ভোট উৎসবে ‘তারা’ কোথায়

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৪, ১০:১১ পিএম

শেষ হয়ে গেল অনেক আলোচনার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কেমন হলো সেই নির্বাচন তা নিয়ে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের আলোচনা আছে। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে অন্যবারের তুলনায় এবার বেশি আগ্রহী বিদেশিরাও। কিন্তু একটা শ্রেণিকে আমার মনে হয়েছে, সবকিছু থেকে তারা বিচ্ছিন্ন। যারা পেটের দায়ে, জীবন সংগ্রামে টিকতে না পেরে গ্রামছাড়া। কষ্টকর বিভিন্ন কাজ করে টিকে থাকছে ঢাকা শহরে। তারা কী ভাবছে নির্বাচন নিয়ে। তাদের ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খেলো ভোটের সারা দিন।

বছরের শুরুর দিনে পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে যেতে উবার যাত্রী হলাম। আমি বসলাম ড্রাইভারের পাশের সিটে। যাত্রাপথ একটু দীর্ঘ হওয়াতে উবার চালকের সঙ্গে টুকটাক কথা হচ্ছিল। তার কাছে জানতে চাইলাম, ভোট দেবেন কিনা, সামনে কেমন সরকার দেখতে চান। উবার চালক হালকা চালে মৃদু স্বরে এতক্ষণ কথা চালালেও, আমার এই প্রশ্নে বেশ চড়া স্বরে বলে উঠলেন, ‘ভোট দিয়ে কী হবে! সরকার তো নাই এই দেশে, দেশে আছে ছারখার।’ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে।

উবার চালক আমার চোখের ভাষা বুঝে যা বলে গেলেন, তার সারসংক্ষেপ হলো এই যে তিনি উবারের রাইডশেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার করে গাড়ি চালান, এতে উবার কোম্পানি তার আয় থেকে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নিয়ে যায়। তিনি মনে করেন, দেশে এমন কোনো সরকার নাই যারা তার মতো দেশের মানুষের স্বার্থরক্ষা করে বিদেশি রাইডশেয়ারিং কোম্পানির গলাকাটা কমিশন বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করবে। তার মতে সাধারণ মানুষের স্বার্থ দেখার মতো কোনো দলই নাই যারা সরকার গঠন করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফেলা দেশি-বিদেশি কোম্পানির লাভের বাণিজ্য আটকাতে পারবে। ফলে এই দল গিয়ে ওই দল কিংবা ওই দল বাদ দিয়ে এই দল সরকার হলেও, তারা সবাই আসলে ‘ছারখার’। তার শেষ কথা, তিনি ভোট দেবেন না।

নির্বাচন নিয়ে আলাপ তো গত বছর জুড়ে ছিলই। আর বছরের শুরুতে তো ভোটের দরজায় কড়া নাড়া। ভোটের আগের রাতে অফিস থেকে বের হতে হতে রাত সাড়ে ১০টা বেজে গেল। স্বাভাবিকভাবেই রাস্তাঘাট ফাঁকা। অফিসের বাহন হয়তো পাওয়া যেত, কিন্তু উপভোগযোগ্য শীতের হাওয়ার লোভে ভাবলাম রিকশা নিয়েই ঘরে ফিরি। সঙ্গী হলেন এক সহকর্মী। দরদাম ঠিক করে এক রিকশার আরোহী হয়ে উঠে পড়লাম। রিকশাচালকের বাড়ি ঢাকার কাছেই, দোহারে। ভোটারও সেখানকার। জানতে চাইলাম, কাল ভোট দিতে যাবেন কীভাবে। তিনি নির্বিকার জানালেন যে, যাবেন না। কেন ভোট দিতে যাবেন না, জানতে চাওয়ার আগেই তিনি স্বগতোক্তির মতো বলে গেলেন যে, ভোট দিয়ে তার ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না, আলু-পেঁয়াজের দাম কমবে না। ফলে, তার কাছে নির্বাচনের চেয়ে, ভোটের চেয়ে রুটি-রুজির চিন্তাই বড়।

মনে পড়ল, কিছুদিন আগে আরেক রিকশাচালকের কথা। তার রিকশায়ও সাওয়ারি হয়েছিলাম বেশি রাত করে অফিস শেষ করায়। ওই রিকশাচালকের বন্ধুরা তাকে দুই নামে ডাকে। ঢাকায় যে গ্যারেজের রিকশা চালান, তিনি সেখানেই অন্যান্য রিকশাচালকের সঙ্গে মেস করে থাকেন। গ্যারেজের অন্য রিকশাচালকরা তাকে ‘টক-শো’ বলে ডাকেন। আর গ্রামে তাকে সবাই ডাকে ‘মেম্বার’ নামে। কারণ তিনি একবার ইউনিয়ন পরিষদের ভোটে মেম্বার পদে প্রার্থী হয়েছিলেন। হেরেও গিয়েছিলেন যদিও। কিন্তু বন্ধুবান্ধবের কাছে তিনি ‘মেম্বার’; আর সেই ডাকেই তিনি সাড়া দেন। ভোটে হেরে যাওয়ার কারণ কী, জানতে চাইলে তিনি বললেন, নির্বাচন মানেই টাকার খেলা; তার দাবি, ভোটে না টাকার কাছে তিনি হেরেছেন।

তৎক্ষণাৎ আমার এবারের ভোটের আগে প্রার্থীদের হলফনামার কথা মনে পড়েছিল। তিনি সমানে আওয়ামী লীগ, বিএনপির নেতাদের নিয়ে বিষোদগার উগরে দিচ্ছিলেন। তার মতে, দেশের সার্বিক যত দুরবস্থা সবকিছুর জন্য এই দুই দলই দায়ী এবং এর বাইরে যারা আছেন দেশের কথা বলেন তারা মূলত বিদেশিদের পক্ষের লোক।

রিকশাচালকের ‘টক-শো’ নামের শহুরে ডাকনামের কথা মনে পড়ল আর হাসলাম। তার কাছে জানতে চাইলাম, তো যারা বিদেশিদের পক্ষে, তাদের কথা বাদ দেন। কিন্তু যে দুই দলের কথা বললেন তারাও তো খারাপই করছে। কিন্তু, আপনি আবার বিদেশিদের বন্ধুদের তো মানেন না, তাহলে আপনার প্রিয় নেতা কেউ কি আছে? তিনি অবাক করে দিয়ে জানালেন, আছে। ভেবেছিলাম বঙ্গবন্ধু বা জিয়ার কথা বলবেন। তাই হালকা চালেই জানতে চাইলাম, কে?

তিনি জানালেন দুজন, তাদের একজন কবরে, আরেকজন জেলে। তাদের দুজনের ছবিও টাঙিয়ে রাখেন তিনি গ্যারেজের বিছানার পাশে। তিনি জানালেন তার প্রিয় দুই নেতা হচ্ছেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার উত্তর আমাকে চমকে দিয়েছিল। গন্তব্যে পৌঁছে, জানতে চেয়েছিলাম যে এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে বাড়ি যাবেন কি না, ভাড়া হাতে নিয়ে ভাঙতি ফিরিয়ে দিতে দিতে বললেন না।

সবশেষে জনৈক পরিচিত এক ভদ্রলোকের সঙ্গে গতকাল, মানে ভোটের সকালের আলাপ দিয়ে শেষ করি। তিনি ভোট দিতে চান। তিনি বিশ্বাস করেন ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তন সম্ভব। সেই সঙ্গে তার কোনো দলীয় সমর্থন না থাকার কথা জানিয়ে বললেন যে, দেশ যেভাবে চলছে তিনি মনে করেন, সেটা ঠিক না। তার কাছে জানতে চাইলাম, তাহলে তিনি ভোট দিতে যাবেন, নাকি? তিনি বললেন, যাবেন না। কেন জানতে চাইলাম, তিনি পাল্টা জানতে চাইলেন, কাকে ভোট দিয়ে কাকে সরকারে আনব?

ওপরে উল্লিখিত মানুষগুলো কেন এমনটা ভাবছেন? কেন তারা রাজনীতিতে অনাগ্রহী হয়ে ভোট বিমুখ হয়ে পড়ছেন তা ভাবা দরকার। যাদের ভাবার কথা তারা কি বিষয়টা ভেবে দেখার সময়-সুযোগ পাবেন?

লেখক : কবি, সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত