আজ সোমবার ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের অযোধ্যায় ‘আলোচিত ও বিতর্কিত’ রামমন্দির উদ্বোধন করা হবে। জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্যমণি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এবং অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী শক্তি
‘সংস্কৃতি ও ধর্মীয়’ জাতীয়তাবাদের এক প্রবল উত্থানে ভর করে আগামী লোকসভা নির্বাচন জয়লাভের স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু বিরোধীদের অবস্থা বলতে গেলে, ‘ছন্নছাড়া’। নানা ছত্রে বিভক্ত বিরোধীদের জোটও যেন কৌশল নির্ধারণের প্রশ্নে ঐক্য দেখাতে পারল না। অনেক দল আবার বিজেপির হিন্দুত্বের পথের বাইরে আরেকটি শিথিল কিংবা আরেকটু অন্য ধর্মীয় রাজনীতির কাছে আত্মসমর্পণ করতে চলেছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী যখন সাধু-সন্ন্যাসীদের নিয়ে অযোধ্যা পর্বের মনোযোগ কাড়তে ব্যস্ত সময় করবেন, ঠিক তখন উত্তর-পূর্বের আসামে ‘ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রার’ কাজে সময় কাটাচ্ছেন। গত বছর দেশের প্রায় ২৮টি বিজেপিবিরোধী দলের সমন্বয়ে গঠিত জোট ‘ইনডিয়ান ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স (ইনডিয়া)’-এর অন্তর্ভুক্ত দলগুলো কেউ কেউ মন্দির পরিদর্শন, আরতিসহ নানা আয়োজনে মনোনিবেশ করেছে। তবে হ্যাঁ, বিরোধীদের অযোধ্যাযাত্রা হচ্ছে না সেই বিষয়ে ঐক্য দেখাতে পেরেছে।
এ অবস্থায় বিজেপি নেতারা বিরোধীদের হিন্দুবিরোধী, ধর্মবিরোধী ও নাস্তিক হিসেবে সাব্যস্ত করে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন। উত্তরপ্রদেশ বিজেপির প্রধান ভূপেন্দ্র চৌধুরী সম্প্রতি বলেন, ‘আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিয়ে কংগ্রেস নিজেকে নাস্তিক প্রমাণ করেছে। তারা সনাতনীদের বিশ্বাসে আঘাত করেছে।’কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেছিলেন, ‘বিজেপি-আরএসএস রাম মন্দিরকে রাজনৈতিক প্রকল্প বানিয়েছে’ এমন কথার পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও রাম মন্দির অনুষ্ঠান থেকে কংগ্রেসের দূরত্ব বজায় রাখা নিয়ে লক্ষেèৗয়ের বাবাসাহেব ভিমরাও আম্বেদকার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এস কে পান্ডে বলেন, ‘বিজেপির ধর্মীয়-সংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী কর্মসূচি রুখতে সম্ভবত কংগ্রেস তার আগের নরম হিন্দুত্ববাদী অবস্থান থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করেছে।’ তিনি মনে করেন, উত্তরপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি (এসপি) এবং কংগ্রেস প্রধানত রাম মন্দির ইস্যুতে কোনো রাজনৈতিক লাভ দেখেনি। উল্টোদিকে তিনি মনে করেন, ‘বিজেপি রাম মন্দিরকে কেন্দ্র করে তার কর্মসূচিতে অবিচল। এর ওপর দাঁড়িয়ে তাদের রাজনৈতিক অর্জন সামনে অব্যাহত থাকবে।’
রাহুল গান্ধী তার ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা কর্মসূচির অংশ হিসেবে আসামের নগাঁও জেলায় বৈষ্ণবী পন্ডিত শ্রীমাতা শঙ্কারদেবের জন্মস্থান পরিদর্শন করবেন। ইনডিয়ার কয়েকজন নেতা মন্দির পরিদর্শনের কর্মসূচি রেখেছেন। তারা খোলাখুলিভাবে মোদির অনুষ্ঠানকে মোকাবিলা করতে এসব অনুষ্ঠানসূচি হাতে নিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা শহরে কালী মন্দিরে পূজা দেবেন। তবে তিনি সব বিশ্বাসের মানুষদের নিয়ে শোভাযাত্রা করবেন। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী আম আদমি পার্টির (আপ) প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল রামায়ণ আবৃত্তি কর্মসূচি নিয়েছেন। তিনি রামলীলা কর্মসূচিতেও অংশ নেবেন। আবার মহারাষ্ট্রের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শিবসেনার একাংশের নেতা উদ্ধব ঠাকরে ‘মহা আরতি’ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।
ভারতের প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক এবং ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ বইয়ের লেখক আশুতোষ দেশটির রাজনীতিতে বড় এক বাদল প্রত্যক্ষ করেন। তিনি তার একটি নিবন্ধে বলেন, ‘আজকের দিনে বাস্তবতা হচ্ছে, ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের পরিসরের মধ্যে ধর্ম রাজনীতিকে এখন নিয়ন্ত্রণ করছে। ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ সোমনাথ মন্দিরে যাচ্ছেন এ নিয়ে যদি প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সমস্যা উপলব্ধ হয়; তবে আজকের দিনে পরিস্থিতি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। এখন মোদি গর্বের সঙ্গে হিন্দু মন্দির পরিদর্শন করছেন এবং নিজেকে হিন্দুত্ববাদী পরিচয় দিতে তিনি মোটেও ইতস্তত নন।’
