শেষ পর্যন্ত নিজের জামানতও রক্ষা করতে পারেননি আখতারুজ্জামান

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০২:৪০ এএম

এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে স্লোগান আবার একই মঞ্চ থেকেই ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে চাই’ স্লোগানে গলা ফাটান বিএনপি থেকে ষষ্ঠবার বহিষ্কার হওয়া দেশব্যাপী আলোচিত–সমালোচিত নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। তিনি তার জয়ের ব্যাপারে ছিলেন শতভাগ আত্মবিশ্বাসী। অধিকাংশ সভায় বলে বেড়াতেন ঘুমিয়ে থাকলেও নাকি জয় ঠেকানোর সুযোগ নেই। এখন ভোট শেষে নিজের জামানত রক্ষা করতে পারেননি তিনি।

স্বতন্ত্র পরিচয়ে আখতারুজ্জামান ভোটে দাঁড়ান কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে। ট্রাক প্রতীকে ভোট পান ১৬ হাজার ১৯৯। জামানত বাঁচাতে তার দরকার ছিল অন্তত ২২ হাজার ৩৮৫ ভোটের।

কিশোরগঞ্জ-২ আসনে বিজয়ী হন আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী পাকুন্দিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক মো. সোহরাব উদ্দিন। ঈগল প্রতীকে তার ভোট ৮৯ হাজার ৫৩৯। তিনি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। একাদশ ও দ্বাদশ নির্বাচনে চেয়েও দলীয় মনোনয়ন পাননি। তার সঙ্গে নৌকার প্রার্থী সাবেক ডিআইজি ও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আবদুল কাহার আকন্দের ভোটের ব্যবধান ২০ হাজার ৬০৭। এই আসনে সাত প্রার্থীর মধ্যে আখতারুজ্জামান ছাড়াও জমানত হারান আরও পাঁচ প্রার্থী।

কিশোরগঞ্জ জেলায় সংসদীয় আসন ছয়টি। এবারের নির্বাচনে জেলাবাসীর বিশেষ আগ্রহের জায়গা ছিল কিশোরগঞ্জ-২। মূলত আখতারুজ্জামানকে ঘিরে আগ্রহের জায়গা তৈরি হয়। মনোনয়নপত্র কেনার পর থেকে নতুন নতুন আলোচনার জন্ম দিয়ে নিজ নির্বাচনী এলাকা ছাপিয়ে দেশবাসীর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে সক্ষম হন তিনি। এই আসনের ফলাফল জানা নিয়েও ছিল মানুষের বাড়তি কৌতূহল। জামানত হারানোর খবরের মাধ্যমে নির্বাচন–পরবর্তী আলোচনায় আবার তিনি সামনে আসেন। ভোটারদের মন না পাওয়ার কারণ এবং তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিষয় নিয়ে আলোচনা এখন মানুষের মুখে মুখে।

স্থানীয় লোকজন জানালেন, এলাকায় আখতারুজ্জামানের পরিচয় স্পষ্টবাদী ও একরোখা স্বভাবের মানুষ হিসেবে। বেফাঁস কথা বলা তার অভ্যাস। কখন কী করবেন আর কাকে কী বলে বসবেন— আগ থেকে ধারণা করা কঠিন। বেতাল কথাবার্তার কারণে কখন কার বিপদ আসন্ন হয়ে ওঠে, তাকে ঘিরে এমন শঙ্কাও আছে কর্মীদের মনে। এই অবস্থায় এবার এমন অনিশ্চিত ও রহস্যময় নেতার কর্মী হতে চাননি তার বেশির ভাগ অনুগত। ভোটে সুবিধা করতে না পারার কারণ হিসেবে বিষয়টিকে সামনে এগিয়ে রাখছেন অনেকে।

মনে করা হচ্ছে, দল হিসাবে বিএনপি নির্বাচনে না গেলেও আখতারুজ্জামান দলটির কর্মী–সমর্থকদের কেন্দ্রে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আখতারুজ্জামানের ধারণা ছিল, কেন্দ্রে বিএনপির লোকজন তাকেই ভোট দেবে। বিএনপির মন পাওয়ার জন্য সভায় তিনি খালেদা জিয়ার মুক্তি চাইতেন। আবার নৌকার ভোট পেতেও নিয়েছেন ভিন্ন কৌশল। যে মঞ্চে তিনি খালেদার মুক্তির কথা বলতেন, একই মঞ্চে শেখ হাসিনা সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতেন। তার এই দ্বিচারী মনোভাব বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিশ্বাস হারান। ফলে এবার বিএনপি তাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে।

জয়ের ব্যাপারে আখতারুজ্জামানের আত্মবিশ্বাস ছিল আকাশচুম্বী। প্রায় সভায় বলতেন প্রধানমন্ত্রী তার জয় চান। ঘুমিয়ে থাকলেও তার জয়ে কেউ বাধা হতে পারবেন না। তার কর্মী–সমর্থকেরা বিশ্বাস করতেন তিনি সরকারের ‘গুডবুকের লোক’। ভোটের মাঠে প্রচার ছিল, বিশেষ কারণেই সরকার তাকে এই আসন থেকে বিজয়ী করে সংসদে নেবে। প্রার্থী এবং কর্মীদের এমন ভিত্তিহীন আত্মবিশ্বাস ভোটে এমন ভরাডুবি ত্বরান্বিত করে বলে ধারণা অনেকের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কটিয়াদী উপজেলা বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, নির্বাচনে আখতারুজ্জামান নানা ঘটনা রটনার জন্ম দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ বিএনপিকে খুশি রাখতে চেষ্টা করেছেন। মানুষ এত নাটক পছন্দ করে না। বিশ্বাস হারানোর কারণেই তিনি কোনো পক্ষের ভোট পাননি।

মোবাইলে কল না ধরায় আখতারুজ্জামানের বক্তব্য জানা যায়নি। তবে তার সক্রিয় কর্মী কটিয়াদী উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আ. কুদ্দুস বলেন, আমরা যা শুনে এসেছিলাম, শেষে বাস্তবে কিছুই হয়নি। শুরুতে অনেক জনপ্রতিনিধি আমাদের পক্ষে ছিল। শেষে ঈগলের ওপর ভর করে। এবার বিএনপিকেও পাওয়া যায়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত