায় এখানে আপনি কী কায়দাটা করবেন? বীরাঙ্গনা বলছিল অভিজ্ঞতা কী?

সৈয়দ জামিল আহমেদ: আমার যা কথা আমি সবসময় মঞ্চে বলেছি এবং সৎভাবে বলেছি এবং বলেছি যেখানে সেখানে আপনি দেখবেন যে, একেবারে যুক্তি দিয়ে যা যা তোলার সে কথাগুলো তুলে এসেছে। আপনি বীরাঙ্গনায় দেখবেন একদিকে টেক্সটে যেখানে শেখ মুজিবের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে, অন্যদিকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যিনি ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদের প্রতি বড় একটা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল এবং ওটা আমরা রেখেছি। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মনে করি ওটা আমার অবশ্যই সবসময় আছে। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী ইতিহাসে, বর্তমানে ইতিহাস নিয়ে অবশ্যই আমার প্রশ্ন আছে এবং সেই প্রশ্নটা তুলে ধরব সবসময়। সব থেকে বড় কথা হলো, এ যুদ্ধটা শুধু একটা দল করেনি। যুদ্ধে অনেকগুলো বামপন্থি দলও তো ছিল। অনেকের ইতিহাস, নাম এখন বলতেই চায় না। এটার তো কোনো দরকার নেই। আর মুক্তিযুদ্ধের কথা যখনই বলা হয়, তখনই বীরাঙ্গনাদের কথা বলা হয় একটা স্লোগান হিসেবে, একটা তকমা হিসেবে ‘৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু ও ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জত’।

তো, এই ইজ্জত লুট হওয়া মানেটা কী? আমরা এটাকে স্রেফ একটা সেøাগানে পরিণত করেছি। কিন্তু তাদের যে কষ্টের জায়গা এবং তারা যে বাংলাদেশের কথা চিন্তা করেছিলেন, যেভাবে চিন্তা করেছিলেন সেই জায়গাটা আনতে চেয়েছি। এখানটায় আমার মনে হয়, এ নাটকটার একটা বড় রাজনৈতিক ভূমিকা আছে। সেখানে মেহেরজানের পাকিস্তান চলে যাওয়ার বিষয়টা অনেকে মানতে পারেনি। কিন্তু টেক্সটটা তো আমার না, সেখানে নীলিমা ইব্রাহীম বীরাঙ্গনাদের বয়ান লিপিবদ্ধ করেছেন। মেহেরজান পাকিস্তান চলে যাওয়ার আগে তার যে প্রচন্ড কষ্ট হয় এবং সে কী কী কারণে চলে যাওয়ার সীদ্ধান্ত নেয়, সেই কথাটা কিন্তু কেউ বলে না। তারপর ময়নাকে পরিচয় আড়াল করে যে লুকিয়ে থাকতে ভয়াবহ কষ্ট হয়, সেটাও বলা হয় না। এটা আমাদের সামাজিক ব্যর্থতা। এটা রাষ্ট্র এবং দলের বাইরে, বাংলাদেশি হিসেবে আমরা এখানে ব্যর্থ হয়েছি। আমি সেই কথাটা খুব পরিষ্কারভাবে বলেছি।

দেশ রূপান্তর: রাষ্ট্র, দল, সমাজের কথা বললেন, এখানে শিল্পের ব্যর্থতা নেই?

সৈয়দ জামিল আহমেদ: হ্যাঁ। ধরেন যেখান থেকে কথা শুরু করলাম আমরা কায়দা করে বেঁচে থাকা, মানে আপনার জেলখানায় যাওয়ার দরকার নেই, কিন্তু তারপরও কথা বলা যায়। কিন্তু অন্যদিকে সৎভাবে কথা বলা এবং কারোর পা না চাটা। আমি বাংলাদেশের নাগরিক, আমি কর দিই, আমি আইন মেনে চলি এখন রাষ্ট্রের দায়িত্বই হচ্ছে আমাদের প্রটেক্ট করা এবং একই সঙ্গে আমাদের কথা বলার অধিকার দেওয়া। এখন অধিকারটা যদি না থাকে, অধিকারটা যদি হরণ করে নেওয়া হয়, তাহলে তো গন্ডগোল হয়ে যাবে। প্রত্যেকটা নাটকে আমাদের যেটা করা উচিত শিল্পী হিসেবে কথাগুলো পরিষ্কার করে উত্থাপন করা। প্রশ্নগুলো উত্থাপন করা এবং বাদবাকি মানুষ যারা, দর্শক যারা তারা তাদের মতো করে সেসবের অর্থ করে নেবেন।

দেশ রূপান্তর: আমাদের আর্ট প্র্যাকটিস কি সেই প্রয়োজনীয় প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারছে?

সৈয়দ জামিল আহমেদ: বেশিরভাগ সময়, না। এড়িয়ে যায়।

দেশ রূপান্তর: ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতায়’ জাতীয়তাবাদের স্ট্র্যাগল আবার ‘রিজওয়ানে’ প্রান্তিক হয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠী ও মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন উঠে এসেছে। এই দুই পরিস্থিতি নাটকে নিয়ে আসার চিন্তাটা স্থানীয় পরিপ্রেক্ষিতে যদি ব্যাখ্যা করতেন।

সৈয়দ জামিল আহমেদ: আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি এবং দীর্ঘদিন ধরে আমি জাতীয়তাবাদী চিন্তাই করেছি। মনে করেছি সবার আগে বাংলাদেশ। কিন্তু পরবর্তীকালে, গত ১৫-২০ বছর আমি একেবারে পোস্ট কলোনিয়াল ডিসকোর্স থেকে সরে এসে পোস্ট স্ট্র্যাকচারাল ডিসকোর্সে, বিশেষ করে জিল ডেলুজের ফিলোসফি বেশ আকৃষ্ট করছে। আমি মনে করি একটা রাষ্ট্রের অধীনে একাধিক জাতি রাইজোমের মতো অবস্থান করতে পারে। একটা শুধু বড় বটবৃক্ষের নিচে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নয়, বরং অনেকগুলো ছোট ছোট আদার গাছ। সেই আদা ভাঙলে যদি আবার রোপণ করেন তাহলে ফের সেখানেও গাছ হতে পারে। এরকম করে আনুভূমিকভাবে আমাদের বহু পরিচয়ের সমন্বয় হতে পারে। রাষ্ট্রকে আমি এখন সেইভাবে মনে করি আমি। যেখানে সবাই একে অন্যের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করতে পারি, আলোচনা করতে পারি, সংলাপ করতে পারি, তুমুল বিতন্ডা, বিতর্ক করতে পারি। সেটা ইসলামপন্থি হোক বা বাঙালি বা আদিবাসী হোক সবাই। তার ভেতর থেকে আমরা আমাদের চিন্তাটা, বাংলাদেশের পরিচয়টাকে বহুধাভিত্তিক মাল্টিডিসিপ্লিনারি জায়গা থেকে তুলে ধরতে পারি। একক কোনো আইডেন্টিটি না। মাল্টিপল আইডেন্টিটির জায়গায় যেন আমরা থাকতে পারি। সেই জায়গা থেকে রিজওয়ানটা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।

দেশ রূপান্তর: কাশ্মীরকে উপজীব্য করে শিল্পকলায় রিজওয়ান হতে দেখে আমার অবাক লেগেছিল। সেখানে চাকমা ভাষায় একটা সংলাপ ঢুকিয়েছিলেন আপনি। বাঙালি বাহাদুরির শিল্পচর্চায় আমাদের রাষ্ট্রের ভেতর প্রান্তিক হয়ে পড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ভয়েজ নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

সৈয়দ জামিল আহমেদ: একদম, তাদের ভয়েস পাই না তো বটেই।

দেশ রূপান্তর: মাত্র একটা সংলাপ, মনে হয় যেন আপনি এলিমেন্ট হিসেবে রেখেছেন পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের জন্য। নাকি সেটাও আসলে কায়দা করে তাদের তুলে ধরা?

সৈয়দ জামিল আহমেদ: না না, দেখেন টেক্সট একটা আছে, আমি সেখানে তার বাইরে আমি যেতে পারি না। সে কারণে এক জায়গায় মেয়েটি বলে, সে যেখানে থাকে তার চেয়ে সুন্দর জায়গা আর হতে পারে না এটা একটা বাক্যে চাকমা ভাষায় সে বলে। এর বেশি সেখানে আমার করার সুযোগ ছিল না। তবে আমি এখনো তেমন কোনো কাজ করতে পারিনি, যেটা হচ্ছে আমাদের এই আদিবাসী গোষ্ঠীর রূপায়ণ বা তাদের ভয়েসটা তুলে সম্পূর্ণভাবে আসবে। কিন্তু অন্যভাবে মনে করি, আমি তাদের পক্ষে কথা বলার চেয়ে তারা তাদের যে কথাটা বলছে, সেটা পরিষ্কার করা। আমি আমার লেখায় মণিপুরি থিয়েটার বলেন আর লোকনাট্য বলেন আর সাঁওতালদের পারফরম্যান্সের কথা বারবার উল্লেখ করি। আমি মনে করি এ সবকিছুর সমন্বয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ শুধু বাঙালি না। এখানে শুধু যে রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে হবে তা নয়, আমরা নিজেরাও তো পারি তাদের সেই স্পেসটা করে দিতে। আমরা আমাদের কাজের মধ্যেও তাদের নিয়ে আসতে পারি।

দেশ রূপান্তর: তাদের নিয়ে আসা বলতে সেটা কি কালচার হিসেবে? তাদের সার্ভাইব, অস্তিত্বের সংকট নিয়ে, স্ট্র্যাগলটা তো দেখি না। সরকারি অনুষ্ঠানে একটা আদিবাসী নাচের মতো। এটা তো একটা সংকট।

সৈয়দ জামিল আহমেদ: একটা বড় সংকট। কিন্তু দেখেন একজন শিল্পী হিসেবে, একজন নাট্যকর্মী হিসেবে আমি কতটুকু করতে পারি। এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর একটা বড় ভূমিকা আছে। আমাদের সম্মিলিতভাবে কিছু করার জায়গা আছে। কিছুদিন আগে দিনাজপুরে তো সাঁওতালদের উচ্ছেদ করে দেওয়া হয়েছে। সেই জায়গাগুলোতে আমাদের দাঁড়ানো উচিত।

দেশ রূপান্তর: মঞ্চ নাটকের টিকিটের দাম নিয়ে একটা আলোচনা আছে। আবার আপনার বিস্ময়কর সবকিছু ছাড়া বাদবাকি প্রোডাকশনের সেট ব্যয়বহুল বলে অভিযোগ করা হয়। আপনার মন্তব্য কী?

সৈয়দ জামিল আহমেদ: আপনি স্পেসিফিকেলি বলতে চাচ্ছেন যে, ১০০ টাকার টিকিট কেন করেন না। কেন আমরা এটা করতে পারি বা করতে পারি না বুঝতে আপনাকে একটা জিনিস দেখাই। আমি বীরাঙ্গনা বলছি নাটকে আমরা টিকিট বিক্রি করে আয় করেছি ১২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া মোট আয় করেছি ১৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং আমাদের মোট খরচ হচ্ছে ১৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা। আমাদের লাভ ৬ হাজার টাকা। খরচ হয়েছে কীসে? ১৩ শতাংশ খাবারে, ১৮ ভাগ অভিনেতাদের সম্মানী, ১৭ ভাগ লাইটিংস, সেটের জন্য ৯ ভাগ, প্রিন্টিং-ডকুমেন্টেশন পাবলিকেশন ইত্যাদির জন্য ১৬ ভাগ টাকা। হল ম্যানেজমেন্ট যারা করেছেন, যারা কস্টিউম করেছেন, মেকআপের কাজ যারা করেছেন তাদের জন্য ৫ ভাগ। এখন কারা আপনাকে এত টাকা দিতে পারবে? এটা কেন দেখছেন না যে, অভিনেতাদের টাকা দিচ্ছি। এটা হচ্ছে নিউ লিবারেল যুগ, এখানে রাষ্ট্র সব ধরনের ভর্তুকি তুলে নিচ্ছে। আপনি সিগারেটের পেছনে কত খরচ করেন? বই কেনায় কত খরচ করেন? মাসে অন্তত একবার বাইরে খেতে গিয়ে কত খরচ করেন? এখন নাটক বা শিল্পের পেছনে কত খরচ করেন?

আমরা যেটা চেষ্টা করছি, সেটা হলো একটা পেশাদার থিয়েটার তৈরি করার। কিছু মানুষ তৈরির চেষ্টা করছি যারা মঞ্চে অভিনয় করে বেঁচে থাকবে। ভর্তুকি শুধু আছে শিল্পকলা একাডেমিতে, যে হলের ভাড়া ৩০-৩৫ হাজার, সেটা সেখানে আপনি পান ৫ হাজার টাকায়। এ ছাড়া আর কোথায় আপনি ভর্তুকি পাবেন? একটা কথা বিশেষভাবে মনে রাখবেন যে, স্পর্ধা থেকে আমি একটা পয়সা নিইনি। খরচ যেটা হয়েছে অভিনেতাদের পেছনে, খাবারের পেছনে, মার্কেটিংয়ে...। এখন এ যুগে আপনি যদি একটি ভালো মানের কাজ করতে চান, হয় আপনাকে টাকা খরচ করতে হবে, অথবা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে। টাকা ছাড়া আপনি প্রথমত মানুষ পাবেন না, দ্বিতীয়ত মান রাখতে পারবেন না। মন্ত্রাসে আমরা এর চেয়ে বেশি খরচ করেছি, কিন্তু আমরা এমন একটা নাটক করতে পেরেছি, যেটা দর্শকরা ভিজ্যুয়াল দেখতে পেরেছে। এখন কথা হচ্ছে, আমি সেট ডিজাইন করতে পারি, আমি লাইট করতে পারি এবং সেটা যদি আমি করতে চাই, তাহলে বাজারের যে হাল এবং জিনিসপত্রের যে দাম, সেখানে আপনাকে খরচ করতে হবে। সেটা না করলে আমাদের ‘বিস্ময়কর সবকিছুর’ মতো করতে হবে। এটাতে ১০০ টাকার টিকিট রেখেছি স্টুডেন্টদের জন্য। আর আমরা একা ১ হাজার টাকার টিকিট করি না, আরও অনেক দল আছে যাদের টিকিটের দাম এমন।

দেশ রূপান্তর: রাষ্ট্র কতটা ভূমিকা রাখতে পারে? ভর্তুকি দিলে তো নিয়ন্ত্রণও আসবে। কিছুদিন আগে শিল্পকলা একাডেমি একটি সংগঠনকে তাদের ইভেন্ট থেকে বাদ দিয়েছে সরকারের সমালোচনামূলক কনটেন্ট থাকায়।

সৈয়দ জামিল আহমেদ: আমার মনে হয় না রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে থাকা উচিত। সরকারের সঙ্গে লেনদেনের বিষয় আসলে এসব তো আরও বেশি হবে। এখানেই কায়দা করতে হবে আপনাকে। আমি মনে করি আপনার নাটক যদি দর্শক দেখতে আসে, দর্শকের কাছে যদি চাহিদা থাকে তাহলে আপনি যেটা করতে পারবেন, সেটা অন্যভাবে পারবেন না। বাংলাদেশ হতে পেরেছিল বলেই শতকরা ৯৯ ভাগ শিল্পপতি, শিল্পপতি হতে পেরেছেন। পাকিস্তান আমলে বাঙালিদের হাতে একটা ব্যাংক আর কয়েকটা টি-গার্ডেন ছিল। আর কোনো পুঁজি বিনিয়োগ বাঙালিদের হাতে ছিল না। এই যে একটা শ্রেণি বাংলাদেশ হওয়ার পরে গড়ে উঠেছে, এদের কাছে অঢেল ধন-সম্পদ আছে। অনেকে আবার সেগুলো বিদেশে পাচার করেন। তারা যদি সেই টাকাটার নাটকে খরচ করে আপনার কী সমস্যা? তাদের কাছ থেকে যদি আমি টাকাটা নিয়ে নাটকে খরচ করতে পারি কায়দা এখানেই।

দুই একটি ছাড়া স্পর্ধার প্রায় সব প্রোডাকশন আমরা লাভ থেকে এবং ওয়ার্কশপ করিয়ে যেটা আয় করি, সেখান থেকে নিজেদের রিসোর্সের ওপর করার চেষ্টা করি। নিজেদের রিসোর্সের ওপর দাঁড়াতে গেলে আপনাকে ওই ৬০ ও ৭০ দশকের পৃথিবীর যে চিন্তা, সেটা বাদ দিয়ে চলতে হবে। আপনাকে ঊনবিংশ শতকীয় যে নৈতিক মানদ-, সেটা বাদ দিতে হবে। এখন আর মধ্যবিত্ত নয়, মধ্যবিত্তের বাইরে যেতে হবে। না হলে চলেন, গ্রামে গিয়ে নাটক করেন। অন্যভাবে নেবেন না কথাটা। লোকনাট্য বলেন আর যাই বলেন, প্রান্তিক মানুষের যে নাট্যচর্চা ছিল, সেটার তো একদম ভগ্নদশা, কারণ টাকা নেই।

দেশ রূপান্তর: আর্ট কালচারে পুঁজির বিনিয়োগ না হওয়ার পেছনে শিল্পীদের দায় নেই? শিল্পপতিরা এখানে কেন বিনিয়োগ করবেন?

সৈয়দ জামিল আহমেদ: আপনাকে প্রথমে একটা জিনিস বুঝতে হবে, শিল্পকর্ম করা মানেই একটা টাকা বিনিয়োগ করা। টেলিভিশনে তো হচ্ছেই। ইউরোপ-আমেরিকায় প্রফেশনাল থিয়েটার যেভাবে হয়, ধরেন ব্রডওয়ে, এটা একদম কমার্শিয়াল ভেঞ্চার। এখন এই কমার্শিয়াল ভেঞ্চরের ভেতর যদি কিছু অভিনেতা-অভিনেত্রী তৈরি হয়, তারা তো সেখান থেকে বের হয়ে এসেও কিছু কাজ করতে পারবে। আরেকটা হতে পারে আমাদের এখানে অনেক নাটকের দল আছে যাদের হাতে মিডিয়া হাউজ আছে, এজেন্সি আছে। তারা সেখান থেকে কমার্শিয়াল ছবি বানাতে পারে। একদম অনেক টাকা লাভ করার ছবি বানালেন নয় মাস, বাকি তিন মাস ওই লাভটা দিয়ে একটা ভালো কিছু করতে পারেন তারা। পুঁজিপতিরা বিনিয়োগ না করলে এ বুদ্ধিগুলো তো করতে হবে। কিন্তু টাকা ছাড়া আপনি এখন নাটক চিন্তা করতে পারবেন না। এই নিউ লিবারাল গ্লোবালাইজড পৃথিবীতে আর সেই জায়গাটা নেই। শুধু নাটকের আর নাট্যকর্মীদের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করালে হবে? ফটোগ্রাফারদেরও একই অবস্থা, ভিজ্যুয়াল আর্টিস্টদের একটা লাইফস্টাইল আমরা তাই দেখতে পারছি। নাটকের লোকজনের কেন সেটা থাকবে না? বাজারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি দুঃখিত, এই মুক্তবাজার অর্থনীতিতে, নিউ লিবারেল যুগে গ্লোবালাইজড পৃথিবীতে আপনি বাজারের বাইরে চিন্তা করতে পারবেন না। সেজন্য বারবার আমাকে খেয়াল রাখতে হয় আমার আয় কত আর ব্যয় কত।

দেশ রূপান্তর: বছর জুড়ে ‘রুচির দুর্ভিক্ষ’ শব্দযুগল বেশ আলোচনায় ছিল। আপনি বিষয়টি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

সৈয়দ জামিল আহমেদ: আমি মনে করি না যে এটা রুচির দুর্ভিক্ষ। আমি মনে করি যে মার্ক্সীয় ভাষায় কথা বলতে গেলে ইনফ্রাস্ট্র্যাকচারের ওপর নির্ভর করবে সুপারস্ট্র্যাকচার। আপনার রুচি যদি সংস্কৃতি হয়, সংস্কৃতির প্রকাশ হয়, সেটা নির্ভর করবে আপনি... একেবারে মেকানিক্যাল মার্ক্সিস্টদের চিন্তা আমি করছি না, আলথুসার বা অন্যদের কথা, নিও মার্ক্সিস্টদের কথা যদি আপনি চিন্তা করে দেখেন, শেষ পর্যন্ত আপনার অর্থনীতির ইনফ্রাস্ট্র্যাকচার যেমন, তেমনি হবে আপনার সুপারস্ট্র্যাকচার। এখন সেই সুপারস্ট্র্যাকচারের অংশ আপনার শিক্ষাব্যবস্থাও। এখন গত ৫২ বছরে বাংলাদেশে অর্থনীতির যে ভিত্তি গড়ে উঠেছে, সেটা যারা তৈরি করেছে, তাদের রুচির প্রকাশটা আপনি দেখছেন এখানে।

দেশ রূপান্তর: দেশে গত বছর বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ভালো সিনেমা হয়েছে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও এসেছে। কিন্তু সেসব ইন্ডি ফিল্ম। আবার ওটিটি প্ল্যাটফর্মে একরকম সাড়া তৈরি হয়েছে, কাজও ভালো হচ্ছে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী বলে?

সৈয়দ জামিল আহমেদ: আমার মনে হয় এটা খুব ভালো একটা দিক। মানে হচ্ছে, এরাও কায়দাটা বুঝে গিয়েছে। বাজারটা কেমন করে কাজ করে, মার্কেটিংটা কীভাবে করতে হয় এটা এরা খুব ভালো বুঝে গিয়েছে। মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিটা ঠিকমতো করতে পারে বলেই টাকাটাও জোগাড় করতে পারে এবং সেটা তারা পারে একাধিক সোর্স থেকে। তাছাড়া ডিজিটাল পৃথিবীতে একটা ফিল্ম যেকোনো জায়গায় চলে যেতে পারে, সেই সুবিধাটা আছে। আমি আরেকটা জিনিস দেখতে বলি, এ ফিল্মগুলো যারা করছেন তারা বা তাদের অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী কিন্তু থিয়েটার থেকে গেছেন। তারা থিয়েটার করেছেন বলেই কিন্তু ওই জায়গাটায় যেতে পেরেছেন। এর সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে, এখানে কিছু প্রফেশন তৈরি হয়েছে। এখন কিছু মানুষ চিন্তা করতে পারবে যে, আমরা এভাবে কাজ করতে পারব আর এমন মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিও তৈরির চিন্তা তারা করবে।

দেশ রূপান্তর: ভাইরাল কনটেন্ট, ট্রল, মিম বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে জনজীবনে। যা, আমাদের প্রথাগত সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করছে। আপনার মন্তব্য কী?

সৈয়দ জামিল আহমেদ: দেখুন, যেকোনো রকম পারফরম্যান্স, তা ভিডিও পারফরম্যান্স হলেও সেটা নির্ভর করবে দর্শকের ওপর। এখন দর্শক যদি দেখতে চান তাহলে আপনাকে বুঝতে হবে এর একটা বাজার আছে। এমন কিছু আছে যেটা দর্শককে আকর্ষণ করেছে। একটা জিনিস আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, দর্শকের আগ্রহ, পছন্দ, ভালোলাগা ছাড়া আপনার পারফরম্যান্স হয় না। আপনি ইন্টেলেকচুয়াল কাজ করতে পারেন, বই লিখতে পারেন সেটা হয়তো একশ বছর পর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু পারফরম্যান্সটা একদম, এটা থিয়েটারের বেলায়ও আপনাকে কনটেম্পোরারি জায়গা থেকে একদম বর্তমানে থেকে করতে হবে। দর্শকের পছন্দ হতে হবে, পপুলার হতে হবে।

শেকসপিয়ার পপুলার ছিলেন। আমাদের দেশের যে যাত্রা, হিউজলি পপুলার ছিল। তার মানে কোনো না কোনোভাবে, তারা এমন বিষয়টা তুলে ধরছেন, যা মানুষের আগ্রহ তৈরি করেছে। এটা শেখার খুব দরকার আছে। হিন্দি সিনেমা খুব পপুলার, সেখানে তারা এমন বিষয় উত্থাপন করে, যা মানুষ তাদের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যা হচ্ছে, হিন্দি সিনেমা যেভাবে শেষ করে বা ভাইরাল কনটেন্টের ভাষাটা, যেভাবে বলে সেটা। তারা যে কথাটা বলছে, সেটা খুব সরল বা চটুল বা অপ্রয়োজনীয়। আপনি দুটো একসঙ্গে করতে পারেন কি না, পপুলার হতে হবে, সেই সঙ্গে মিনিংফুল কনটেন্ট। আমি সেটা করার চেষ্টা করি। এখন কেউ যদি ভাইরাল কিছু করতে পারে, সেটা তো অনেকভাবে করা যায়। টাকা দিয়ে বুস্ট করেও ভিউ বাড়ানো যায়। এটা ঠিক যে, ভাইরাল কনটেন্টের একটা সস্তা জনপ্রিয়তা আছে, কিন্তু এটা আমার বোঝা দরকার যে, কেন মানুষ এটা পছন্দ করছে। বীরাঙ্গনাকে যদি আমি ভাইরাল করতে পারি, বীরাঙ্গনার বিষয়বস্তুকে যদি ভাইরাল কনটেন্টের মতো জনপ্রিয় করে তুলতে পারি, তাহলে বুঝব যে আমি সার্থক।

দেশ রূপান্তর: সেন্সরশিপ নিয়ে আপনার মন্তব্য কী? আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত সিনেমা সেন্সরশিপ না পাওয়াতে আমরা দেখতে পাইনি...

সৈয়দ জামিল আহমেদ: এটা তো থিয়েটারের ক্ষেত্রেও এখন কিছু কিছু জায়গায় করছে। এটা শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে ১৬ শতক থেকেই। নাটক করতে হলে রাষ্ট্রের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হতো। ওই সময় সেটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ বিশাল একটা অডিয়েন্সের সামনে সেটা উপস্থাপন করতে হতো। কিন্তু এখন ফিল্ম, ফিল্মের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন কনটেন্ট। কিন্তু অটিটি, অনলাইনে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এটা যেভাবেই হোক, দর্শকের কাছে চলে যাবে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি থিয়েটার বা ফিল্ম বা কোনো কনটেন্টকে হুমকি মনে করে, সেখানে তো সে হস্তক্ষেপ করবে। এখানে আমার বলার কী আছে? কিন্তু বুদ্ধিমান রাষ্ট্র হলে হস্তক্ষেপ করবে না। কারণ আমার মনে হয় কথা বলতে দিলে ওই কথা থেকে বিদ্রোহ হবে না, কথা বলতে না দিলে, ওই বলতে না দেওয়া থেকে বিদ্রোহ হবে। ফেসবুকে অনেক কথা বলতে দিলে আমি মনে করি না যে, সেই কথার জন্য সরকার পড়ে যাবে।

দেশ রূপান্তর: মঞ্চ নাটক তো বটেই, সিনেমা, ওটিটি মিলিয়ে আপনার ২০২৩-এর সাংস্কৃতিক পর্যবেক্ষণটা কী?

সৈয়দ জামিল আহমেদ: আমি মনে করি শুধু ২০২৩ নয়, গত দুই-তিন বছর কিছু কিছু নতুন নাটক হচ্ছে এবং দর্শক মঞ্চের দিকে ফিরে আসছে। ২০১৬, ’১৭, ’১৮ সালে যেখানে মঞ্চ ফাঁকা থাকার প্রবণতা ছিল, সেটার পরিবর্তন হয়েছে, কিছুটা দর্শক ফিরে পেতে শুরু করেছে মঞ্চ। আরেকটা ভালো জায়গা হচ্ছে, কিছু নতুন পরিচালক আসছেন, যাদের কাজগুলো খুবই উৎসাহজনক। যেমন মাঙ্কি ট্রায়াল, সিদ্ধার্থ। যে ধরনের নাটকের ভেতর থেকে দর্শকের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু আমার কাছে সংকটটা এখনো মনে হয় মুখোমুখি দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে, কায়দা করে হলেও মুখোমুখি দাঁড়ানোর এবং প্রশ্ন করা, চ্যালেঞ্জ করার এবং শিল্পী হিসেবেও পাল্টা প্রশ্ন করে রাষ্ট্র ও সমাজকে বলা, আমরা যে পথে যাচ্ছি তার বাইরে বিকল্প পথ থাকতে পারে। এ কথা বলার পথটা তৈরি করতে আমরা খুব হিমশিম খাচ্ছি। কারণ বেশিরভাগ নাট্যকর্মীই মধ্যবিত্ত। ফুলটাইম নাট্যকর্মী হওয়ার চিন্তা খুব কঠিন হয়ে যায়, যদি না তারা টিভি বা অন্য কাজ না করেন। তাদের অর্থনৈতিক বাস্তবতাটা এখনো সবল নয়। আর সিনেমা, অনলাইন কনটেন্টের জায়গায় আমি যেটা পজিটিভ দেখি সেটা হলো পপুলারিটি, পপুলার হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। পপুলারিটির আড়ালে অনেক কথাই কায়দা করে বলে ফেলা যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত