প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারি আর না পারি, কথা দিতে পারি আমরা। একটিবারের জন্যও এটা ভেবে দেখি না, সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা আদৌ সম্ভব কি না? অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জমজমাট এক ভগ্নহৃদয় বাজারে পরিণত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। তারা বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হলে, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছ থেকে সান্ত¡না পান। বিভিন্ন ধরনের আশার বাণীও তাদের শোনানো হয়। কিন্তু সকলি গরল ভেল। সেই যথা পূর্বং তথা পরং আগে যা ছিল পরেও তাই।
দেশের অধিকাংশ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা-চিৎকারের কথা এখন আর কারও কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না। করলেও সম্ভবত কানের পর্দায় সমস্যা রয়েছে। তারা শুনতে পান না। দেশের বাজার পরিস্থিতি কী যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তাতে কি তাদের বিন্দুমাত্র চৈতন্য উদয় হয়! এই তারা কারা? সেই তারা, যারা সিন্ডিকেট করেন। এর সঙ্গে জড়িত পক্ষগুলো কোনো কিছুতেই তাদের চলাচলের গতিবেগ হ্রাস করেন না। বরং বাড়িয়েই চলছেন। ২০২৩ সাল শুরু হয়েছিল বাজারের অস্থিরতা দিয়ে। শেষও হয়েছে পণ্যমূল্যের হতাশা দিয়ে। কিন্তু সরকারের হিসাব বলছে, দেশে পণ্যের মূল্য কিছু কমেছে। যদিও বাজারচিত্র ভিন্ন। শীতকালীন সবজির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নাগালে নেই এমনটিই জানাচ্ছে দেশ রূপান্তরে সোমবার প্রকাশিত ‘স্ফীতি কমেছে মূল্য কমেনি’ প্রতিবেদন।
দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ে কম কথা হয়নি। কিন্তু কোনো কথাই তেমন কাজে আসেনি। চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। যদিও প্রথম ছয় মাসে গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৯ শতাংশের ওপর। বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, ডলার সংকটের কারণে আমদানি-স্বল্পতা, দ্রব্যমূল্যে কারসাজি, বাজার সিন্ডিকেট প্রভৃতি কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না সরকার। নতুন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু বলেন, ‘বাংলাদেশে কোনো সিন্ডিকেট থাকতে পারবে না। কেউ কারসাজি করে বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরবরাহ ব্যবস্থায় যাতে কোনো বাধা না থাকে, সেজন্য স্মার্ট বাংলাদেশে স্মার্ট বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে।’
লক্ষ করতে হবে, এখানেও কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি। এরপর অপেক্ষা। প্রশ্ন হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আনা পর্যন্ত স্মার্ট বাজার ব্যবস্থাপনা কথাটা কেমন একটু শ্রুতিকটূ লাগে না? গত ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। এমনটি জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। কিন্তু ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি কম দেখানো হলেও বাস্তবে বাজারচিত্র ভিন্ন। শীতের মৌসুমেও শীতের সবজির দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেই। বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, অক্টোবর ও নভেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল যথাক্রমে ৯ দশমিক ৯৩ ও ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ। সে হিসাবে ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছু কমেছে। তবে এখনো সাড়ে ৯ শতাংশের কাছাকাছিই আছে। ডিসেম্বরে গ্রামে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪৮, আর শহরে ৯ দশমিক ১৫ শতাংশ হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ধনী-গরিব সবার ওপরই চাপ বাড়ায়। খাদ্যে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার অর্থ গরিব ও মধ্যবিত্ত সংসার চালাতে কম ভুগছে। তবে বাজারে শীতের শাকসবজিসহ চাল, আটা, চিনি, ডাল, পেঁয়াজ, সয়াবিন তেল, আলু প্রভৃতি নিত্যপণ্যের দাম এখনো বাড়তি।
মূল্যস্ফীতি হলো স্বতন্ত্র পণ্য ও পরিষেবার দাম বৃদ্ধি। এটি বিভিন্ন কারণে ঘটতে পারে। যেমন ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচ, বর্ধিত চাহিদা বা সরকারি নীতি। বাজারে যদি কোনো পণ্য ও সেবার চাহিদা বেড়ে যায় এবং সে অনুযায়ী সরবরাহ না থাকে, তখন দাম বেড়ে যায়। আবার কোনো জিনিস তৈরি করতে যে সামগ্রী লাগে তার দাম বাড়লেও মূল পণ্যের দাম বেড়ে যায়। অন্যদিকে একটি দেশের জনসংখ্যা অনুপাতে পণ্য ও সেবা সরবরাহ পর্যাপ্ত না থাকলেও দামে এর প্রভাব পড়ে। এখান থেকেই খুঁজে নিতে হবে, মূলত কী কারণে মূল্যস্ফীতি হচ্ছে এবং একই সঙ্গে এটাও ভাবতে হবে, মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে তার প্রভাব কেন পড়ছে না? বর্তমানে জরুরি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে বাজারেও যেন এর প্রভাব পড়ে, এটা নিশ্চিত করা। মূল্যস্ফীতি বাড়লে পণ্যমূল্য বৃদ্ধিতে সময় লাগে না। কিন্তু কমলে, পণ্যমূল্য যা আছে তাই-ই। এটা কি মনিটরিংয়ের সমস্যা, নাকি সরকারের বিভিন্ন উইংয়ের দুর্নীতি? উত্তর কে দেবেন, জানা নেই।
