নারীর হাতে সুদিনে কৃষি

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩, ১১:১৭ এএম

গৃহস্থালী কাজ শেষে রাহেলা বেগমের অবসর কাটত নিতান্তই অলসতায়। এ সময়টাতে টানপড়েনের পরিবারের আর্থিক অক্ষমতা বিষন্ন করে তুলত তাকে। কীভাবে পরিত্রাণ মিলবে এমন ভাবনায় ছিলেন উদ্বিগ্ন। সিদ্ধান্ত নেন অলস সময়ে বাড়ির আশপাশের পতিত জমিতে মৌসুমি নানা সবজি চাষ করবেন। শুরুও করেছিলেন। কিন্তু পাচ্ছিলেন না কাক্সিক্ষত ফলন। এ সময় প্রতিবেশীর পরামর্শে যোগাযোগ করেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে। কৃষি বিভাগের মাধ্যমে রাহেলাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। চাষ উপকরণসহ বীজ সরবরাহ করে বেসরকারি এই উন্নয়ন সংস্থা।

শুধু বাড়ির আশপাশের পতিত জমি নয়, রাহেলা বছরের পর বছর ধরে অনাবাদি থাকা লবণাক্ত পতিত জমিকে গড়ে তুলেছেন চাষ উপযোগী। এখন রাহেলা একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা। প্রথম দিকে অনেকেই এটি নিছক পাগলামি মনে করলেও এখন তারাই রাহেলার সাহায্য নিয়ে পরিণত হয়েছেন সফল কৃষাণিতে। 

পটুয়াখালীর কলাপাড়ার চাকামইয়ার চুঙ্গাপাশা গ্রামের রাহেলা ছাড়াও এখন সফল কৃষাণি ও কৃষি উদ্যোক্তা মহিপুরের মনোহরপুর গ্রামের মালতী রানী, লাভলী বেগম, লালুয়ার চারিপাড়া গ্রামের সালেহা বেগম। এদের দেখাদেখি এখন উপকূলীয় জনপদের অনেক নারীই সরাসরি জড়িয়ে পড়েছেন কৃষিকাজে। 

এখন পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকার অধিকাংশ বাড়ির আশপাশেসহ অনাবাদি পতিত লবণাক্ত জমিতে বছর জুড়ে চলছে সবজি চাষ। এসব সবজি চাষ করছেন প্রান্তিক জনপদের নারীরা। সরকারি, বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এমন সবজি চাষ প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত পটুয়াখালীর উপকূলীয় জনপদের নারীদের করছে সাবলম্বী ও আত্মনির্ভরশীল। পাশাপাশি পরিবারে জোগান হচ্ছে বাড়তি অর্থনৈতিক সুবিধা। আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অসহায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবিলারও বাড়ছে সক্ষমতা। নারীরা পরিণত হচ্ছেন দক্ষ জনশক্তিতে। এতে উপকূলের কৃষি অর্থনীতিতে আসছে নতুন গতিশীলতা।

গৃহস্থালী অনেক কাজের পাশপাশি পটুয়াখালীর উপকূলের প্রান্তিক জনপদের নারীদের কাছে দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কৃষিকাজ। বাড়ির অব্যবহৃত জমিসহ অনাবাদি লবণাক্ত জমিকে চাষ উপযোগী করে বছর জুড়ে নারীরা উৎপাদন করছেন বিভিন্ন মৌসুমি সবজি। জমি প্রস্তুতকরণ, চারা রোপণ, বীজ বপন, সেচ, পরিচর্যা, ফসল সংগ্রহ, বীজ সংরক্ষণ এমনকি বাজারজাতেও এককভাবে ভূমিকা পালন করছেন এসব নারী। জৈব সারের ব্যবহারে উৎপাদিত এসব সবজি পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণে পাশাপাশি বাজারে বিক্রি করে সাবলম্বী হচ্ছেন নারীরা। হাঁস-মুরগি পালন করেও পরিবারে জোগান দিচ্ছেন বাড়তি আয়ের।

রাহেলা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভাবের সংসারে বছর জুড়ে সবজি চাষ আমার সংসারের অভাব দূর করেছে। এখন স্বামীর আয়ের সঙ্গে বাড়তি জোগান দিচ্ছি আমার উপার্জন।’

কলাপাড়ার মনোহরপুরের মালতী রানী, লাভলী বেগম জানান, এ অঞ্চলে আদা হয় না। অন্যান্য সবজির সঙ্গে তারা আদা আবাদ শুরু করেন। কৃষি অফিস থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর একটি এনজিও থেকে তাদের আদার বীজ সরবরাহ করা হয়। পরীক্ষামূলক চাষে তারা বেশ সফলতা পেয়েছেন। তাদের দেখাদেখি এখন অনেকেই আদা চাষে এগিয়ে আসছেন। 

কলাপাড়ার লালুয়ার সালেহা বেগম দেশ রূপান্তরকে জানান, একটি এনজিও থেকে পাওয়া মাত্র ১২টি হাঁস দিয়ে শুরু করে তিন বছরে এখন তার ফার্মে প্রায় ৩শ হাঁস, দেড়শ মুরগি আছে। প্রতিদিন ডিম বিক্রি করে এখন তার গড় আয় ২৪শ টাকা।

ফ্রেন্ডশিপ বাংলাদেশের অ্যাসিসট্যান্স ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের ব্যবস্থাপক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দুর্যোগকে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু নারীদের আর্থিক সক্ষমতা অর্জনের ফলে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা সম্ভব। আমাদের এনজিও সে চেষ্টাই করে যাচ্ছে।’

কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এআরএম সাইফুল্লাহ বলেন, দিন দিন উপকূলীয় জনপদের নারীরা কৃষিকাজে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। কোনো জমি এখন আর অনাবাদি থাকছে না। কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে নারীদের অংশগ্রহণে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত