‘আত্মঘাতী’ গুপ্তহত্যায় ইসরায়েল

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:২৮ এএম

হামাসের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা সালেহ আল-আরোরিকে হত্যার পর গাজা যুদ্ধের পরিধি নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করল। হামাসের সম্ভাব্য জবাব একপাশে সরিয়ে রাখলেও ইসরায়েলকে এমন কিছু অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে যা আগে হয়নি। লেবাননের বৈরুতে ইসরায়েলি হামলায় সালেহর মৃত্যুর পর নির্ঘাত প্রতিক্রিয়া দেখাবে ইরানের মদদপুষ্ট শিয়া মতাবলম্বী গেরিলা দল হিজবুল্লাহ। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদিরা হামলার আতঙ্কে পড়বে। সবচেয়ে বড় ভূমিকা দেখা যাবে ইরানের দিক থেকে। বরাবরের মতো আড়ালে থেকে চাল চালবে তারা। গত ৭ অক্টোবর থেকে হাসান নাসরুল্লাহর নেতৃত্বাধীন লেবাননভিত্তিক হিজবুল্লাহ সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি। সীমান্তের ওপর থেকে ইসরায়েলের হামলাই ছিল তাদের মূল কাজ। ইরানের সবুজসংকেত না পেলে তারা যুদ্ধ ঘোষণা করবে না এমনটাই মনে করা হয়। কিন্তু ইসরায়েল যে কা-টি ঘটিয়েছে, তা হয়েছে একদম লেবাননের কেন্দ্রে। অর্থাৎ হিজবুল্লাহ মনে করছে, ইসরায়েল তার বাড়ির আঙিনায় এসে গুপ্তহত্যা চালিয়েছে।

ঘটনার পর গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হিজবুল্লাহ একটি বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বলছি, এ অপরাধ কোনোভাবেই বিনা চ্যালেঞ্জ ও শাস্তি ছাড়া পার পাবে না। আমরা মনে করি, বৈরুতের একেবারে কেন্দ্রে দাহিয়েহতে সালেহ আল-আরোরি ও তার সঙ্গীদের হত্যা করার অপরাধটি লেবানন এবং দেশের মানুষ, তাদের নিরাপত্তা, প্রতিরোধ ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে আগ্রাসন।’ উল্লেখ্য, এরই মধ্যে এক দফা ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামলাও চালিয়েছে হিজবুল্লাহ।

ইসরায়েলের হামলায় বৈরুতে সালেহ ছাড়াও হামাসের সামরিক শাখা আল-কাসাম ব্রিগেডের ছয় যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর ইসরায়েল ফুরফুরে মেজাজে থাকলেও দেশটির সামরিক বাহিনী পরবর্তী প্রত্যাঘাত সম্পর্কে আঁচ করতে পেরেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল ড্যানিয়েল হাগারি বলেন, ‘দেশের সামরিক বাহিনী প্রতিরক্ষা ও আক্রমণের সব ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে।’

ইসরায়েল কখনই এসব গুপ্তহত্যার কথা স্বীকার করে না। এবারও তাই হয়েছে। তবে ইসরায়েলি মন্ত্রীদের কথায় উচ্ছ্বাসের ভাব বেশ প্রকট। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মার্ক রেজেভ বলেন, ‘যে এ আক্রমণটি চালিয়েছে, তার সঙ্গে হামাসের শত্রুতা রয়েছে।’ গাজা-যুদ্ধে এরই মধ্যে ইসরায়েল ২২ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছে। হামাসকে পরিপূর্ণভাবে নির্মূল করার কথা বললেও গাজায় সেই অর্থে সংগঠনটি শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি। বিশ্লেষকরা মনে করেন, হামাসের প্রতি গাজার মানুষের সমর্থন কখনই কমবে না; কারণ যতক্ষণ ইসরায়েল তার দখলদারি ও নির্যাতন থামাবে না এবং ফিলিস্তিন সংকটের রাজনৈতিক সমাধান আসবে না ততক্ষণ হামাসের মতো সংগঠনকে নির্মূল করার অসম্ভব। এ ছাড়া ইসরায়েল বড় সামরিক শক্তি হলেও হামাসের গেরিলা যুদ্ধের কৌশল ধ্বংস করা সহজ কোনো কাজ নয়। তাছাড়া হামাস গাজার মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে রয়েছে। প্রায় তিন মাসব্যাপী যুদ্ধের পরও গাজায় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এবং হামাসের লড়াই চলছেই।

এ অবস্থায় হামাসের শীর্ষ নেতাকে গুপ্তহত্যা চালিয়ে হত্যার করার মধ্য দিয়ে হামাসের প্রতি সহানুভূতিশীল আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে ক্ষুব্ধ করে তুলবে। বিশেষ করে লোহিত সাগর পরিপূর্ণভাবে নিরাপদ করা যাবে না। গতকালও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা জাহাজে হামলা করেছে। ইসরায়েল কয়েক দিন আগে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ডারকে হত্যা করে। এরপর গতকাল হামাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তিকে হত্যা করল। অর্থাৎ ইসরায়েল এমন পরিস্থিতির দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে তার নিজের টিকে থাকার জন্য আগামী দিনে লড়াই করতে হবে। চতুর্দিক থেকে আসা ছোট্ট ছোট্ট আক্রমণ ইসরায়েলের ভেতরে এবং পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। সামগ্রিকভাবে ইরান পুরো অঞ্চলের ছায়াযুদ্ধ আরও বাড়াতে তৎপর হবে নিঃসন্দেহে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নাসের কানানি এরই মধ্যে বলেছেন, ‘সাহেল আল-আরোরি হত্যা প্রতিরোধ যুদ্ধের অক্ষে উদ্দীপনা সঞ্চার করবে এবং জায়নবাদি দখলদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উৎসাহ প্রজ্বলিত করবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত