ধারে-ভারে তারা মহীয়ান-গরিয়ান। ভাবমূর্তিতে বলবান-আগোয়ান। জনদরদি-জননেতা তো বটেই। আগামী দিনকয়েকের মধ্যেই তাদের নামের সঙ্গে মাননীয়-মহোদয়সহ কত বিশেষায়িত শব্দ লেগে যাবে। কারও কারও নামের সঙ্গে তা আছে গত টানা ১৫ বছর বা আরও আগে থেকেই। তাই বলে নতুন করে আবার আইনপ্রণেতা হওয়ার আগে আইনের ফাঁকে বা আইনের নামে সম্পদের হলফনামা দেখানোর যে কাণ্ডকীর্তি তারা দেখালেন তা কি চলতেই থাকবে? এ তামাশার লাগামে টান না হোক, অন্তত একটু টোকাও দেওয়া যাবে না?
কোটিপতি হওয়া, আয়-সম্পদ বৃদ্ধি মোটেই দোষের নয়। অপরাধ বা বেআইনি কাজ নয়। কোটিপতি ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না, এমন কোনো নিষেধাজ্ঞাও নেই। কিন্তু, রাজনীতিতে ভিড়লে আলাদীনের চেরাগ পাওয়ার ম্যাজিকটা বাকিদের জানাতে সমস্যা কী? তাদের কি এ তথ্যটুকু জানার অধিকারও থাকতে নেই? দেশের অর্থনৈতিক টানাপড়েন, ডলার সংকট, দুর্ভিক্ষের শঙ্কা, মিতব্যয়ী হওয়ার রাষ্ট্রীয় আহ্বানের মাঝে মহাশয়দের সম্পদ-সম্পত্তি শত-হাজার গুণ বৃদ্ধির কেরামতি অন্যরা জানলে কী সমস্যা হবে?
না, আইনে বা বিধানে তেমন বাধা নেই। বরং হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করা ফৌজদারি অপরাধের আওতাভুক্ত। কিন্তু এ অপরাধে কারও মনোনয়ন বাতিল বা ন্যূনতম শাস্তির তথ্য নেই। এর কারণ নির্বাচনওয়ালারা ভিআইপি। তাদের শান-মান-মর্যাদা ব্যাপক। তাদের দেওয়া বা দেখানো হিসাব নিয়ে টানাটানি করা মস্ত বেয়াদবি। তাদের ইমেজে টোকা পড়া মানে রাষ্ট্রের ইজ্জত। স্বপ্রণোদিতভাবে নিজেদের ক্ষমতাবলেই হলফনামা নিয়ে কাজ করতে পারে দুদক। সেই ক্ষমতা বলেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের সময় কয়েকজন প্রার্থীর হলফনামায় দেওয়া তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর দুদক তাদের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমে পড়ে চুপ মেরে যায়।
গত কয়েকটি নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামায় দেখানো সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হলেও তা বেশি দিন বা বেশি দূর গড়ায় না। সম্পদের তারায় তারায় খচিতদের শুধু প্রদর্শিত হিসাব যাচাই বা খতিয়ে দেখার দরকারও মনে করা হয় না। কারণ তারা উচ্চমার্গের বরেণ্য। ভাবের সঙ্গে ভঙ্গি অনেক। ইমেজ-মর্যাদার হস্তি। তাই তাদের সম্পদের পরিমাণ বাড়ছে গাণিতিক-জ্যামিতিক সব সীমা ছাড়িয়ে। কারও কারও নিজের নামে সম্পদ দেড়-দুগুণ বাড়লেও স্ত্রীদের বেড়েছে ৫০-৬০ গুণ পর্যন্ত। তাও কেবল তাদের দেখানো হিসাবে। অদেখানোটা তো অজানাই। ট্র্যাজেডি হচ্ছে, এটা বেআইনি নয়, আইন বা বিধি মতোই সম্পদ দেখানোর এ কাজটা তারা করেন। আইনের চেয়ে এখানে নৈতিকতার প্রশ্নটি মুখ্য। কোনো কোনো সম্পদওয়ালার হিসাব গুণ অঙ্কেও অকুলান। তাদের সম্পদ বৃদ্ধির হিসাব কষতে গেলে বর্গফলের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। শরণাপন্ন হতে হয় ক্যালকুলাসের। অস্থাবর সম্পদের ভিত্তিতে এবারের নির্বাচনে কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যা রেকর্ড গড়েছে। এক দশক আগে দশম সংসদ নির্বাচনে কোটিপতি প্রার্থী ছিলেন ২০২ জন। এবারের নির্বাচনে কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যা ৫৭১ জন। এত কোটিপতি প্রার্থী অতীতের কোনো নির্বাচনেই ছিলেন না। এবার সম্পদে সবার ওপরে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, তার সম্পদ ১ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকার বেশি।
এক মন্ত্রী ও তার স্ত্রীর বিদেশে ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকার ব্যবসাসহ কারও কারও সম্পদ স্ফীতির কিছু কিছু নমুনা কল্পনাকেও হার মানায়। ওই মন্ত্রীর নামে বিদেশে একাধিক কোম্পানি থাকার তথ্য হলফনামায় দেখানো হয়নি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির তথ্য বলছে, ১০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ আছে ১৮ প্রার্থীর। গত ১৫ বছরে খাদ্যমন্ত্রীর সম্পদ বেড়েছে ৯৮ গুণ। এটি সম্পদের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। এই একই সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ খাদ্যমন্ত্রীর সম্পদ বৃদ্ধির হার জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধির ৬ গুণের বেশি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সম্পদ বেড়েছে ১১ গুণের বেশি আর আয় বেড়েছে ১১ দশমিক ৬৩ গুণ। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ২ কোটি টাকাকে ৮৯ কোটি টাকায় পরিণত করেছেন। ২০০-৩০০ গুণ সম্পদ বৃদ্ধির অবিশ্বাস্য ঘটনাও রয়েছে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে স্বয়ং আইনমন্ত্রীরই অস্থাবর সম্পদ বেড়েছে সাড়ে ১১ গুণ। কারও কারও পতœীপ্রেমে সম্রাট শাহজাহানও বেঁচে থাকলে হীনম্মন্যতায় ভুগতেন। হলফনামায় প্রার্থীরা যেসব তথ্য দেন বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না অনেকটাই। ৩১২ কোটি টাকার সম্পদের মালিক সালমান এফ রহমান নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ করেন তার নিজস্ব কোনো গাড়ি এবং অ্যাপার্টমেন্ট নেই। এমন অনেক আছেন যাদের পরিচিতি ধনিক সমাজের অংশ হিসেবে, কিন্তু নির্বাচনের হলফনামায় তার টিকিটিও মেলে না। অনেকের সম্পদের অর্থমূল্য নির্ধারণ বেশ অস্বাভাবিক- ইন্টারেস্টিং।
অর্থমন্ত্রী দেখিয়েছেন, স্ত্রী, কন্যা ও নাতি-নাতনিদের দান করায় তার ২৪ কোটি ১৩ লাখ ৭৪ হাজার ৫৩০ টাকার সম্পদ কমে গেছে। মন্ত্রীর চেয়ে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বেড়ে গেছে তার স্ত্রীর। মন্ত্রীর হাতে নগদ আছে মাত্র ২৫ লাখ ৫৪ হাজার ৫০৯ টাকা। আর স্ত্রীর কাছে এক কোটি ৭২ লাখ ৪৯ হাজার এক টাকা আছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থমন্ত্রীর আছে আট কোটি ৪৭ লাখ ২৪ হাজার ৬৪৪ টাকা। স্ত্রীর আছে ৬২ লাখ ৯৭ হাজার ৬২৭ টাকা। বন্ড, স্টক একচেঞ্জে মন্ত্রীর আছে পাঁচ কোটি ৪৪ লাখ দুই হাজার ১৫৩ টাকা। স্ত্রীর নামে আছে ১১ কোটি ৪২ লাখ ১৩ টাকা। চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভীর কাছে আছে ৯০ ভরি স্বর্ণ। নদভী তার কাছে থাকা স্বর্ণের ভরিপ্রতি দাম ধরেছেন পৌনে ৩ হাজার টাকা। হবিগঞ্জে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খান এমপি তার স্ত্রীর স্বর্ণের ভরিপ্রতি দাম ধরেছেন ৪ হাজার টাকা। কারও কারও প্লট-ফ্ল্যাটসহ সম্পদের যে দাম দেখিয়েছেন তাও ‘অলাভজনক’ পদে থেকে কীভাবে সম্ভব এমন প্রশ্নই স্বাভাবিক। ভোটারসহ আশপাশের মানুষের কাছে তারা কেতাদুরস্ত। ঘনিষ্ঠরা জানেন আসল রূপটা। সাধারণ মানুষ তা দেখছে-শুনছে অবাক বিস্ময়ে।
সরকার বা কেউ চাইলেই এখন এ সংস্কৃতি বন্ধ হয়ে যাবে? মোটেই না। চোখের সামনে থেকে শুধু গোবর সরালেই পথ পরিষ্কার হয় না, বলদও সরাতে হয়। একজন পেশাদার চোর বা দুশ্চরিত্রের চুরি-বাটপারির করলে তা রোখা যায়। সামাজিক-রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত খ্যাতিমানদের চাতুরি-বাটপারি অপরাধ হিসেবে মারাত্মক। তা বন্ধ করতে হলেও রাজনৈতিক-সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জরুরি। সেই আশা কি আর এখন করা যায়? জায়গা অবশিষ্ট আছে সেই আশা করার? রাষ্ট্রীয় বা সরকারি আশকারায় বেড়ে ওঠে দুর্নীতি ঘাসের কঞ্চিও বাঁশ থেকে বড় হয়ে যায়। আধলাকেও তখন দূর থেকে লম্বালম্বি দেখলে আস্ত ইটের মতো লাগে। এই মান্যবরদের পিঠ মুছে, হাত বুলিয়ে এমন জঘন্য অপরাধ থেকে সরানো কঠিন হবে। বিশেষ করে নির্বাচনী ‘হলফনামা’ নামের তামাশাটি বন্ধ করা জরুরি। এটার নামই তো প্রদর্শন, মানে দেখানো। প্রদর্শিত সম্পদ শো করা। এই ‘দেখানো বা শো করা’ শব্দের অর্থ কে না বোঝে। অর্থাৎ বিদেশে পাচার, বেগমপাড়া, বেনামে লুকানোসহ বালিশের তলারটা বাদ দিয়ে দেখানো।
নির্বাচন কমিশন তা রোধ করতে পারবে না। এটি তাদের কাজ নয়। তারা কেবল হলফনামার জমাদার। তা ফাইলে জমা রাখে মাত্র। গণমাধ্যমেও একটু-আধটু জনমত গড়তে ভূমিকা রাখতে পারে, যা গণমাধ্যমগুলো এখনো করছে হলফনামা নামের খণ্ডিত আমলনামাটি নিয়ে রসালো-মজাদার তথ্যাদি সামনে এনে। এতে মানুষের আড্ডা ও আলাপ-আলোচনায় খোরাক হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চাইলে কিছু একটা করতে পারে। কিন্তু মাননীয়-মহাশয়দের ভাবমূর্তি, মর্যাদা বা ইমেজের কথা ভেবে দুদক তা করবে না বলে এরই মধ্যে তা জানিয়েছেন স্বয়ং প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান। সঙ্গে এও বলেছেন, নির্বাচনের পর ইচ্ছা করলে কথিত ‘প্রদর্শিত হিসাবের’ যথার্থতা-সত্যতায় টান দেওয়া যাবে। তব্ওু তো বলেছেন, কিছু করা যাবে। কিন্তু তখন যে তারা যে পাকাপোক্ত হয়ে আরও মান্যবর হস্তি হয়ে যাবেন! ইমেজ বা ভাবমূর্তিও আরও বেড়ে যাবে। ভাবের সঙ্গে ভঙ্গিও বাড়বে। সেই ধারালো ইমেজে তখন টোকা দেওয়া সহজ হবে? তারপরও দুদক চেয়ারম্যান যে বলেছেন, তখন চাইলে করা যাবে, তাও কম কথা নয়।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট