ফলন মজুদ আছে তবুও বাড়ছে চালের দাম

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৪, ১০:২২ পিএম

শেষ হয়েছে আমন ধান কাটা ও মাড়াই। চলছে বোরো চাষের ভরা মৌসুম। ধান কাটা ও মাড়াইয়ের সময় কম-বেশি প্রতিটি কৃষকের ঘরে ধান উঠে যায়, বাজারে চালের তেমন একটা চাহিদা থাকে না। ফলে দর নিয়ন্ত্রণেই থাকে। তবে কাটা-মাড়াই শেষ হলে চালের চাহিদা তুলনামূলক বাড়ে। যে কারণে ওই সময় বাজার দরও বেড়ে যায়। কিন্তু এ বছরের চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন। কারণ আমন ধান কাটা-মাড়াইয়ের মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসে হঠাৎ চালের দাম কেজিপ্রতি ৫/৬ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এ মুহূর্তে হঠাৎ চালের বাজার দর বেড়ে যাওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ না থাকলেও বাস্তবতা হচ্ছে মোটা-সরু, স্বর্ণা থেকে শুরু করে পায়জাম জাতীয় প্রতিটি চালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ ভোক্তার কষ্ট বেড়েছে। এ নিয়ে খোদ খাদ্য মন্ত্রণালয়ও উদ্বিগ্ন। 

মূলত কোনো পণ্যের সরবরাহ কমলে দাম বেড়ে যায়। ধান কাটা-মাড়াইয়ের ভরা মৌসুম চলাকালে বড় বড় চাল কলের মালিক, করপোরেট ব্যবসায়ী ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা প্রচুর পরিমাণ ধান কিনে মজুদ করেন। পরে সেগুলো ধীরে ধীরে চালে রূপান্তর করে বাজারে বিপণন করে থাকেন। এ সময় সরকারের প্রত্যক্ষ নজরদারি না থাকলে সুযোগ বুঝে করপোরেট ব্যবসায়ীরা বাজারকে অস্থির করে তুলতে পারে, আবার পণ্যের চাহিদা বাড়লেও মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে পারে।

এমনিতেই মূল্যস্ফীতির কারণে নিত্যপণ্যের বাজার বেশ চড়া। এ পরিস্থিতিতেও মানুষের খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন চালের বাজারদর নিয়ন্ত্রণেই ছিল। তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে কর্মব্যস্ততা, বিরোধী জোটের হরতাল, অবরোধে পরিবহন খাতে অস্থিরতা ও ভাড়া বৃদ্ধির কারণে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের বাজার কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও হালনাগাদ চালের বাজারদর বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকটা নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যা মোকাবিলায় অবৈধ মজুদদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সরকারের উচিত খোলাবাজারে স্বল্পমূল্যের চাল বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি করা। এমনকি সরকারকে বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে স্বল্প আয়ের এবং শ্রমজীবী মানুষের জন্য চালের সরবরাহ বৃদ্ধি করা জরুরি।

পাশাপাশি চলতি বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। যেন বিদ্যুৎ, ডিজেল, রাসায়নিক সারের কোনো ঘাটতি না হয়। যেহেতু মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় নিয়ামকই হলো বোরোর উৎপাদন, সেহেতু বোরো চাষকে নির্বিঘ্ন করতে হবে। তাহলে খাদ্য সংকটের সম্ভাবনা যেমন থাকবে না, তেমনি চালের বাজারও অস্থির হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। বর্তমানে দেশে যে কোনো ধরনের চাল আমদানি বন্ধ রয়েছে। চাল আমদানি বন্ধ থাকার সুযোগে যেন করপোরেট ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে চালের বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারেন। সে জন্য কৌশলগত কারণে সীমিত আকারে হলেও চাল আমদানির প্রয়োজন হতে পারে। যেভাবেই হোক চালের সরবরাহ বৃদ্ধি করা উচিত।

সরকারের খাদ্য মজুদ পরিস্থিতিকেও খারাপ বলা যাবে না। গত বোরো মৌসুমে ধান চাল মিলে প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন সরকারি গুদামে সংগ্রহ করেছে। সরকার এবারের আমন মৌসুমেও ৪ লাখ মেট্রিক টন সেদ্ধ চাল, ১ লাখ মেট্রিক টন আতপ চাল ও ২ লাখ মেট্রিক টন ধান সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে। চাল সংগ্রহ আশানুরূপ হলেও খোলাবাজারে ধানের দাম বেশি থাকায় কৃষক এ বছর ধান খোলাবাজারেই বিক্রি করেছে। এখনো সংগ্রহ মৌসুম চলছে। অর্থাৎ সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় এখনো চাল সংগ্রহ কার্যক্রম চালু রেখেছে। যে কারণে চালের বাজার দর বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

আবার এবার আমনের ফলনও ভালো হয়েছে। সরকারি গুদামে চালের মজুদও পর্যাপ্ত। বাজারে চালের কোনো ঘাটতি নেই। তারপরও চালের দাম বাড়ছে কেন? খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য মতে গত ১৭ জানুয়ারি সরকারি খাদ্য গুদামে মোট ১৬ লাখ ৫৮ হাজার ৬২৪ টন খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে চাল ১৪ লাখ ৩০ হাজার ৩৪৮ টন, গম ২ লাখ ২২ হাজার ৪৪ টন ও ধান ১৬ হাজার ৯০০ টন মজুদ রয়েছে। যদিও তুলনামূলক গমের মজুদ সন্তোষজনক নয়। সরকারের ভ্রান্তনীতি এবং চাষাবাদে গুরুত্ব কম দেওয়ায় গম উৎপাদনে প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও দিনে দিনে গম উৎপাদন কমে আসছে। যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য খুবই হতাশাজনক অবস্থা।

মোদ্দাকথা, দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তার জন্য চাল ও গমের উৎপাদনের দিকে আরও বেশি করে নজর দিতে হবে। যেন দেশীয়ভাবে উৎপাদিত ধান-গমে ভোক্তার চাহিদার পুরোটাই পূরণ করা সম্ভব হয়। তা না হলে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেকাংশেই কঠিন হবে। স্বস্তির খবর ইতিমধ্যেই ধান-চালের দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে। যদিও দাম যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, সে অনুপাতে দাম কমছে না। তবে আমরা আশাবাদী, চালের সরবরাহ বৃদ্ধি করলে এবং অবৈধ মজুদবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকলে চালের মূল্য অনেকাংশেই প্রশমিত হয়ে আসবে।

লেখক : কৃষি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত