চসিক প্রকৌশলী ও তার স্ত্রীর সাড়ে ৪ কোটির অবৈধ সম্পদ

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:১৮ এএম

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সড়ক বিভাগে ২০০৬ সালে মাত্র ৮ হাজার টাকা বেতনে পরিদর্শক পদে যোগ দিয়েছিলেন জসিম উদ্দিন। ২০০৯ সালে পদোন্নতি পেয়ে হন পুরকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী। এর আগে ৮ বছর একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জসিম ও তার স্ত্রীর বর্তমান স্থাবর ও অস্থাবর ৪ কোটি ৫৮ লাখ ১৯ হাজার ১৮২ টাকা সম্পদের সন্ধান পেয়েছে। সম্প্রতি অনুসন্ধান কার্যক্রম শেষ করেছে দুদক। শিগগির প্রতিবেদন সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির মেট্রো অঞ্চলের উপপরিচালক নাজমুচ্ছায়াদাত। 

গত বছর আগস্ট মাসে অভিযোগ পেয়ে জসিম ও তার স্ত্রীর অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে নামে দুদক, সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১-এর একটি টিম। কমিশনের অনুসন্ধান বলছে, সরকারি ও বেসরকারি মিলে জসিমের ২৫ বছর চাকরিজীবনে গ্রহণযোগ্য আয় প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। কিন্তু এখন চট্টগ্রাম শহর এবং গ্রামের বাড়ি ফেনীতে তার আছে একাধিক ফ্ল্যাট, কোটি কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি। ব্যাংকে আছে লাখ লাখ টাকা। শুধু নিজের নামে নয়, স্ত্রী আয়েশা বেগম নুরীর নামেও সম্পদের পাহাড় গড়েছেন চসিকের এই কর্মকর্তা। স্বামী-স্ত্রী দুজন তাদের আয়কর নথিতে গাড়ি ও ঠিকাদারি ব্যবসার কথা উল্লেখ করলেও বাস্তবে এসবের অস্তিত্ব পায়নি দুদক।

দুদক জানায়, অনুসন্ধানে জসিম উদ্দিনের নামে ১ কোটি ৭১ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭১ টাকার অবৈধ সম্পত্তি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নিজ গ্রাম ফেনীর তালবারিয়ায় আছে আধুনিক ফার্নিচার-সমৃদ্ধ ডুপ্লেক্স বাড়ি। যার আনুমানিক মূল্য ৮০ লাখ টাকা। বর্তমানে তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন নগরের নাসিরাবাদ আল-ফালাহ গলি ‘ওয়েল কিংস হলিডে’ নামের ভবনের দোতলায়।

দুদকের অনুসন্ধান অনুয়ায়ী, গ্রামের বাড়ি ফেনীর তালবারিয়া মৌজায় তার ভাই সাইফুল ইসলামকে নিয়ে দুটি জমি কেনেন জসিম উদ্দিন। যার একটির নিবন্ধন মূল্য ৯ লাখ ৫ হাজার টাকা। অন্যটির মূল্য ৮ লাখ ২০ হাজার টাকা। আয়কর বিবরণীতে তিনি নগদ টাকা দেখিয়েছেন ১ কোটি ১১ লাখ ১৮ হাজার ৭৯২ টাকা। কিন্তু সাউথ ইস্ট ব্যাংকে নিজের নামে দুটি, ছেলের নামে পাঁচটি এবং মেয়ের নামে পাঁচটি ডিপিএস থাকার তথ্য পেয়েছে দুদক।

সূত্রটি জানায়, জসিম উদ্দিন চসিকে নিয়োগ পাওয়ার আগে ১৯৯৮ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন বেসরকারি সংস্থা ‘ওয়েলিকিংস প্রপার্টিজ ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। ২০০৬ সালে ৮ হাজার টাকা বেতনে চসিকের সড়ক পরিদর্শক পদে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পান। ২০০৯ সালে বিভাগের ১১ সিনিয়র কর্মকর্তাকে পেছনে ফেলে জসিম উদ্দিন বাগিয়ে নেন নির্বাহী প্রকৌশলীর পদ।

দুদকের অনুসন্ধানে জসিম উদ্দিনের বৈধ আয় পাওয়া গেছে ৮০ লাখ ৩১ হাজার ৩৬ টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি সংস্থা থেকে তার আয় হয়েছে ২৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। ২০০৬ থেকে ২০২৩ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত চসিক থেকে বেতন-ভাতা বাবদ আয় হয়েছে ৫৬ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬ টাকা। তার গ্রহণযোগ্য আয় থেকে ১ কোটি ৩৪ লাখ ৪৪ হাজার ২০ টাকার বেশি সম্পদ পেয়েছে দুদক।

এদিকে অনুসন্ধানে তার স্ত্রী আয়েশা বেগম নুরীর নামে ২ কোটি ৮৬ লাখ ২৪ হাজার ৭১১ টাকার অবৈধ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ পেয়েছে দুদক। এর মধ্যে আছে নগরের ডবলমুরিং থানা এলাকায় ‘সাকুরা নাহার পয়েন্ট’ ভবনে পার্কিং স্পেসসহ ৩ হাজার ৯৭৪ বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাট। যার নিবন্ধন মূল্য ৮২ লাখ ৭২ হাজার টাকা। এ ছাড়া আয়েশা বেগম নুরীর নামে নগরের পাঁচলাইশ থানাধীন পশ্চিম ষোলশহর মৌজায় ৫৫ লাখ, রাউজান উপজেলার গশ্চি মৌজায় ১৪ লাখ, গাজীপুরের বড়দেওড়া মৌজায় ৯ লাখ ২৪ হাজার এবং ফেনীর সোনাগাজী এলাকার খাজুরিয়া মৌজায় ১১ লাখ টাকার জমি রয়েছে। তার (আয়েশা) নামে ১ কোটি ১৩ লাখ ৭৮ হাজার ১১ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি পেয়েছে দুদক। নুরীর হাতে টাকা পাওয়া গেছে ৫৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া সাউথ ইস্ট ও শাহজালাল ব্যাংকের হিসাব নম্বরে পাওয়া গেছে ৪৫ লাখ টাকা।

আয়েশা তার আয়কর বিবরণীতে ‘মেসার্স মাসুদ এন্টারপ্রাইজ’ নামে গাড়ির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করলেও বাস্তবে এই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি দুদক। ওই অফিসের ঠিকানা দেখানো হয়েছে হাসান আলী মসজিদ কমপ্লেক্স (প্রথমতলা), ৩১৩ শেখ মুজিব রোড, চট্টগ্রাম। এ ছাড়া ঠিকাদারি ব্যবসার কথা বললেও এর সপক্ষে কোনো রেকর্ডপত্র পায়নি দুদক।

পারিবারিক সূত্রে আয়েশা কিছু সম্পত্তি পেলেও তার অধিকাংশ সম্পদ অর্জনের উৎস খুঁজে পায়নি দুদক। আয়েশার গ্রহণযোগ্য আয় থেকে ১ কোটি ৭৬ লাখ ২৩ হাজার ৫৩৭ টাকার সম্পদ বেশি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন দুদকের উপপরিচালক নাজমুচ্ছায়াদাত।

এর আগে গত বছরের ২৭ আগস্ট নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিনের রেকর্ডপত্র দুদককে জমা দেওয়ার অনুরোধ করে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে চিঠি দেন দুদকের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক অংটি চৌধুরী। দুদকের অনুসন্ধান বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার কল করলেও সাড়া দেননি নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত