ফসলি জমি ডোবা বানানোর ‘উৎসব’

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৪, ০৫:৪৭ এএম

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় সন্ধ্যা নামলে অবাধে চলে ফসলি জমির মাটি কাটার উৎসব। অভিযোগ উঠেছে রাতভর মাটি কাটার উৎসবে স্থানীয়রা উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করলেও অজ্ঞাত কারণে নীরব প্রশাসনের কর্তা-ব্যক্তিরা। প্রশাসনের রহস্যময় নীরবতার সুযোগে মাটি মাফিয়াদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না তিন ফসলি উর্বর জমি, উঁচু ভিটা, এমনকি ক্ষুদ্র জলাশয়।

এতে কৃষিজমি পরিণত হচ্ছে ডোবায়। যার ফলে দিন দিন ফসলের উৎপাদন কমছে, বেকার হচ্ছে কৃষক, পরিবেশ হচ্ছে দূষিত। এলাকার উর্বর আবাদি জমির পরিমাণ কমতে কমতে হুমকির মুখে পড়ছে কৃষি উৎপাদন। মাটি পরিবহনে ভারী ট্রাক ও মাহেন্দ্র ট্রলির ব্যবহারে গ্রামীণ সড়ক হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত।

স্থানীয়দের দাবি, উপজেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আবাদি জমির শ্রেণি পরিবর্তন না করে মাটি কাটার মহোৎসবে মেতেছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। মাটিখেকো সিন্ডিকেটের সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও জড়িত রয়েছে বলে জানায় এলাকাবাসী।

সরেজমিনে উপজেলার চরছান্দিয়া ও চরদরবেশ ইউনিয়নের উপকূলীয় একাধিক স্থানে দেখা গেছে, রাতে চিহ্নিত ক্যাডারদের পাহারায় ভেকু ও এস্কেভেটর দিয়ে ফসলি জমির মাটি কাটছে সিন্ডিকেটটি। পরে ট্রাক-পিকআপ দিয়ে সেই মাটি ইটভাটাসহ ক্রেতাদের পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ট্রাক-পিকআপ এস্কেভেটর-ভেকুর আওয়াজে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে জনসাধারণের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলেও অসহায় স্থানীয়রা। বাধা দিলে তাদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় আলাউদ্দিন ও মোরশেদ বলেন, ‘পাঁচ দিন ধরে দেদার ফসলি জমির মাটি কাটা অব্যহত রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) মোবাইল ফোনে বারবার অবহিত করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। তাদের রহস্যজনক নীরবতার সুযোগে মাটিখেকো সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া আচরণ করে। মনে হচ্ছে প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই তারা মাটি কাটছে। ফসলি জমি রক্ষা করতে দ্রুত প্রশাসনের কার্যকরী পদক্ষেপ জরুরি।’

স্থানীয় ফকির আহমদ বলেন, যারা মাটি কাটছে তাদের সবাই চেনে, কিন্তু হয়রানির ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস করছে না।

অন্যদিকে, মাটি ব্যবসায়ীরা দম্ভোক্তি করে বলছে, ‘আমরা মাটি কেটে বিক্রি করছি। প্রশাসনের কোনো কিছু করার থাকলে করুক।’

হয়রানির ভয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি জানান, জমির মালিকরা প্রলোভনে পড়ে ফসলি জমির মাটি বিক্রি করছে।

সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, ‘আমাদের নীরবতার সুযোগ নেই। এলাকাবাসীর কাছ থেকে তথ্য পেয়ে ইতিমধ্যে আমরা অভিযান পরিচালনা করে এস্কেভেটরের ব্যাটারি জব্দ করেছি। ফসলি জমি রক্ষার্থে আমরা কাউকে ছাড় দেব না।’

অন্যদিকে, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন মাঠে আবাদি জমির মাটি নির্বিঘ্নে বিক্রির মহোৎসব চলছে। প্রশাসনের নেই কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ। এতে আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে কৃষিজমি। দিনদিন কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় কমছে উৎপাদনও।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী জানান, স্থানীয় তহসিল অফিস ও থেকে উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এসব হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মাটি ব্যবসায়ীরা কৃষকদের টাকার লোভ দেখিয়ে ফসলি জমিতে ভেকু দিয়ে মাটি কেটে বিক্রি করছেন বিভিন্ন বাড়ি-ভিটে, পুকুর ভরাটে এবং ইটভাটায়। নির্বিচারে চলছে মাটি কাটা।

মাটি ব্যবসায়ী শহিদ হোসেন বলেন, ‘আমি কবরস্থানে মাটি দিচ্ছি। এক ফসলি জমি কিনে মাটি কাটছি। তিন ফসলি জমি কেউ বিক্রি করতে চাইলে আমি কিনি না। আমি জোর করে কারও জমিতে মাটি কাটি না।’

হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপস শীল বলেন, জমির শ্রেণি পরিবর্তন করতে অনুমোদন লাগে। এ ছাড়া ওই ছোট সড়ক দিয়ে ডাম্প ট্রাক চলাচল করার নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। কৃষিজমি থেকে যারাই মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত