বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের দশম আসর শুরু হচ্ছে শুক্রবার। অনাকাক্সিক্ষত অথচ অনুমেয় ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবারও নতুন মালিকানায় আসছে একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি! ‘দুর্দান্ত ঢাকা’ নামে প্রথমবারের মতো খেলবে রাজধানীর দলটি। যদিও মালিকানায় আছেন চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের এক পোশাক ব্যবসায়ী! চট্টগ্রাম উত্তর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আফতাম খান অমি নিউটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এই শিল্পগোষ্ঠীর হাতেই বিপিএলের নবীনতম দলের স্বত্ব।
২০১২ সালে শুরু হয়েছে বিপিএল, ১২ বছরে টুর্নামেন্টটি পা রাখতে যাচ্ছে দশম আসরে। ম্যাচ পাতানো অনিয়ম, আর্থিক বিশৃঙ্খলাসহ নানান কারণে ২০১৩ সালে হয়নি বিপিএল, বাতিল করা হয় গেম অনসহ পূর্ববর্তী সব ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে চুক্তি। ২০১৪ সাল থেকে নতুন করে যাত্রা শুরু করে বিপিএল। এরপর ২০২০ সালে করোনা পরিস্থিতির কারণে হয়নি এই টি-টোয়েন্টি আসর। কখনো বিসিবির হাতে স্বত্ব রেখে টিম স্পন্সরশিপ, কখনো মাত্র এক মৌসুমের জন্য মালিকানা; এসব কারণে বিপিএলে নানান সময়ে নানান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পেয়েছে দলের মালিকানা। ৯ মৌসুমে মোট ২৭ জন দলমালিককে দেখা গেছে বিপিএলে। সেই তালিকায় প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যেমন আছে, মন্ত্রীর পরিবার আছে, তেমনি আছে যুদ্ধাপরাধী পরিবার এবং প্রতারকরাও।
ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরস জিতেছিল বিপিএলের প্রথম দুই আসরের শিরোপা। এই ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা ছিল সেলিম চৌধুরীর হাতে। একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও চারটি ব্যাংকের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। তবুও নানান যোগসাজশে সেলিম চৌধুরী আইনের নাগালের বাইরে যাপন করছেন বিলাসী জীবন। সেলিম চৌধুরী ও তার পরিবারের কাছে অগ্রণী ব্যাংকের তেজগাঁও শাখার পাওনা ১১১ কোটি টাকা। ইসলামী ব্যাংকের চক মোগলটুলি শাখার পাওনা ১৫৪ কোটি টাকা। বিশাল অঙ্কের ঋণখেলাপি হয়েও সেলিম চৌধুরী আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যাপন করছেন বিলাসী জীবন।
বিপিএলের প্রথম আসরের সিলেট রয়্যালস দলের মালিকানায় ছিলেন মিজানুর রহমান। একসময় ওয়ালটন মেগা শপ নামের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল তার, পরে সোহানা ইলেকট্রনিকস নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান করেন। রংপুর রাইডার্সেরও শুরুর দিকে মালিক ছিলেন তিনি। প্রতারণার দায়ে ২০১৮ সালে গ্রেপ্তার হন মিজান। গুলশান থানার সেই সময়কার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, মিজানের নামে কমপক্ষে ছয়টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে, যার তিনটি সাজা পরোয়ানা। বিভিন্ন সময় প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে টাকা নেন মিজান। এশিয়ান টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে টাকা নিয়ে শেয়ার না দেওয়ার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। চেক প্রতারণার অভিযোগে ১ বছরের কারাদ-ের সাজা হয় মিজানের।
একাধিক আসরে আলিফ গ্রুপের হাতে ছিল সিলেট সুপার স্টারস ও বরিশাল বার্নার্সের মালিকানা। ফ্র্যাঞ্চাইজির চেয়ারম্যান আজিমুল ইসলাম দলের টানা হারে বিরক্ত হয়ে নিজেই খেলতে নেমে যেতে চেয়েছিলেন! এই আলিফ গ্রুপের বিপক্ষে নীতিনির্ধারকদের সহায়তায় অস্বচ্ছ ও বানোয়াট নথি উত্থাপন করে পুঁজি বাজার থেকে ১৭৬ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ আছে।
ফাঁসিতে ঝুলে মৃত্যুদ-ে দ-িত মানবতাবিরোধী অপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ভাই গিয়াস কাদের চৌধুরীর ছেলে সামির কাদের চৌধুরী ছিলেন বিপিএলের প্রথম দুই আসরে চিটাগাং কিংসের স্বত্বাধিকারী। পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স কোম্পানি থেকে ছেলেমেয়ের নামে ফ্ল্যাট কেনার জন্য ১২ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে শোধ করেননি গিয়াস কাদের চৌধুরী। এ ছাড়া ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে নেওয়া ঋণও শোধ করেননি। তাদের আলোচিত অর্থ পাচারকারী পিকে হালদারের সহযোগী মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
অথচ বেক্সিমকো, ডিবিএল, বেঙ্গল গ্রুপের মতো বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান বিপিএলের সঙ্গে যুক্ত হয়েও পরে আর আগ্রহ দেখায়নি ফ্র্যাঞ্চাইজি ধরে রাখতে। রেনেসাঁ গ্রুপের উদ্যোগে রাজশাহী কিংস ফ্র্যাঞ্চাইজিটি তিন মৌসুম খেলেছিল বিপিএলে। এরপর বিসিবি ফ্র্যাঞ্চাইজিদের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন না করায় বিপিএলে আর ফেরেনি। ফ্র্যাঞ্চাইজিটির প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করা ও দেশের বিভিন্ন করপোরেট কাজ করা তাহমিজ আজিজ হক মনে করেন, বিপিএলের ধারাবাহিকতার অভাব এবং অলাভজনক ব্যবসায়িক মডেলের কারণেই কোনো বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায় না বা এলেও সরে যায়, ‘বিপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট হলেও এখানে কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি বিজনেস মডেল নেই। ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে এটা হচ্ছে লোকসানের জায়গা। বিপিএলে দলগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে স্বত্ব দেওয়া হয় না, বছর বছর মালিক পালটায়, নিয়ম পাল্টায়। কেউ এখানে বিনিয়োগ করে কী পাবে? শুধু ডাগআউটের পাশে দল মালিকের চেয়ারে বসে টিভিতে চেহারা দেখানো ছাড়া বিপিএলের দল মালিকদের কোনো প্রাপ্তি নেই।’
বিপিএলের পত্তনের সময় গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ছিলেন সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘বিপিএলের শুরুর সময় যখন ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলটা বাংলাদেশে চালু করার চেষ্টা করি, তখন আমরা ব্যবসায়ীদের দ্বারে দ্বারে গিয়েছি। বসুন্ধরা, বেক্সিমকোর মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে গিয়েছি। কিন্তু তারা এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায়নি। বাধ্য হয়ে আমাদের ভুঁইফোড়, প্রতারক এ রকম কিছু ব্যবসায়ীর কাছে ফ্র্যাঞ্চাইজি বিক্রি করতে হয়েছে। কারণ তা না হলে টুর্নামেন্টটাই আয়োজন সম্ভব হতো না।’
প্রতারক চক্রের হাতে পড়ে বিপিএলে ক্রিকেটাররা জড়িয়েছেন ম্যাচ পাতানো, নারী কেলেঙ্কারিসহ নানান অপকর্মে। অন্যদিকে ভুঁইফোড় ব্যবসায়ী ও প্রতারকরা বিপিএলের সুবাদে নানান ক্রিকেটার ও তারকাদের সঙ্গে তোলা ছবি ও পরিচিতি কাজে লাগিয়ে বিস্তার করেছেন প্রতারণার জাল। ১২ বছর পেরিয়ে, ১০ আসরে এসেও এই রাহুর গ্রাস থেকে মুক্ত হতে পারেনি বিপিএল।
