ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস এবং ইসরায়েলের মধ্যে প্রায় তিন মাসব্যাপী যুদ্ধের মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ইয়েমেনের শিয়া মতাবলম্বী হুতি যোদ্ধারা। গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধের দাবিতে ইসরায়েলগামী কিংবা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত জাহাজকে ক্রমাগত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানানোর কারণে লোহিত সাগরকেন্দ্রিক বিশ্ববাণিজ্য থেমে রয়েছে। সর্বশেষ মার্কিন হামলায় ১০ হুতি বিদ্রোহী নিহত হওয়ার পর ইরান লোহিত সাগরে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। এ অবস্থায় বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের দ্বার উন্মোচিত হতে পারে বলে মনে করেন অনেকে। বিশেষ করে এ সংঘাতে যদি ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে পশ্চিমা জোট এবং তেহরান জড়িয়ে যায়, এর ফল হবে বেশ ভয়াবহ।
লোহিত সাগরে জাহাজের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে প্রায় ২০টির মতো দেশকে নিয়ে ‘অপারেশন প্রস্পারিটি গার্ডিয়ান’ টাস্কফোর্স গঠন করে। এ জোটে অনেক দেশ সরাসরি অংশ নিতে না চাইলেও যুক্তরাজ্য এ নিয়ে বেশ আগ্রহী। তারা হুতি আক্রমণ প্রতিরোধে বিমান হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি ভেঙে ১০ হুতি যোদ্ধাকে হত্যা করেছে।
এ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে গত সোমবার ইরান ‘আলবুর্জ যুদ্ধজাহাজ’ মোতায়েনের পর স্বভাবতই মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা অক্ষের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধ-ব্যবস্থার সংঘাতের শঙ্কা ও ভীতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কর্তৃক হুতিদের ওপর সরাসরি হামলার অঙ্গীকার ভেঙে আক্রমণে চলে যাওয়া পরিস্থিতিকে অনেকটাই অন্যদিকে নিয়ে গেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স এডিটর জুলিয়ান বোর্গার গত রবিবার বলেন, গত ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল আক্রমণ এবং গাজায় ইসরায়েলের ব্যাপক নৃশংসতা মধ্যপ্রাচ্যকে আঞ্চলিক সংঘাতের দুয়ারে নিয়ে যাচ্ছে।
এখন বিস্তৃতমাত্রা কিংবা স্বল্পমাত্রার সংঘাত যদি দুপক্ষের মধ্যে বেধেই যায় তার পরিণতিও পশ্চিমাদের জন্য শুভকর নয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের প্রক্সিযুদ্ধ তথা ছায়াযুদ্ধের বিস্তৃত জাল রয়েছে। গাজাযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরই লেবাননের শিয়া মতাবলম্বী যোদ্ধাদল হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের ভূখন্ড লক্ষ্য করে ক্রমাগত হামলা চালাচ্ছে। হিজবুল্লাহর এখন আগের তুলনায় বহুগুণ শক্তিশালী। ইরাক, সিরিয়ার বিভিন্ন মার্কিন স্থাপনাও হামলার মুখে পড়েছে। ইরান এসব হামলাকে ‘প্রতিরোধ যুদ্ধ’ বলছে। পশ্চিমা বিশ্ব মনে করে, হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষগুলোর সক্রিয়ের নেপথ্যে রয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
এ অবস্থায় ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী গ্রান্ট শ্যাপস যেভাবে হুমকি দিয়েছেন যে, যুক্তরাজ্য হুতি অবস্থানে হামলা চালাতে দ্বিধা করবে না। এ হুমকি মোটেও বিনা চ্যালেঞ্জে রয়ে যাবে না। যুক্তরাষ্ট্র যে হামলা চালিয়েছে তা অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতি ভিন্নদিকে মোড় নেবে। তখন ইরানকে মোকাবিলা করা তো পরের কথা, মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত যোদ্ধা দলের হুমকি সামলাতে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হবে সব জাহাজকে। এরই মধ্যে লোহিত সাগর দিয়ে অর্ধেক জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এশিয়া থেকে ইউরোপ ও আমেরিকা অঞ্চলের বাণিজ্য এবং ইসরায়েলের আমদানি-রপ্তানি এ জলপথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সুতরাং ইরানকে চ্যালেঞ্জ জানানোর অর্থ হচ্ছে, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের অনেকগুলো সশস্ত্র যোদ্ধা দলকে সংঘাতের মাঠে বাধ্যতামূলকভাবে টেনে নিয়ে আসা।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব অটোয়ার অধ্যাপক থমাস জুনেউ মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক। তিনি মনে করেন, হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক সুন্নি জোটকে মোকাবিলা করতে গিয়ে গত কয়েক বছরে নিজেদের অভিজ্ঞতা বাড়িয়েছে এবং তারা এখন আর কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ কোনো গোষ্ঠী নয়। বরং তারা এখন আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বড় খেলোয়াড়। ২০১৬ সালে হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে মার্কিন বাহিনী নৌবাহিনীর সংঘাতের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ওই গবেষক আরও বলেন, ‘২০১৬ সালে হুতি বিদ্রোহীরা যে মাত্রার চ্যালেঞ্জ ছিল, এখন তা আরও কঠিন। কারণ হুতি বিদ্রোহীরা এখন আরও শক্তি অর্জন করেছে এবং নিজেদের আরও সুস্থিত মনে করছে তারা।’
