শৈশব থেকে শাস্ত্রীয় সংগীত শিখছি; কিন্তু ওস্তাদ রাশিদ খানের গান শুনে বড় হয়েছি, এই কথা বলা যাবে না। আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের শেষ অব্দি কণ্ঠসংগীতে যেই তালিম আমি পেয়েছি, তার পুরোটা জুড়ে ছিলেন আমির খাঁ, বড়ে গুলাম আলি খাঁ, ভীমসেন যোশী, যশরাজ, গিরিজা দেবী, পারভীন সুলতানা, কিশোরী আমোনকর। ‘শ্রবণে অর্ধেক রেয়াজ’ এই আপ্তবাক্য আমাদের সংগীতে মানা হয়, কিন্তু সেই শ্রবণও ‘উপদিষ্ট শ্রবণ’ (guided listening)। গুরুর ও শিক্ষকের দেখানো রাস্তার বাইরে শুধু স্বাধীন রুচির অনুসারী হয়ে শাস্ত্রীয় সংগীত শোনার অবস্থা সেই বয়সে ছিল না।
বাংলাদেশভিত্তিক রাগসংগীতের চর্চার ধারাটি ততদিনে এমনিতেই সরু হয়ে আসছিল; নব্বইয়ের দশকের বাজার-সংস্কৃতির অভিঘাতে তা প্রায় অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছিল। শাস্ত্রীয় সংগীতকে তার ফর্মে গাওয়া বা বাজাবার ক্ষমতা আছে, দেশে এমন মানুষেরা ততদিনে প্রায় সবাই প্রবীণ। খুব নিভৃতে একটা চর্চার পরম্পরা যে জারি ছিল না, তা বলব না, কিন্তু প্রভাব সৃষ্টি করার মতো ছিল না তা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পর আমার সংগীতের ক্ষেত্র আরও ছোট হয়ে আসে। অন্যান্য ধারার সংগীতের সংস্পর্শেও আসি (যার মধ্যে ‘ততটা উচ্চকোটির নয়’ তেমন গান মূলত পাশ্চাত্যের পপ বা বলিউডও ছিল, স্বীকার করতে হবে)। ক্লাসিক গানকে রিমিক্স এবং রিমেক করে তরুণদের লক্ষ্য করে বাজারজাত করার একটা চল শুরু হয় তখন।
ক্যাসেট শেষ হয়ে সিডির যুগ আসে তারপর। এলিফ্যান্ট রোড বা আজিজ মার্কেটে গিয়ে পুরনো গানের ক্যাসেট বেছে তালিকা ধরিয়ে দিলে দোকানের লোকেরা সিডিতে ‘বার্ন’ করে দেওয়া শুরু করে। এই করতে গিয়ে একদিন ‘সেমি-ক্লাসিক্যাল রিমিক্স’ জনরায় একটা ক্যাসেট আবিষ্কার করি। ‘ন্যায়না পিয়া সে’ নাম ছিল সেই ক্যাসেটের।
গায়কের নাম রাশিদ খান। নামের শুরুতে ‘উস্তাদ’ লেখা ছিল দেখেই কিনা কে জানে, বললাম, ‘ভাই একটু চালায়া দেখাবেন?’ প্রথম গানটাই শোনাল ওরা। ‘বাকে পিয়াসে মোরি লাগ গয়ি নজরিয়া’। উত্তর ভারতের প্রচলিত প্রায় লোকগানেরই বাণী, কিন্তু গলায় কী ওজন আর ‘তা-সির’ কানে নয়, একদম কলিজার ভেতরে গিয়ে বিঁধল। আমার বন্ধুরা বিরক্ত হয়ে অন্যদিকে গেল, আর আমি এই গানের সম্পূর্ণ মালিকা, সিডি-বন্দি করে বাড়ি ফেরার পাঁয়তারা করলাম। সিডি হাতে পাওয়ার পর কম্পিউটারে দিনমান ‘লুপে’ শোনা শুরু হলো সেই গানগুলো। আজও স্মৃতি থেকে গাইতে পারব প্রতিটি গান, এমনই মনে হয়।
গান পরিশেষে আমার কাছে নানান রাস্তা ধরে ফিরে এসেছিল। রাশিদ খানকে তৈরি করেছিল যেই সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকাতার টালিগঞ্জের সেই আইটিসি সংগীত রিসার্চ অ্যাকাডেমিতে পাকেচক্রে আমারও শেখার সৌভাগ্য হয়। ২০১২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত পূর্ণকালীন শিক্ষার্থী ও খণ্ডকালীন গবেষক হিসেবে আমি অ্যাকাডেমির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। নিজেকে তার সতীর্থ (টেকনিক্যালি) বলতে পেরে তো শ্লাঘার অন্ত নেই।
ততদিনে তো তার ‘উস্তাদি’র নমুনা চাখা হয়ে গেছে আমার– পূর্ণদৈর্ঘ্য রাগসংগীত গায়নের যা-যা রেকর্ড বাজারে বা কালোবাজারে পাওয়া যেত তার নামে, সব শোনা শেষ। রীতিমতো তার গাওয়া রাগদারি আর বড়হৎ-এর রাস্তা নকল করছি; যখন গুরুর কাছে যেই রাগের তালিম শুরু হচ্ছে, রাশিদ খান-গীত সেই রাগের ছবি প্রায় কার্বন পেপারের মতো তুলছি। তার গলা ও গায়নের মেজাজে ডুবে থাকছি।
তার অপ্রতিরোধ্য চৌগুণি তান শুনে ঈর্ষায় সবুজ হচ্ছি (সাহিত্য ও সংগীতে আমি এমনই, ওল্ড মাস্টারদের সঙ্গেও প্রতিযোগিতাপ্রবণ)। তালিমের অংশ হিসেবে এসআরএ’র অডিও লাইব্রেরিতে দুপুরবেলা একা বসে অন্য জীবিত ও প্রয়াত মহান শিল্পীদের রেকর্ডিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে তার কোনো একটা রাগের রেন্ডিশনও শুনছি।
এইবার আর নিপাট মুগ্ধতা নিয়ে নয়, বিশ্লেষণের মন নিয়ে। কোথায় কোথায় রামপুর ঘরানার ছাপ রেখেছেন,
কোথায় গিয়ে নিজেকে স্বাধীনতা দিয়েছেন, সারগাম আর আলাপের রাস্তায় কার-কার ছায়া পাওয়া যায় (আমির খাঁয়ের?), মন্দ্র-মধ্য-তারসপ্তকে গলার ওজন কেমন ধরে রাখছেন, বন্দিশের মুখ ধরছেন কী কায়দায়, বিস্তারের পর সারগাম আর তানের ফান্দা কেমন ভাবে রচনা করছেন– এইসব নিয়ে বিস্তর ভাবছি। আর এরই মধ্যে অ্যাকাডেমির রুটিন অনুষ্ঠান (বার্ষিক সম্মেলন, মল্লার উৎসব) ও অ্যাকাডেমির বাইরে কলকাতার অন্যান্য শাস্ত্রীয় সংগীতচক্রের আয়োজনে রাশিদ খানকে বারবার লাইভ শোনা হচ্ছে। এক-একটা রাত গেছে তার পুরিয়া ধানেশ্রী, কেদার, মিয়াঁ কি মল্লার, যোগ, যোগকোষ, বাগেশ্রী, ইমন, বিলাসখানি তোড়ি, দরবারি, ভৈরবী শুনে, আর সেই সুর সমস্ত অস্তিত্বে বহন করে ভোরবেলা বাড়ি ফিরে।
অন্তর্মুখী গান ছিল তার। প্রথম স্বর থেকেই রাগের মেজাজে সমাচ্ছন্ন। সময়ের সঙ্গে তিনি তার নানা নিসার হোসেন খাঁয়ের তালিম আর আমির খাঁয়ের প্রভাবের রাস্তা অতিক্রম করে নিজস্ব গায়কিতে পৌঁছেছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ার কণ্ঠসংগীতের জীবিত শিল্পীদের মধ্যে তিনি নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন। রাগদারিতে চিন্তার বিবর্তনে বিশ্বাস করতেন তিনি। নতুনত্ব খুঁজেছেন ভীষণভাবে নিজের মধ্যে। যে ললিত সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ গলায় গেয়েছেন, ২০২২ তা থেকে সরে এসেছেন। নিজেকে একঘেয়ে করেননি।
সাম্প্রতিককালেও তার গানে সেই নতুনত্বের খোঁজ পেতে চাইতাম আমি (মল্লারে বেহলওয়া অঙ্গের তান খুব মনে পড়ে)। প্রবাসী হওয়ার পর শাস্ত্রীয় সংগীতের লাইভ বাতাবরণ থেকে আমার দূরে চলে আসতে হয়, তবু একবার মেলবোর্নে তার আসর বসেছিল– দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমি সেখানে যেতে পারিনি।
শুনেছি সেখানে বলিউডের গান ‘আওগে যব তুম’ গাওয়ার অনুরোধ এসেছিল তার কাছে; গেয়েছিলেন কি না, কে জানে! ‘আও গে যব তুম’-এর মতো গান অনেকেই গাইতে পারতেন হয়তো। কিন্তু যোগের সা থেকে গান্ধার এই ওজনে কজন তুলতে পারতেন? রুনা লায়লার পরিচয় যেমন ‘পান খাইয়া ঠোঁট’ গানের মধ্যে নয়, রাশিদ খানও ‘আও গে যব তুম’ নয়, অন্তত আমার কাছে।
তিনি চলে যাওয়ার আগের দিন কবি সুহৃদ শহীদুল্লাহর সর্বশেষ বইয়ের কবিতা একটা গানের মতো মাথায় ঘুরছিল। কবিতাটার নাম ‘অন্তিম’। ‘যেন যাই সাক্ষীহীন- রাত্রিদিন ধ’রে; পথে ছায়া খসে পড়ে।’
জীবনের মধ্যভাগ এখন; দিন এবং মাসগুলো চিহ্নিত হচ্ছে ছায়া খসে পড়ার দাগে। কিন্তু এত বিরাট, এত অতিকায় ছায়া, এত আচমকা বুকের ওপর খসে পড়বে, ভাবিনি।
বিদায়, ওস্তাদ রাশিদ খান। আমাদের জগতের জুপিটার গানের আকাশের রাজা। সংগীত রিসার্চ অ্যাকাডেমির ভাইবোনদের রাশিদ কাকু, রাশিদ চাচা, রাশিদ ভাই। আপনার উচ্চতা এত ভয়ানক ছিল যে, সবাই অন্তরে আপনাকে রোল মডেল মানলেও, কেউ সাহস করে তা স্বীকার করত না। আপনি রোল মডেল ছিলেনও না, ছিলেন অধীশ্বর। কে ডাকল, কেন ডাকল আপনাকে, এত দ্রুত উঠে চলে যেতে?
লেখক: ঔপন্যাসিক ও গল্পকার, শাস্ত্রীয় সংগীতের শিক্ষার্থী
