কেন এই দুর্দশা

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৪, ০৩:১০ এএম

অতীতের সঙ্গে ব্যবধানটা আকাশ-পাতাল

আমাকে মানুষ ব্রাদার্সের বাবলু হিসেবেই চেনে। সত্তরের দশকে এই ক্লাবের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। সে সময় অনেক বড় বড় ক্লাব থেকে লোভনীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছি শুধুমাত্র ব্রাদার্সে খেলব বলে। ব্রাদার্সের সোনালি সময়ের সাক্ষী হতে পারা আমার ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় অর্জন। সবচেয়ে বড় কথা, আবাহনী-মোহামেডানের বাইরে একটি দলে খেলে যে তারকাখ্যাতি পাওয়া যায়, সেটাই হয়েছে ব্রাদার্সে খেলে। আমার পরিচয় ব্রাদার্সের বাবলু হলেও আমি গোপীবাগের ছেলে ছিলাম না। তারপরও এই ক্লাবের হয়ে খেলে গেছি বছরের পর বছর। এই দলের জন্য জেল খেটেছি, ফেরারি আসামি হয়েছি। ঘরে ঘরে চাঁদা তুলে ক্যাম্পের খরচ জোগাড় করে খেলেছি। তাই এর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অবিচ্ছেদ্য। অথচ সেই অতীতের সঙ্গে বর্তমানের ব্যবধানটা আকাশ-পাতাল। খুব দুঃখ লাগে যখন দেখি, ঢাকার মাঠে ব্রাদার্স এখন তলানির সারির দল। নেতৃত্ব সংকটের কারণে পদে পদে হোঁচট খাচ্ছে দলটি। অথচ এসব দেখার কেউ নেই।

সাংগঠনিক দুর্বলতায় দুর্দশাগ্রস্ত ব্রাদার্স

আমি বগুড়ার ছেলে। তবে যখন থেকে শীর্ষ ফুটবলে খেলা শুরু করি, তখন থেকেই আমি ব্রাদার্সের মোহসিন। এই ক্লাবে খেলেই আমি তারকাখ্যাতি পেয়েছি। আমরাই ছিলাম খেলোয়াড়, আমরাই সংগঠক। ক্লাবের প্রতি আমাদের যেই দরদ, সেটা আমার মনে হয় বর্তমানে যারা ক্লাবের দায়িত্বে আছেন তাদের নেই। সেই সত্তর দশকে যেভাবে দল গঠন করা হতো, সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে আমাদের নাম এখনো আবাহনী, মোহামেডানের সঙ্গে উচ্চারিত হতো। টাকা ছাড়া ফুটবল চালানো অসম্ভব। সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ক্লাবমুখী করা না গেলে, এই দুর্দশা কাটবে না। এরকম মানুষদের আকৃষ্ট করতে হলে আমাদের যে গুডউইল আছে, সেটাও চাইলে ক্লাব ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু সেরকম উদ্যোগ কখনো নিতে দেখিনি। যতদিন খেলেছি, ততদিন ব্রাদার্স ছাড়া কিছুই বুঝতাম না। খেলা ছাড়ার পর আর কেউ আমাদের মনে রাখেনি। তাই এখন যখন ব্রাদার্সকে মাঠে হোঁচট খেতে দেখি, খুব কষ্ট হয়।

ভালোমানের বিদেশি নেই

বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ থেকে প্রিমিয়ারে ফেরার পর আমাদের লক্ষ্য ছিল ভালোমানের বিদেশি এনে মাঝারি শক্তির দল গড়ার। তবে সময়মতো আন্তর্জাতিক অনুমতিপত্র (আইটিসি) পাইনি বলে চারজন গাম্বিয়ানের মধ্যে তিনজনকে আনতে পারিনি। একজন ডিফেন্ডার এসেছিল। তবে রহস্যজনক কারণে নতুন গাম্বিয়ান কোচ (ওমর সিসে) যোগ দেওয়ার পর সেই ফুটবলার কাউকে কিছু না বলে ক্যাম্প ছেড়ে চলে গেছে। যে কারণে আমাদের একটু ভুগতে হচ্ছে। তাছাড়া চুক্তি করেও বাফুফে এলিট অ্যাকাডেমির ছয় ফুটবলার ক্যাম্পে যোগ দেয়নি। বাফুফে তাদের ছাড়ছে না। অথচ তাদের নাম আমাদের নিবন্ধন তালিকায় আছে। আমরা তাদের যোগ দিতে বলেছি একাধিকবার। বাফুফে থেকে বলা হয়েছে, শর্ত অনুযায়ী বেতনের ৬০ শতাংশ তাদের কাছে জমা দিইনি বলে, তারা খেলোয়াড় ছাড়ছে না। বাফুফের কাছে অংশগ্রহণ ফি বাবদ অনেক টাকা পাই। সেখান থেকে সেই টাকা কেটে রাখলেই হয়। যাই হোক, নতুন কোচ এসে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। আশা করছি তাদের অধীনে সামনে দল ভালো করবে।

ব্রাদার্স এখন ডেড হর্স

ব্রাদার্স এখন ডেড হর্সে পরিণত হয়েছে। এটা নিয়ে তাই এখন কথা বলতেও ভালো লাগে না। বয়স হয়েছে। কিছু বললে আবার অনেকের বিরাগভাজন হতে হয়, তাই কিছু বলি না। তবে যখন মানুষ ফোন করে বলে আপনার দল তো পাঁচ গোল, ছয় গোল খেয়েছে, তখন খুব খারাপ লাগে। ক্লাবে যারা দায়িত্বে আছেন, আমার মনে হয়, তাদের ব্রাদার্সের অতীত সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। তাই তারা সম্মানীয়দের সম্মান দিতে জানেন না। ব্রাদার্সে খেলে অনেক ফুটবলার তারকাখ্যাতি পেয়েছেন। তাদের সুনাম ব্যবহার করলেই কিন্তু আর্থিক সংকট অনেকটা কেটে যায়। কিন্তু কখনই আমাদের ডাকা হয় না। ব্রাদার্স মানেই সেলিম। অথচ সেলিমের মৃত্যুবার্ষিকীটা ভালোভাবে করার কথা কেউ চিন্তা করে না। সবসময় শুনি ক্লাবে চরম আর্থিক সংকট। সেই সংকট যদি নিরসন করতে না পারে, তবে কেন দায়িত্ব আঁকড়ে পড়ে থাকা?

প্রতিবেদকের কথা...

ব্রাদার্সের দল পরিচালনার মূল দায়িত্বে থাকা তিনজন কর্তা এখন ফুটবল ফেডারেশনের বিভিন্ন পদে। অথচ নিজেদের দলকে শক্তিশালী করে তুলতে তারা গত কয়েক বছর ধরেই ব্যর্থ হয়েছেন। ৪৬ বছর পর শীর্ষ লিগ থেকে নেমে যেতে হয় ব্রাদার্সকে। তাছাড়া পাতানো ম্যাচের কলঙ্কের ফোঁটাও পড়েছে ক্লাবটির ওপর। খেলোয়াড়-কোচদের বেতন নিয়ে অবহেলার অভিযোগ আছে। ক্লাব সভাপতি নজরুল ইসলাম একটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। তবে দল চালাতে খুব বেশি পৃষ্ঠপোষকতা করতে দেখা যায় না তাকে। ক্লাবসূত্রে জানা গেছে, একজন যোগ্য সভাপতির খোঁজ চলছে দীর্ঘদিন ধরেই। তবে বর্তমান সভাপতি নিজ থেকে দায়িত্ব ছাড়ছেন না বলে, নতুন কাউকে পাওয়াও যাচ্ছে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত