নির্বাচন নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া পশ্চিমাদের

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:২৬ এএম

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভারত, চীন, রাশিয়া, জাপানসহ গতকাল পর্যন্ত ৫০টিরও বেশি দেশ সন্তোষ প্রকাশ করেছে। অনেক দেশের রাষ্ট্রদূত গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘ সোমবার নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। তারা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দেশগুলোর পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মানদন্ড মেনে অনুষ্ঠিত হয়নি।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক, পর্যবেক্ষক ও রাজনীতিকরা বলছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের মনোভাবের খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি এবং এটা হওয়ার কথাও নয়। এ নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমারা তাদের আগের অবস্থানেই রয়েছে। তারা মনে করছেন, যেসব দেশ নির্বাচনের পর অভিনন্দন জানিয়েছে এবং যেসব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা-অভিনন্দন জানিয়েছেন, তারা প্রত্যেকেই নির্বাচনের আগেও নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সরকারের প্রতি তাদের আস্থার কথা প্রকাশ করেছেন।

যা বলেছে যুক্তরাজ্য

ইউরোপের দেশটি বলেছে, বাংলাদেশের নির্বাচনে সব দল অংশ না নেওয়ায় আমরা হতাশ। নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হয়নি। যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘গণতান্ত্রিক নির্বাচন নির্ভর করে গ্রহণযোগ্যতা, অবাধ ও সুষ্ঠু প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর। এতে আরও বলা হয়, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও যথাযথ প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অপরিহার্য উপাদান। নির্বাচনের সময় ধারাবাহিকভাবে তা মেনে চলা হয়নি। নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে বিরোধী দলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এতে আমরা উদ্বিগ্ন।’

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘নির্বাচনের আগে, নির্বাচনী প্রচার চলাকালে সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের নিন্দা জানাই আমরা। রাজনীতিতে এসব কর্মকা-ের কোনো স্থান নেই। তাছাড়া নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি। এ কারণে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভোট দেওয়ার যথেষ্ট বিকল্প ছিল না।’ যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে বলেও বিবৃতিতে বলা হয়। একই সঙ্গে আহ্বান জানানো হয়, একটি টেকসই রাজনৈতিক সমঝোতা ও সক্রিয় নাগরিক সমাজের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে।

বিবৃতিতে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের প্রতি মতভিন্নতা দূর করে জনগণের স্বার্থে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অভিন্ন পথ বের করার আহ্বান জানায় যুক্তরাজ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতি

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলারের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জনগণ এবং গণতন্ত্র, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য তাদের আকাক্সক্ষাকে সমর্থন করে।

বিৃবতিতে বলা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্র দেখেছে যে, ৭ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন জিতেছে আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক বিরোধী দলের হাজার হাজার সদস্যকে গ্রেপ্তার এবং নির্বাচনের দিন নানা অনিয়মের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। অন্যান্য পর্যবেক্ষকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে অভিন্ন মতামত পোষণ করে যে, এ নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু ছিল না এবং আমরা দুঃখিত যে, সব দল এতে অংশগ্রহণ করেনি।’

যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনের দিন এবং এর আগের মাসগুলোতে সংঘটিত সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা বাংলাদেশ সরকারকে সহিংসতার প্রতিবেদন বিশ্বাসযোগ্যভাবে তদন্ত এবং অপরাধীদের জবাবদিহি করতে উৎসাহিত করি। আমরা সব রাজনৈতিক দলকে সহিংসতা পরিহার করার আহ্বান জানাই।’

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আরও বলেছে, ‘সামনের দিনগুলোতে একটি মুক্ত, উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের জন্য অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে এগিয়ে নিতে, বাংলাদেশে মানবাধিকার ও সুশীল সমাজের সমর্থনে, জনগণের সঙ্গে জনগণের এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করতে বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারত্বে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্বেগ

সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার পাশাপাশি ভোটের আগে-পরের সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মহাসচিবের সহযোগী মুখপাত্র ফ্লোরেন্সিয়া সোতো নিনো এ কথা জানান।

এক প্রশ্নের জবাবে মহাসচিবের মুখপাত্র ফ্লোরেন্সিয়া বলেন, ‘আমরা সেখানকার পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি। সেখানে যা ঘটছে, তার দিকে মহাসচিবেরও নজর আছে। বিরোধী দল যে ভোট বর্জন করেছে, তা তিনি অবগত আছেন। তিনি (মহাসচিব) স্পষ্টতই ভোটের আগে-পরের সহিংস ঘটনায় উদ্বিগ্ন ও সহিংসতা পরিহার এবং মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে সব দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গণতন্ত্র সুসংহত ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য এটি জরুরি।’ আরেক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সব ধরনের সহিংসতা পরিহার এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।’

ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিবৃতি

বাংলাদেশের নির্বাচন নিরপেক্ষ হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের নির্বাচন কমিশন। ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন শেষে ভারতের একটি প্রতিনিধিদলের করা মূল্যায়নে এ বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের এক বিবৃতিতে এ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।

পর্যবেক্ষণ করতে আসা ভারতীয় এই প্রতিনিধিদল বলছে, বিভিন্ন কেন্দ্রে সুষ্ঠুভাবে ভোট হতে দেখা গেছে।

ভারতের সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার ধর্মেন্দ্র শর্মার নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে বাংলাদেশে আসে। ভোটের দিন টাঙ্গাইলসহ কয়েকটি জায়গায় কেন্দ্র পরিদর্শন করেন তারা। পরে লিখিত বিবৃতি দিয়ে নিজেদের মূল্যায়ন তুলে ধরেন এ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।

২৮টি দল অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচন কাছ থেকে দেখেছেন বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার দুই শতাধিক পর্যবেক্ষক। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রেরও দুটি দল নির্বাচনের আগের পরিস্থিতি, নির্বাচন দেখেছে। তারা নির্বাচনের পর পরিস্থিতি দেখবে।

বিশ্লেষকদের অভিমত, প্রভাবশালী দেশ চীন ও রাশিয়া নির্বাচনে হস্তক্ষেপ নিয়ে পশ্চিমাদের সমালোচনাও করেছে। ভারতও শেখ হাসিনার প্রতি তাদের সমর্থন জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা এবার নির্বাচন নিয়ে গত দুই বছর ধরেই বেশি তৎপরতা দেখিয়েছে। কাজেই নির্বাচনের আগের যেমন আন্তর্জাতিক মহল বিভক্ত ছিল এখনো তাই আছে। তবে এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন দেখছেন বিশ্লেষকরা।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি মনে করি নির্বাচন ঘিরে যেসব সমালোচনা ও শঙ্কা ছিল, তা সফলভাবে মোকাবিলা করেছে সংশ্লিষ্টপক্ষ। অনেকেই ভোটার উপস্থিতির কথা বলেছেন। এটা তো সব দেশের জন্যই চ্যালেঞ্জ। আমরা যদি আমেরিকার দিকে তাকাই, কী দেখি তাদের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে ৫০ শতাংশেরও কম ভোট পড়েছে। আর তারা যে অংশগ্রহণমূলক বলছে সেটা কাদের জন্য বলছে।’ তিনি মনে করেন, বিদেশিদের কাছে বড় প্রত্যাশাটা হওয়া দরকার নির্বাচন প্রক্রিয়া ঠিক আছে কি না।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের অবস্থান পরিবর্তন হবে বলে আমি মনে করি না। কারণ তাদের একটা প্রত্যাশা ও প্রস্তাব ছিল। তারা সেটা নিয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলেছে।’

তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি তফসিল ঘোষণার পর তারা চুপ ছিল। এটাও মার্কিন পলিসি। তারা এসব ক্ষেত্রেও দুই থেকে তিনটা পলিসি নেয়। পলিসি ‘এ’ কাজ না করলে ‘বি’, না হলে ‘সি’ বাস্তবায়ন করে। কাজেই তারা চুপ ছিল মানে এই নয় যে, তারা চুপ থাকছে।” এ কূটনীতিক নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

দুদিন পর পশ্চিমাদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘রাশিয়া ও চীন যে বিষয়ে ইতিবাচক বলবে, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা ওটার বিরুদ্ধে বলবেই। আবার ভারতও অভিনন্দন জানিয়েছে। তাই পশ্চিমারাও তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত