এই নির্বাচনের কোনো গ্রামার নেই

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:১৮ এএম

নির্বাচন নিয়ে তো অনেক কথাই হয়েছে। সেখানে নির্বাচনের ঠিক আগের দিন বা ভোটের দিনে নতুন করে তেমন কিছু বলার জায়গা নেই। এটাকে একতরফা নির্বাচনই বলতে হবে, কারণ একটা দলের মধ্যেই মনোনয়ন পাচ্ছেন একজন, সেই দল থেকেই আবার ডামি প্রার্থী আর স্বতন্ত্র প্রার্থীও থাকছেন। সবাই তো একই দলের লোক। বাকি যে দলগুলো আছে সেখানেও আসন ভাগাভাগি আছে; ফলে তারাও যে খুব একটা ভালো কিছু করছেন, তা না। জাতীয় পার্টির অবস্থাটা খুবই খারাপ। ক্রমেই জাতীয় পার্টি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে ছোট ছোট কয়েকটা পার্টি যে ছিল সেগুলোরও অস্তিত্বের প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। তারা যেভাবে নৌকার সঙ্গে একীভূত হচ্ছে তাতে তাদের অস্তিত্ব থাকবে কি না এ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। এই নির্বাচনের পর সেটাও একটা দেখার বিষয়, কারণ তারাও বিলীন হওয়ার পথেই আছে। সেই ক্ষেত্রে ইলেকশন-পরবর্তী পর্যায়ে এই রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন ধরনের কনফিউজড স্টেট অব অ্যাফেয়ার হিসেবে থাকবে। অন্যদিকে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকারি দলের ভেতরে যে বিভাজনটা তৈরি হয়েছে, দেখা যাচ্ছে সেটা খুব সিরিয়াস বিভাজন। সেটা সংগঠনের কতটা ক্ষতি করবে সেটাও দেখার বিষয়। সব মিলিয়ে নির্বাচনটা যেভাবে হচ্ছে তাতে করে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কী হবে, কোন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাবে সেটা হলফ করে বলা যায় না। ইলেকশন কমিশন তাদের কাজ তারা করেই যাচ্ছে। তাদের কিছু করার ছিল, তারা কিছুটা চেষ্টা করছে। তবে এবারের এই নির্বাচন এতই অদ্ভুত একটা নির্বাচন যে, এর কোনো গ্রামার নেই। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বা পক্ষপাতিত্বের কথা যদি ভাবি, মাঠপ্রশাসন কার দিকে যাবে? কারণ সবই তো নিজেদের লোক হয় দলীয় বা শরিক অথবা আসন ভাগাভাগির প্রার্থী। এর মধ্যে যারা মন্ত্রী ছিলেন, এমপি ছিলেন তারা যদি হেরে যান তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আর নতুন নতুন পার্টির মধ্যেও যারা আছেন, তারাও একই চ্যালেঞ্জের মুখে থাকবেন। এটা বলতে গেলে একটা ইউনিক পরিস্থিতি। এমন নির্বাচন সচরাচর দেখা যায় না। অপরদিকে যারা নির্বাচন বর্জন করছেন, যাদের বিরোধী দলও বলা যেতে পারে। ধারণা করা হচ্ছিল তাদের মধ্যে মোটামুটি একটা দলীয় ভাঙন দেখা যাবে, যা বেশ শোনা যাচ্ছিল তেমন কিছু শেষ পর্যন্ত বা এখন পর্যন্ত হয়নি। তাদের লিডারশিপ আছে কি নেই, এমন প্রশ্নও উঠেছিল। কিন্তু দেখা গেল তাদের মাঠপর্যায়ের লিডারশিপ এত শক্তিশালী যে সেখানে ভাঙন ধরানো যায়নি। এই নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে তারা সেটা প্রমাণ করেছেন। তবে নির্বাচনের পরে এটারই বা কী ভবিষ্যৎ তা জানি না অথবা সামনে তারা কী ধরনের রাজনীতি করবেন তা বলা যাচ্ছে না।

নির্বাচন নিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে, সেটা তো একরকম ভাবাই হয়েছিল যে, এমন পরিস্থিতি হতে পারে। এখন ট্রেনে আগুন, এটা আমরা আগেও দেখেছি, এখনো দেখছি। যারা এটা করছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে, তারা সেটা অস্বীকার করছে। আবার আমরা যে প্রবণতা দেখছি তদন্ত করার আগেই বিভিন্ন লোকজন ধরা হচ্ছে এবং তাদের একরকম স্বীকারোক্তি প্রচারিত হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে একটা কনফিউশন তৈরি হয়ে আছে, নির্বাচনের আগে থেকেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রচুর সদস্য মাঠে নেমেছেন। তারপরও তারা কি দেশের কোনায় কোনায়, বাড়িতে বাড়িতে পাহারা দিতে পারবেন? আমরা তো অভিনব সব উপায় দেখছি। গতকালই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখছিলাম যে ফটিকছড়িতে যেখানে জেনারেল ইবরাহিম দাঁড়িয়েছেন, সেখানে তার প্রতিপক্ষ ইবরাহিমের পক্ষে যারা কাজ করছেন তাদের বাড়িঘরের টিউবওয়েল খুলে নিয়ে গিয়েছে, পানির পাম্প খুলে নিয়ে গিয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে এগুলো আগে দেখা যায়নি। সবকিছু মিলিয়ে একটা কনফিউশন স্টেটে আমরা আছি।

এখন নির্বাচনের পরবর্তী পর্যায়ের পরিস্থিতির মধ্যে স্থানীয় ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কী হয়, আদৌ কিছু হবে কি না, নাকি এভাবেই সব চলবে সেটা নিয়েও এখন কিছুই বলা যাচ্ছে না। সবকিছুই অনিশ্চিত। নির্বাচনের পরে ভবিষ্যতের রাজনীতি কেমন হবে, অর্থনীতির কী অবস্থা হবে (যা নিয়ে অর্থনীতিবিদরা চিন্তিত) সবই অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। সাধারণত মানুষ নির্বাচনের মধ্য থেকে একটা পরিবর্তন হবে আশা করে, সেই পরিবর্তন কারা করতে পারেন এবং সমস্যা সমাধানে কাদের কী পরিকল্পনা সেটা আগে থেকে জানা যায়। এখন এখানে তো সেটা জানা যাচ্ছে না। যা মনে করা হচ্ছে একই সরকার থাকবে, একই সরকার থাকলে তারা যে সমস্যাগুলোর সমাধান করবে, কীভাবে করবে- কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

লেখক : সাবেক নির্বাচন কমিশনার, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত