ছেলের ফোন আর আসেনি লাশকাটা ঘরেও মেলেনি

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৪, ০২:৪৬ এএম

বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে ফরিদপুর থেকে ঢাকা, এরপর সৈয়দপুরে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএসসি মেকানিক্যাল প্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবু তালহা (২৪)। ফরিদুপর থেকে ট্রেন ছাড়ার পরে বাবা আবদুল হককে বলেছিলেন, ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই ঢাকায় পৌঁছে পরে কল দেবেন। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা পরেও সেই ফোন আর আসেনি। শুক্রবার রাতে ওই ট্রেনে আগুন লাগার পর তালহার কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না আবদুল হক। ফোনও বন্ধ। দিশেহারা আবদুল হক ছেলের খোঁজে গতকাল শনিবার আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অঙ্গার হওয়া চারটি মরদেহ দেখেও তিনি ছেলেকে শনাক্ত করতে পারেননি।

শুক্রবার রাত ৯টার দিকে রাজধানীর গোপীবাগে চলন্ত বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে দুর্বৃত্তরা আগুন দেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। যশোরের বেনাপোল থেকে ট্রেনটি ঢাকায় আসছিল। সায়েদাবাদ এলাকা অতিক্রম করার সময় ওই ট্রেনে আগুন দেওয়া হয়। ট্রেনটি কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ আগে গোপীবাগ এলাকায় থামানো হয়। আগুনে ট্রেনটির তিনটি কোচ পুড়ে গেছে। আগুনে শিশুসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। দগ্ধ হয়েছে আরও অনেকে।

নিহত চারজনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তবে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষও ওই চারজনের পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি। স্বজনরা চিনতে পারছেন না কোনটা কার লাশ। অবশ্য ৪টি মরদেহের মধ্যে ৩ জন নারী এবং ১ জন পুরুষ বলে জানা গেছে।

তালহার মতোই নিখোঁজ আছেন ওই ট্রেনের আরেক যাত্রী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী চন্দ্রিমা চৌধুরী (২৮)। গতকাল ওই ঘটনার পর থেকে তাকে খুঁজে পাচ্ছে না পরিবার। চন্দ্রিমার ফুপাতো ভাই অনিন্দ পাল বলেন, রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় বড় ভাইয়ের বাসায় থেকে চন্দ্রিমা লেখাপড়া করছিলেন। ঘটনার দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ঢাকার উদ্দেশে বেনাপোল এক্সপ্রেসে ওঠেন চন্দ্রিমা। পরে কয়েকবার পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথাও হয়। অগ্নিকাণ্ডের পর তার ফোন নম্বরে কল করা হলে ব্যস্ত পাওয়া যায়। এরপর থেকে তার ফোন বন্ধ রয়েছে, কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তারা ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ করেছেন। কিন্তু পাননি।

ওই দুজনের মতো আরও দুজনের নিখোঁজ থাকার দাবি করেছে পরিবার। তাদের একজন এলিনা ইয়াসমিন (৩০)। এলিনার স্বামী সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, তার স্ত্রী এলিনা ও পাঁচ মাসের ছেলে সৈয়দ আরফান, তার শ্যালক ও শ্যালকের স্ত্রী রাজবাড়ী সদর উপজেলা থেকে ঢাকায় মিরপুর ৬০ ফিটের বাসায় ফিরছিলেন। তিনি ঢাকার বাসায় ছিলেন। তার শ্যালকের মাধ্যমে খবর পান ওই ট্রেনে আগুন লেগেছে। ছেলে শ্যালকের কোলে থাকায় শ্যালক ও তার স্ত্রী বের হতে পারলেও এলিনা বের হতে পারেনি। ধারণা করছেন তিনি ট্রেনের ভেতর পুড়ে মারা গিয়ে থাকতে পারেন। তবে এখনো তার লাশ খুঁজে পাচ্ছেন না।

নিখোঁজ অপর একজন নাতাশা জেসমিন নেকির (২৫) ভাই শাহিন জানান, স্বামী আসিফের সঙ্গে তার বোন নাতাশা ফিরছিলেন গ্রামের বাড়ি থেকে। ওই ঘটনায় নাতাশার স্বামী আসিফ বের হতে পারলেও তার বোন বের হতে পারেননি। তার পরিবার বিভিন্ন হাসপাতালে খুঁজেছেন কিন্তু পাননি। নাতাশার স্বামী আসিফ বার্ন ইউনিটে ভর্তি। আসিফ বলেন, তিনি হঠাৎ করিই আগুন দেখতে পান। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের ধোঁয়ায় দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা। ট্রেনের একজন আমাকে বের করে। কিন্তু আমার স্ত্রী জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ততক্ষণে আগুন পুরো বগিতে ছড়িয়ে পড়েছে। স্ত্রী আমার চোখের সামনে পুড়ে যায়।

ঢাকা রেলওয়ে থানার (কমলাপুর) উপপরিদর্শক (এসআই) সেতাফুর রহমান জানান, মরদেহ ৪টি পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। ময়নাতদন্তের পর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে তাদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হবে। ডিএনএ মেলার পর লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

এদিকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট সূত্র জানিয়েছে, এ ছাড়া ওই ট্রেনে দগ্ধ আটজন সেখানে ভর্তি হয়েছেন। বার্ন ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, গোপীবাগে ট্রেনে আগুনের ঘটনায় হাসপাতালে আটজন ভর্তি রয়েছে। আটজনের মধ্যে দুজন দগ্ধ হয়েছেন। তবে আটজনের সবারই শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর তাই কাউকে শঙ্কামুক্ত বলা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, রোগীরা ভীষণ আতঙ্কিত। এই আতঙ্ক যে কবে কাটবে, এটা বলা যায় না। এর দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসা দরকার। বোর্ড বসিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রেসপেরোটরি মেডিসিনের চিকিৎসকরাও রোগীদের দেখছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত