হাড্ডি খিজিরের সহবতে

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৪, ০২:১৯ এএম

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা হাড্ডি খিজির শূন্যে পা ফেলে হাঁটতে হাঁটতে আমাকেও ডাকে আহেন! এট্টু জলদি করেন! পাও দুইখান মনে লয় ইস্ক্রুপ মাইরা মাটির লগে ফিট কইরা দিছেন!

খিজিরের তাড়া, নিরন্তর তাড়াও আমাদের পাগুলোকে এখন স্থবিরতা থেকে মুক্তি দিতে প্রতিনিয়ত ব্যর্থ হয়ে চলেছে। গতিব্যর্থতা কি আমাদের জিনবৈশিষ্ট্য?

খিজির বিরক্ত হয়ে বলে তাইলে হালায় বইয়া বইয়া খোয়াব দ্যাখেন! আমি যাইগা।

খিজিরের তাড়া আছে। কারণ সে জানে যে সে কোথায় যাবে।

কিন্তু আমি কি আর অত সহজে নড়তে পারি? নাকি খিজিরের কথামতো সঙ্গে সঙ্গে দৌড় লাগানো আমার সাজে? আমি তো পেস্ট দিয়ে দাঁত মাজি, ফ্যানের বাতাস ছাড়া গরমের দিনে-রাতে ঘুমাতে পারি না, এখন তাতেও কুলায় না এসি চালালে ভালো হয়, ঠাণ্ডা কোকাকোলা খেতে পছন্দ করি এবং মাঝে মাঝে খাই, ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের ক্রিকেট খেলা থাকলে ঐদিন অন্য কাজ ভালো লাগে না, প্যালেস্টাইনের ওপর ইহুদি হামলায় নিদারুণ মনঃক্ষুন্ন হই এবং কেজিতে দশ টাকা বেশি দিয়ে হলেও চিকন চালের ভাত খাই। আমা হেন মানুষ কি আর হাড্ডি খিজিরের কথায় হুটহাট বেরিয়ে পড়তে পারে? আমি বরং তাক থেকে বই নামিয়ে পড়তে শুরু করি। বই পড়া মানে হলো জ্ঞান অর্জন। আর জ্ঞান অর্জন হলে কোথায় যাওয়া উচিত তা বোঝা যায় এবং পদযাত্রার একটা মানচিত্রও পাওয়া যেতে পারে।

খিজির আবার বলে আরে কিসব কিতাব-উতাব পড়বার লাগছেন! মিছিল তো দূরে চইলা যাইতাছে!

যাক। মিছিল আর কত দূরে যাবে! তা ছাড়া মিছিলে গেলেই তো শুধু হলো না, মিছিলের গতিপথ বলে দিতে হবে না? বলে দেবার লোক লাগবে না? গতিপথ বলে দেবার লোক না থাকলে মিছিল তো সোজা গিয়ে ধাক্কা খাবে পাথুরে দেয়ালে কিংবা ঝপাৎ করে পড়বে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে।

তা ছাড়া মিছিলে গিয়ে হবেটা কী?

আমাদের তো ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার অনুসরণে শেখানো হয়েছে যে, পুঁজিবাদই মানবজাতির অনিবার্য নিয়তি। জানানো হয়েছে মানুষের ওপর মানুষের শোষণ চলতেই থাকবে। অনাহার অপুষ্টি অশিক্ষা অবর্ণনীয় দারিদ্র্য আর বিপরীতে সম্পদের পাহাড় হচ্ছে মানবজাতির অনিবার্য বিধিলিপি। বিশ্বায়নের নামে গোটা পৃথিবীটাকে ভাগ করে নেবে কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি। মানুষে মানুষে জাতিতে জাতিতে যে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তা বাহুল্য বিবেচিত হবে। অধিপতি শ্রেণি যাকে সংস্কৃতি বলবে তাকেই মেনে নিতে হবে নিজেদের সংস্কৃতি বলে। আমাদের নারীদের লাবণ্য, শিশুদের পুষ্টি, প্রৌঢ়-বৃদ্ধদের প্রশান্তি, যৌবনের সৃষ্টিশীলতা সবকিছু চিরস্থায়ী দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকবে চিরকালের জন্য।

আমাদের শেখানো হয়েছে যে, এই অসাম্য থেকে মুক্তির কোনো উপায় মানবসমাজের নেই। এমনকি মুক্তির চিন্তা করাটাও অন্যায়। শেখানো হয়েছে যে, প্রতিবাদ করে কোনো লাভ নেই, প্রতিবাদ করতে গেলেই বরং আরও চেপে বসবে অত্যাচারের বজ্রমুষ্টি। বিনীত প্রার্থনা জানাতে হবে। নম্র প্রার্থনায় নতজানু হলে হয়তো কিছুটা ছাড় পাওয়া গেলেও যেতে পারে। সবাই না পাক, অন্তত কেউ কেউ পাবে। যেমন তফসিলিদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে মন্ত্রী বানানো হয় শেয়ালের কুমিরছানা প্রদর্শনের মতো, সাঁওতালদের মধ্য থেকে কোনো কোনো বেনজামিন হেমব্রমকে যেমন ম্যাজিস্ট্রেট বানানো হয়। কিন্তু প্রতিবাদ করতে গেলেই তাকে মরতে হবে আলফ্রেড সরেনের মতো, কিংবা নিখোঁজ হয়ে যেতে হবে কল্পনা চাকমার মতো। তারচেয়ে বই পড়তে পড়তে একটু অতীত থেকে ঘুরেও আসা যায়।

জলকলের ডানপাশ দিয়ে আয়ুব খানের বানানো ষাট-ফুটি পিচপাথরের রাস্তা দূরের জেলার দিকে রওনা দিয়ে ঠিক উপজেলা পরিষদের তোরণের সামনে মিলেছে পাগলা রাজার রাস্তার সঙ্গে। পাগলা রাজার রাস্তা লম্বালম্বিভাবে অবশ্য বেশি বড় নয়, তবে বিস্তারে আয়ুব খানের রাস্তার সঙ্গে ভালোভাবেই পাল্লা দেয়। জনশ্রুতি, এই রাস্তায় নাকি রাজার ছয় হাতি পাশাপাশি হাঁটত মাহুতের তত্ত্বাবধানে বৈকালিক ভ্রমণে বেরিয়ে। শহরের ঘোষপাড়ার প্রতিষ্ঠাতা আদি ঘোষের ঘি খাঁটি না ভেজাল মেশানো তা নির্ণয় করেছিল রাজার কোনো এক হাতিই। খাঁটি ঘি নাকি পুং জননাঙ্গে মালিশ করার সঙ্গে সঙ্গে হাতি পেচ্ছাপ করে দেয়। এটা নাকি হাতি সমাজের এক মহান বৈশিষ্ট্য। তো খাঁটি ঘি তৈরির সুবাদে হাতির পেচ্ছাপ করায় রাজা প্রীত হয়ে নিজে রাজবাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ ঘি পারিতোষিকসহ সংগ্রহ করার পাশাপাশি নারদ নদের দক্ষিণ পাড়ে ঘোষপাড়া প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়েছিলেন। রাজার রাস্তায় এখন হাতির চলাচল থাকার প্রশ্নই ওঠে না। তবে মনুষ্য চলাচল এখনো একটি প্রবহমান বাস্তবতা। পাগলা রাজার রাস্তার দুধারে শিরীষ গাছের সারি। হাঁটতে গেলে যদি মৃদুমন্দ বাতাস থাকে তাহলে শিরীষসংগীত শোনা যেত নিশ্চিত। যেত, বলার কারণ এখন আর ওই শিরীষ গাছগুলো নেই। স্বাধীনতার ঘোষক দাবিদার যখন প্রথম মিলিটারি আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিলেন, তিনি নাকি পাগলা রাজার রাস্তা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। উদ্যোগের চিহ্নস্বরূপ কাটা হয় শিরীষবৃক্ষগুলো। বাকি কাজ আর এগোয়নি। ফলে পাগলা রাজার রাস্তা ধরে হাঁটতে গেলেও আমাদের প্রাকযৌবন আর শিরীষের শিরশির ধ্বনিতে মোহিত হওয়ার সুযোগ পেত না। উপজেলা পরিষদ থেকে দক্ষিণ দিকে রওনা দিয়ে জলকলের বামপাশ দিয়ে হর্টিকালচার প্রজেক্ট পেরিয়ে ডোমপাড়া মাঠের কালভার্ট পর্যন্ত পৌঁছতেই শেষ হয়ে যায়। কালভার্ট থেকে সরু ইট-কংক্রিটের আধুনিক রাস্তা। রাস্তার দুধারে বনলতা বালিকা বিদ্যালয়, সমবায় বিভাগের অফিস, রাজা প্রতিষ্ঠিত দাতব্য চিকিৎসালয় যা এখন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র, নতুন নতুন বসতবাড়ি, ফার্নিচারের কারখানা, বরফকল, নগরবাসীর মননচর্চার চিহ্ন হিসেবে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পাশে ডা. কায়েসউদ্দিনের বিষণœ হোমিওপ্যাথির দোকান; সেখানেই আমি জীবনে প্রথম একজন কমিউনিস্টকে চাক্ষুষ করি দৈনিক সংবাদ পাঠরত অবস্থায়।

তখন দৈনিক ইত্তেফাকের রমরমা। বাড়িতে পেপার রাখা হবে, এতখানি জাতে তখনো ওঠেনি আমাদের পরিবার। এখনো নয়। পাড়াতে চায়ের দোকান দুটি। একজনের নাম নবাব আলী, অন্যজনের নাম বাবু মিয়া। রাজ-রাজড়ার শহরে একজন নবাব অন্যজন বাবু। তারা উভয়েই কিছুটা মরমিয়া ধরনের। বুঝে ফেলেছিল চায়ের দোকান চালিয়ে তাদের সংসারের অবস্থা আর যাই হোক, রমরমা হয়ে উঠবে না। তাই দোকান চালালেও তাদের মধ্যে গা-ছাড়া ভাব। দুই দোকানেই একজন করে ছোকরা কর্মচারী। তারাই চা বানায়, কাপ মাজে, মাটি আর শিক দিয়ে তৈরি চুলায় দৈলা গুঁজে দেয়। বাবু আর নবাব মোটামুটি খদ্দেরদের কাছ থেকে পয়সাকড়ি বুঝে নেয় আর বাকি-টাকির হিসাব রাখে। তো দুই দোকানেই দৈনিক ইত্তেফাক। কিছুদিন রাজনীতি করা পাড়ার স্বনামখ্যাত জুয়াড়ি সিরাজুল চাচা আমাদের সেই সেভেন-এইটে পড়া বয়সেই বুঝিয়ে দিয়েছিল পেপারের শাঁস হচ্ছে তার উপসম্পাদকীয় কলাম। তখন উপসম্পাদকীয় লেখে স্পষ্টভাষী, লুব্ধক, সুহৃদ প্রভৃতি নামের আড়ালে অতি জ্ঞানী ব্যক্তিরা। বিভিন্ন বিষয়ে লেখা হয় উপসম্পাদকীয়। কিন্তু একটি বিষয় থাকবেই। তা হচ্ছে কমিউনিস্টদের গালি দেওয়া। সেই সঙ্গে বোঝানোর চেষ্টা করা যে, কমিউনিস্টরা হচ্ছে ভয়ানক মানুষ, দেশের এবং জাতির ধ্বংসই কমিউনিস্টদের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান, এমনকি মিলিটারিও ভয় পায় কমিউনিস্টদের।

সিরাজুল চাচার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আমাদের শহরে কমিউনিস্ট আছে কি না। উনি নাম বলেছিলেন। এবং ঘটনাক্রমে একদিন হোমিওপ্যাথির দোকানে বসে থাকা কমিউনিস্টকে দেখিয়েও দিলেন।

আমি তো থ!

এই লোক নাকি ভংয়কর!

নিরীহ গোবেচারা গোছের মানুষ, মাঝারি উচ্চতা, বয়স প্রৌঢ়ত্ব ছুঁয়েছে, মুখে সরলতার ছাপ, হেসে হেসে গল্প করছে ডাক্তারের দোকানের বেঞ্চিতে বসে থাকা আরও জনা তিনেক লোকের সঙ্গে। হাতে দৈনিক সংবাদ।

প্রাক-তারুণ্যের ঐ বয়সে, ঐদিনই আমি বুঝে গেলাম যে, কোনো একটি মিথ্যার সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি। হয় ঐ কমিউনিস্ট লোকটি মিথ্যা; না হয় দৈনিক ইত্তেফাক মিথ্যা।

কারণ কয়েকদিন আগেই, যখন পাগলা রাজার রাস্তার শিরীষ বৃক্ষনিধনপর্ব চলছিল, ঐ লোকটাকে দেখেছিলাম বৃক্ষনিধনের প্রতিবাদে বাড়ি বাড়ি ঘুরে স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে। বৃক্ষের প্রতিও যাদের এত ভালোবাসা তারা মানবজাতির এত বড় দুশমন হয় কীভাবে? ঐ লোক থেকে দূরে থাকিস! সিরাজুল কাকা তো বলেই, আব্বাও সতর্ক করে দেয়।

আমাদের ব্যাচের ছয়জনের তখন টার্গেটই হয়ে যায় ঐ লোকের কাছে যাওয়া। এমনকি যে আসাদ গত দুমাস ধরে পড়াশোনা শিকেয় তুলে শুধু ডিসি অফিসের নাজির কুতুবউদ্দিনের মেয়ে নার্গিসকে একনজর দেখার জন্য এবং তাকে নিজেকে দেখানোর জন্য দিনে অন্তত চারপাক মারে হেমাঙ্গিনী ব্রিজ টু চাঁদমারি মাঠ পর্যন্ত, সেই আসাদও এই প্রথম নার্গিসভিন্ন অন্য কোনো বিষয়ে কৌতূহলী হয়ে ওঠে।

ঐ লোকের কাছে ভিড়লে অসুবিধা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তরে বহুদর্শী  গৃহঅন্তপ্রাণ বাপ-চাচারা বলে যে ঐ লোকের কাছে গেলে সে তোদেরও কমিউনিস্ট বানিয়ে ছাড়বে। আর কমিউনিস্ট হলে তার ইহকাল-পরকাল শেষ!

সর্বনাশ! এমন একটা বিপজ্জনক মানুষকে এই লোকালয়ে বাস করতে দেয় কেন শহরের মানুষ?

দেয়! কারণ গণতন্ত্রের দেশ তো। কাউকে তো দেশ থেকে বের করে দেওয়া যায় না। তবে নজর রাখা হয়। খুব কড়া নজর। এই শহরে সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের অন্তত অর্ধেক গোয়েন্দাকেই রাখা হয়েছে শুধু এই একটা লোককে ছায়া হয়ে পর্যবেক্ষণ করার জন্য। তাই অন্যদিকে নজরই দিতে পারে না গোয়েন্দা বিভাগ। সেই কারণেই তো শহরে চুরি-ডাকাতি আর স্মাগলিংয়ের রমরমা অবস্থা।

আমরা কমিউনিস্টের প্রতি এতই আকর্ষিত বোধ করি যে, তার কাছে ঘেঁষবার জন্য আমাদের মগজের মধ্যে পরিকল্পনা তৈরি হতে থাকে অবিরাম।

প্রথমে পরিকল্পনা করা হলো, তার ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা হবে। কিন্তু তার ছেলে থাকলে তো! বিয়েই করেনি লোকটা।

আমাদের অন্য পরিকল্পনাগুলোও কাজে আসে না। তখন আমরা আবার ধরি সেই সিরাজুল কাকাকেই। কিন্তু রাজি করাতে পারি না। উল্টো সিরাজুল কাকা আমাদের যে গল্প শোনায়, তা শুনে আমরা তো থ। এই জেলার প্রধান সরকারি নেতা, যে এখন জেলার হর্তাকর্তা-বিধাতা, সেই নেতাও নাকি তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে এই কমিউনিস্টেরই শিষ্য ছিল। কাজেই সবার চেয়ে সে-ই সবচেয়ে ভালো জানে এই লোক কতখানি বিপজ্জনক। পরিস্থিতি আঁচ করতেও তার কোনো জুড়ি নেই। রাজনীতির সবচেয়ে ভালো গুরুর কাছে শিক্ষা পেয়েছে যে। সেই নেতার একটি গল্প শোনায় সিরাজুল কাকা। সেই গল্প শুনে আমরা এতই ভয় পেয়ে যাই যে, ভয়ে আমাদের হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে চায়। ফলে আমাদের আর কমিউনিস্টের কাছে যাওয়া হয়নি। আর কোনো মিছিলেও যাওয়া হয়নি।

কিন্তু হাড্ডি খিজিরকে এখন নিরস্ত করি কীভাবে? সে যে নিরন্তর তাড়া দিয়েই যাচ্ছে! আর তাড়া দেবেই না বা কেন। একটু দেরি করলেই কারও জন্য অপেক্ষা না করে মিছিল এগোতে শুরু করবে। পেছন থেকে দৌড়ে মিছিল ধরা প্রায় অসম্ভব। মিছিল ততক্ষণে ফুলে-ফেঁপে বিশাল হয়ে গেছে। গওসল আজম শ্যু ফ্যাক্টরির শ্রমিকরা শুরু করেছিল মিছিল। এখন এ-গলি ও-গলি থেকে মানুষ আসতে শুরু করেছে। নবদ্বীপ বসাক লেনের পেছন দিকের বস্তি থেকে আসছে মানুষ, পাঁচভাই ঘাট লেনের শামসুদ্দীনের রুটি কারখানার লোকজন বেরিয়ে এসেছে তন্দুরের ওম ছেড়ে, হৃষিকেশ দাস রোডের গ্যারেজ থেকে আসছে রিকশাওয়ালার দল, ঠাকুরদাস লেনের মানুষ আসছে কলুটোলার মিছিলের সঙ্গে যোগ দিয়ে, ঈশ^রদাস লেনের মানুষ আসছে বাণী ভবনের কলেজ ছাত্রদের সঙ্গে, মিউনিসিপ্যালিটি অফিসের পেছনের মুচিপাড়ার এত এত ছেলে আসছে মিছিলে যোগ দিতে। খিজির বাইরে গিয়ে একবার কলোনিবাড়ির জানালাগুলো লক্ষ করে চেঁচিয়ে বলে এসেছে বিবিজানের সিনার মইদ্যে খোমাখান ফিট কইরা নিন্দ পাইড়েন না ভাইসাবেরা, মরদের বাচ্চা মরদ হইলে রাস্তায় নামেন!

এত বড় ভর্ৎসনার পরও আমার পায়ের ওপর শরীর দাঁড়াতে চায় না।

আমরা তো অগ্নিগর্ভ সময়ের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসতেই অভ্যস্ত। সেই সময়টাতে, যখন মিছিলে মিছিলে দিন-রাত ঢাকা কাঁপছে, ১০০ বছরেরও আগে ইংরেজরা বিদ্রোহী সেপাইদের ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্য নবাব আবদুল গণিকে দিয়ে ভিক্টোরিয়া পার্কে যে পামগাছগুলো পুঁতিয়েছিল, সেই পামগাছগুলোও যখন মিছিল-স্লোগানের শব্দে সারারাত ঘুমাতে পারত না, সেই সময়টাতেও তো আমরা অনেক সময় কাটিয়েছি তর্ক করে, চা খেয়ে আর কল্পনাবিলাসে মশগুল থেকে। তখন এই প্রশ্নও আমাদের কেউ কেউ তুলেছে যে ‘ভাষা, কালচার, চাকরি-বাকরিতে সমান অধিকার, আর্মিতে মেজর জেনারেলের পদ পাওয়া এসব ভদ্রলোকদের প্রবলেম। এই ইস্যুতে ভোটের রাইট পাওয়ার জন্য মানুষের এত বড় আপসার্জ হতে পারে?’

কিন্তু সেই প্রশ্ন নিয়ে বেশি দূর এগোতে আমাদের ভয়। কথায় কথায় কেঁচো খুঁড়তে সাপ না বেরিয়ে আসে! তার চাইতে পশ্চিম পাকিস্তান আর পূর্ব পাকিস্তানের বৈষম্য নিয়ে আলোচনাই চলুক না। সেখান থেকে আবার মেয়েদের গল্পও হোক একটু-আধটু চাটনির মতো। তখন মেয়েরাও মিছিলে যাচ্ছে, রেস্টুরেন্টে বসে ছেলেদের সঙ্গে গল্প করছে দেখে একটু বেশি আগে যারা ভার্সিটি পাস করে বেরিয়েছে তারা আফসোসও করে। সেই সময় নাকি ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা বললে তার রেপ্ড হওয়ার ফিলিং হতো। ছেলেদের কথা শুনে আবার কনসিভ না করে এই ভয়ে মেয়েরা তখন কনট্রাসেপটিভ ইউজ করত।

এসব কথা ভেবে নিজের অজান্তেই ঠোঁটে মুচকি হাসির রেখা ফুটে উঠেছিল কিনা জানি না, কিন্তু খিজির ঠিকই টের পেয়ে যায়। ধমকের মতো বলে ওঠে মাইদ্যা মানুষের লাহান একলা একলা হাসেন ক্যালায়? আহেন মিছিলে আহেন!

তখন আমাকে প্রায় উঠে দাঁড়াতে হয়।

কিন্তু সেই সঙ্গে একটা কথা মনে হতেই ভয়ানক চমকে ওঠি। খিজির না মারা গেছে মিছিলে গুলি খেয়ে! খিজির তুমি না মারা গেছ? রাতের মিছিলে মারা গেছ। ভোর তিনটা বাজার আগেই তোমার তোমার হাঁ করা মুখের ওপর বড় বড় মাছি ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছিল। জুম্মন নিজের চোখে দেখেছে তোমার লাশকে মিলিটারি-ট্রাকে ওঠাতে।

তাতে হইছেডা কী বাল! ওগোর মারণের কাম, ওরা মারছে। আমার মিছিল করণের কাম, আমি মিছিল করবার আইছি। চলেন তো অহন! আর দেরি কইরেন না!

আমি তখনো অবাক হয়ে, কিছুটা ভীত চোখেই হাড্ডি খিজিরকে দেখতে থাকি। মনে পড়ে, তাকে এই চেহারাতে দেখেছিলাম ঈদের দিন। সেই ঈদের দিনটাতে হাড্ডি খিজির মুসলমানের সন্তান হওয়ার জন্য ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছিল। খুব ভোরে উঠে রাস্তার কলে ৫৭০ সাবান দিয়ে গা কচলে গোসল করেছিল। গায়ে চড়িয়েছিল আলাউদ্দিন মিয়ার দেওয়া বুকে সাদা সুতোর মিহি কাজ করা আদ্দির পাঞ্জাবি। সেটার ডান হাতের কবজির কাছে একটু ছেঁড়া। তাতে খিজিরের কোনো অসুবিধা হয়নি। হাতাটা একটু গুটিয়ে নিলেই হলো। বউয়ের নারিকেল তেল বের করে নিজে নিজে মাথায় মেখেছিল। তাও ছটাক খানেকের কম না। তার কপাল এবং জুলফি দিয়ে তেল গড়িয়ে পড়ছিল সেই শীতের সকালেও। মহাজনের বাড়িতে হাতের কাছে পেয়ে গিয়েছিল সুরমাদানি। তা থেকে ইচ্ছামতো সুরমা মেখেছিল দুই চোখে। আতর মেখেছিল পাঞ্জাবির গলা থেকে ঝুল পর্যন্ত। সেই আতর-সুরমা-নারিকেল তেল এখনো লেপ্টে আছে খিজিরের গায়ে। দাফনের আগে মুর্দা গোসল দেয়ানের সময়ও মুছে ফেলা যায়নি।

এবার খিজির আমাকেও মুখ খিস্তি করতে থাকে আরে আহেন না! কত মানু বারাইয়া আহে। আপনে দেহি দিন নাই, রাইত নাই, হোগাখান একবার উপ্তা কইরা একবার চৌকির লগে ঠেকাইয়া খালি খোয়াব দ্যাহেন! ওঠেন! গতরডা ঝাড়া দেন!

তাতে আমি বেজায় শরম পেয়ে যাই। কিন্তু আমার দ্বিধা তখনো শরমের চাইতে শক্তিশালী। বাইরে অন্ধকার। বাইরে অরণ্য-ভয়। ঘরে বসে আগে একটা সমাধান খোঁজা হোক না!

কিন্তু খিজির আর সময় দিতে রাজি না। শেষবারের মতো ডাকে ‘আহেন, বরাইয়া আহেন। অ ওসমান সাব, আহেন না!’

ঠিক সেই মুহূর্তেই আমার ঘোর কাটে। নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের মতো আমি বুঝতে পারি কোথায় আমার বাধার শেকড়। আমি করুণ আবেদনে খিজিরকে বলি আমাকে ওসমান বানিয়ো না খিজির। ওসমানরা বেশিক্ষণ মিছিলে থাকতে পারে না। বেশিক্ষণ বাস্তবে থাকতে পারে না। তারা পরাবাস্তবে পালায়। তুমি আমাকে আনোয়ার বানাও খিজির!

খিজিরের ঠোঁটে ব্যঙ্গের হাসি চাইলেই আনোয়ার হওন যায়!

আমি তখন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সামনে নতজানু হই আপনি তো স্রষ্টা! বেশি বেশি আনোয়ার বানান! বেশি বেশি খিজির বানান! জাতিটা বাঁচুক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত