দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের এবং মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুর বিরুদ্ধে ক্ষোভ থামছে না নেতাকর্মীদের। নির্বাচনে ভরাডুবি, দলীয় ও নির্বাচনী ফান্ড কুক্ষিগত করে রাখা, শেরিফা কাদেরের আসনের বিনিময়ে সিনিয়র নেতাদের বাদ দেওয়া, বারবার ফোন না ধরা, নির্বাচনে অসহযোগিতার অভিযোগ তোলা হয়েছে শীর্ষ এ দুই নেতার বিরুদ্ধে। গতকাল রবিবার রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে জাতীয় পার্টির পরাজিত প্রার্থীদের এক মতবিনিময় সভায় তারা এ দাবি করেন।
সভার মূল আয়োজক ছিলেন জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান সৈয়দ আবুল হোসেন বাবলা, প্রেসিডিয়াম সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা, শফিকুল ইসলাম সেন্টু, সাইফুদ্দিন মিলন, সাবেক এমপি ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম পাঠানসহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। এতে সারা দেশ থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৮০-৯০ জন প্রার্থী ও প্রায় পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী অংশ নেন।
সভায় দলের সিনিয়র নেতাদের বাদ দিয়ে ঢাকান্ড১৮ আসনে জিএম কাদেরের স্ত্রী শেরিফা কাদেরের মনোনয়ন নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। শুধু স্ত্রীকে সিট দিতে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়। মনোনয়ন বিক্রি করে যে টাকা তোলা হয়েছিল, তাও আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রার্থীরা তাদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তারা বলেন, সংসার, দোকানপাট বিক্রি করে নির্বাচন করেছি, নিঃস্ব হয়ে গেছি। বলতে কান্না আসছে, কী বলব, নৌকা, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের হামলার মুখে নির্বাচনী মাঠে ছিলাম। কথা দিয়েও আমাদের একটা টাকা দিলেন না চেয়ারম্যান-মহাসচিব, এমনকি ফোনও ধরেননি।
এর আগে গত শুক্রবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের অনুমতি ছাড়া ঢাকায় জাপার কোনো নেতাকর্মীকে সভা-সমাবেশে অংশ নিতে নিষেধ করা হয়। কিন্তু নিষেধ উপেক্ষা করেই এতে কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের নেতাকর্মী অংশ নেন।
সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে স্ত্রীর জন্য নয়টি সিট কোরবানি দেওয়ার অভিযোগ তোলেন সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী। তিনি বলেন, চেয়ারম্যান শুধু তার স্ত্রী শেরিফা কাদেরের সিট আদায় করতে গিয়ে ফিরোজ, বাবলা, খোকা, পীর ফজলু, আতিক, ভাসানীসহ নয়টি সিট কোরবানি দিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আপনার স্ত্রী শুধু আপনাকে রান্না করে ভাত খাওয়ান, দলে তার কী অবদান বলেন। আমাদের টাকা আপনারা ভাগবাটোয়ারা করেছেন। আপনাদের জবাব দিতে হবে।’
জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে কথা না রাখার অভিযোগ তোলেন নোয়াখালী-৩ আসনের প্রার্থী ফজলে এলাহী সোহাগ। তিনি বলেন, ‘চেয়ারম্যান আপনি এককভাবে নির্বাচন করার ওয়াদা করেও তা রাখেননি। আপনি চেয়ারম্যান হওয়ার আগে নীতিকথা বলতেন, চেয়ারম্যান হওয়ার পর পরিবর্তন হয়ে গেছেন।’
সিরাজগঞ্জের প্রার্থী মুখতার হোসেন বলেন, ‘দোকানপাট বিক্রি করে নির্বাচন করেছি। স্বতন্ত্র ও নৌকার লোকদের হামলার মুখে জীবন যায়, কিন্তু দলের কোনো সহযোগিতা পাইলাম না। একটু দেখা পর্যন্ত দিলেন না। আমাদের বরাদ্দকৃত টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন। ফোন ধরেননি, কারণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।’
প্রেসিডিয়াম মেম্বার লিয়াকত হোসেন খোকা বলেন, ‘এখানে যে অভিযোগ উঠে এসেছে বা আসছে, দলের দুই শীর্ষ নেতাকে তার জবাব দিতে হবে।’
কো-চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এ অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন। তিনি বলেন, ‘পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সঙ্গে থেকে এই জাপা প্রতিষ্ঠা করেছি। ’৯১-এর পর চারবার জেল খেটেছি, নানাভাবে জুলুম-হয়রানির শিকার হয়েছি। জাপায় পল্লীবন্ধু এরশাদের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তার নির্দেশনা ও দেখানো পথেই দলকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এবারের নির্বাচনে অংশ নিয়ে আমরা বঞ্চিত হয়েছি আর তারা গুটিকয়েক লাভবান হয়েছেন। নেতাকর্মীরা নির্বাচনের মাঠে থাকতে গিয়ে মাইর খেয়েছে কিন্তু দলের সহযোগিতা পায়নি।’
দিনে সভা, রাতে বহিষ্কার : গতকালের সভার রেশ কাটতে না কাটতেই সভায় উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেওয়ায় জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম সেন্টু এবং ভাইস চেয়ারম্যান ইয়াহইয়া চৌধুরীকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত শুক্রবার কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভ রায়কেও বহিষ্কার করেছিল জাপা। গতকাল রাতে দলের যুগ্ম দপ্তর সম্পাদক মাহমুদুল আলম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, দলের মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুর সুপারিশক্রমে এবং চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের দলীয় গঠনতন্ত্রে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ঢাকা মহানগর উত্তরের মেয়াদোত্তীর্ণ আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে শফিকুল ইসলাম সেন্টু ও ইয়াহইয়া চৌধুরীকে দলীয় সব পদ-পদবি থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে; যা ইতিমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে।
জাতীয় পার্টি ছাড়লেন নিয়াজ উদ্দিন : জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক স্বাস্থ্য সচিব এম এম নিয়াজ উদ্দিন দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। গতকাল রবিবার দলের চেয়ারম্যান বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিজেই জানিয়েছেন এম এম নিয়াজ উদ্দিন। তিনি জাপার গাজীপুর মহানগর কমিটির সভাপতি ছিলেন। পদত্যাগপত্রে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণে দায়িত্ব পালন ও রাজনীতি করতে এ মুহূর্তে সক্ষম নন বলে জানিয়েছেন নিয়াজ উদ্দিন।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো পদত্যাগপত্রে নিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘আমি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান মহোদয়ের উপদেষ্টা এবং গাজীপুর মহানগর কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণে আমি দায়িত্ব পালন ও রাজনীতি করতে এ মুহূর্তে সক্ষম নই। এমতাবস্থায় আমি চেয়ারম্যান মহোদয়ের উপদেষ্টা, গাজীপুর মহানগরের সভাপতিসহ সব দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করলাম।’
এম এম নিয়াজ উদ্দিন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জামানত হারান। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-১ ও গাজীপুর-৫ আসনে লাঙ্গল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে ভোটগ্রহণের কয়েক দিন আগে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। এই দুই আসনের মধ্যে তিনি গাজীপুর-১ (কালিয়াকৈর ও সিটির একাংশ) আসনে ভোট পান ১ হাজার ২৭৬টি এবং গাজীপুর-৫ (কালীগঞ্জ-সদর উপজেলার বাড়িয়া ও সিটির একাংশ) আসনে ভোট পান ২০০টি।
এম এম নিয়াজ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি স্বেচ্ছায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা, সাধারণ সদস্য ও পার্টি থেকে পদত্যাগ করলাম। আমি আর কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকব না।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘গাজীপুরে সামাজিক কাজ করে যাব। বিশেষ করে এলাকার কিশোর ও যুবকদের বই পড়তে আগ্রহী করে তুলব। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের জীবনমান উন্নত করতে কাজ করে যাব।’
